চট্টগ্রামের বাজারে নিম্নমানের পণ্যের দাপট চলছে। মানহীন এসব পণ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কোনো লাইসেন্স নেই। এতে করে ঝুঁকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশেপাশের উপজেলাগুলোতে বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে অসংখ্য ফুড আইটেম (খাদ্যপণ্য) ও প্রসাধনী পণ্য। একই সাথে লাইসেন্সধারী কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত নজরদারি এবং প্রশাসনের অভিযানের পরও অসাধু চক্রের এই তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
লাইসেন্সবিহীন ও মানহীন পণ্যের বর্তমান চিত্র : বিএসটিআইয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরের রিয়াজুদ্দিন বাজার, চকবাজার, বিভিন্ন মার্কেট, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই এবং উপজেলায় পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্যের সরবরাহ। লাইসেন্সবিহীন ও মানহীন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকরা মানহীন এসব পণ্য সরল বিশ্বাসে ক্রয় করে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নকল ও অনিবন্ধিত প্রসাধন সামগ্রী : চকবাজার এবং রিয়াজুদ্দিন বাজারে বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন এবং ক্ষতিকারক কেমিক্যালযুক্ত দেশি–বিদেশি নামী ব্র্যান্ডের নকল সাবান, শ্যাম্পু, স্কিন ক্রিম ও লোশন বিক্রি হচ্ছে। এসব নকল পণ্য কম দামে ঢাকা থেকে আনা হচ্ছে। আবার রিয়াজুদ্দিন বাজার, পাহাড়তলী, আগ্রাবাদ আবাসিক, সুগন্ধা আবাসিক, হালিশহর এবং চান্দগাঁওয়ের বিভিন্ন গোপন ফ্ল্যাটেও তৈরি করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ভেজাল খাদ্য ও পানীয় : নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে গোপনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে চিপস, চানাচুর, বিস্কুট, শিক্ষার্থীদের স্কুল কেক, ক্রিম বিস্কুট, শিশুদের ওয়েফার বা ওয়েফার বিস্কুট, আইসক্রিম এবং ললিপপসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য। এসব মানহীন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় স্কুল–কলেজের সামনের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। টার্গেট করা হয়েছে নগরীর বিভিন্ন বস্তি এলাকা, টঙের দোকান এবং উপজেলাগুলোকে। এগুলোতে ফুড গ্রেড রঙের পরিবর্তে ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভোজ্যতেল, ঘি, বাটার অয়েল ও মসলায় ভেজাল : খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, পাহাড়তলী, বায়েজিদ, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন আড়তে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো এবং লঙ্কা–হলুদ গুঁড়োয় ভুসি, কাঠ ও ইটের গুঁড়ো ও কাপড়ের রং মেশানোর প্রমাণ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবারে এসব পণ্য অপরিহার্য।
এছাড়া নগরের কালুরঘাট, চাক্তাই, আছদগঞ্জ, মিয়াখান নগর, বায়েজিদ, পাহাড়তলীতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘি ও বাটার অয়েল তৈরি করার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘি ও বাটার অয়েলে দুধের ফ্যাটের পরিবর্তে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পাম অলিন ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান এবং বিয়েতে বাবুর্চিদের ম্যানেজ করে এসব নকল–ভেজাল ঘি ও বাটার অয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে বাবুর্চিদের দেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
রাসায়নিক পণ্য : ভেজাল পণ্য প্রস্তুতকারী চক্রটি সাবান, ডিটারজেন্ট, পেট্রোলিয়াম জেলি, ফেসওয়াশ, হেয়ার ডাই, শেভিং ফোম ইত্যাদি পণ্য সারা বছর তৈরি করে বাজারজাত করছে।
ইলেকট্রনিঙ পণ্য : সিমেন্ট, রড, গিজার, বৈদ্যুতিক ক্যাবল, বাল্ব ইত্যাদি।
বিএসটিআই লোগোর অবৈধ ব্যবহার : অনেক ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের পরীক্ষা বা লাইসেন্স ছাড়াই পণ্যের মোড়কে বিএসটিআই লোগো লাগিয়ে গ্রাহকদের প্রতারিত করছে। এ ব্যাপারে বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সিএম) এবং (মিডিয়া) রিগ্যান বৈদ্য বলেন, আমাদের বিএসটিআই মূলত খাদ্য (ফুড), কসমেটিকস, কৃষিপণ্য, রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিঙ পণ্যের মান সনদ বা লাইসেন্স দিয়ে থাকে। আমাদের নিয়মিত অভিযানে বিএসটিআইয়ের লাইসেন্সবিহীন এবং মানহীন অনেক পণ্য পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স আছে মর্মে মিথ্যা তথ্যে পণ্য বিক্রির দায়ে বিএসটিআই আইন, ২০১৮–এর ৩০ ধারা লঙ্ঘিত হওয়ায় জরিমানা করা হচ্ছে।
বিএসটিআইয়ের ল্যাবের পরীক্ষায় মানে অনুত্তীর্ণ অনেক খাদ্যপণ্য, পানীয়, ভোজ্যতেল, কসমেটিক পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএসটিআই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (রসায়ন) ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, আমাদের ল্যাবে নিয়মিত আমরা বাজারের বিভিন্ন পণ্যের মান পরীক্ষা করে থাকি। অনেক পণ্যের মান সঠিক পাওয়া যায়। অনেক পণ্যের স্ট্যান্ডার্ড মান পাওয়া যায় না।
বাজারজাতকরণের কৌশল ও সিন্ডিকেট : অসাধু ব্যবসায়ীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল অবলম্বন করছেন। অধিকাংশ মানহীন পণ্যের প্যাকেটে কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা থাকে না। অনেক সময় কেবল ‘চট্টগ্রামে উৎপাদিত’ লিখে বাজারজাত করা হয়।












