আইএমইআই বদলে চোরাই ফোন ঢুকছে বাজারে, সক্রিয় সিন্ডিকেট

নেজাম উদ্দীন আবির | মঙ্গলবার , ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম নগরীতে মোবাইল ফোন চুরি ও ছিনতাইয়ের পর তা দ্রুত বাজারে ঢুকে পড়ার পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। চোরাই মোবাইলের আইএমইআই (ওগঊও ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর পরিবর্তন করে ফোনটির পরিচয়ই বদলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে চুরি যাওয়া ফোন শনাক্ত ও উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পড়তে হচ্ছে নতুন জটিলতায়। অন্যদিকে পরিবর্তিত আইএমইআইর ফোন সাধারণ ক্রেতার কাছে বৈধ বা পুরোনো ব্যবহৃত সেট হিসেবে বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সফটওয়্যার, ফ্ল্যাশার ডিভাইস, কম্পিউটার বা ল্যাপটপ এবং টঝই সংযোগ ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড থেকে একদুই মিনিটের মধ্যেই একটি মোবাইলের আইএমইআই পরিবর্তন করা সম্ভব। পুরোনো নম্বরের জায়গায় অন্য একটি নম্বর বসিয়ে দেওয়ার পর চোরাই ফোনটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আগের পরিচয়ে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লক করা সেটও নতুন আইএমইআইর মাধ্যমে পুনরায় নেটওয়ার্কে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ চোরাই মোবাইলের আইএমইআই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত একাধিক চক্রের সন্ধান পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে কোতোয়ালী থানা পুলিশ নন্দনকানন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘পার্টি সোহেল’ নামে পরিচিত সোহেল উদ্দিনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ১৫৭টি মোবাইল ফোন এবং আইএমইআই পরিবর্তনে ব্যবহৃত বিশেষ সফটওয়্যার ও ডিভাইস উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে ২০২৫ সালে নগর গোয়েন্দা পুলিশ একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। ওই অভিযানে ৩৪২টি চোরাই মোবাইল ফোন এবং আইএমইআই পরিবর্তনে ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশের তদন্তে চট্টগ্রামে সক্রিয় এসব চক্রের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার চোরাকারবারিদের যোগাযোগের তথ্যও উঠে এসেছে। পরিবর্তিত আইএমইআইর ফোন দেশের বাইরে ভারত, মিয়ানমার ও নেপালসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাচারের অভিযোগও তদন্তে এসেছে। চোরাই মোবাইল উদ্ধারে দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হিসেবে আইএমইআই পরিবর্তনকারী চক্রের বিষয়টি সামনে এসেছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অনেক চোরাই ও ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করছি এবং এ ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করছি। আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনকারী চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি এবং তাদের কাছ থেকে এ কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধীরা যেমন অপরাধের কৌশল পরিবর্তন করছে, আমরাও তাদের ধরতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। অপরাধীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছি। অনেক সময় গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীরা জামিনে বের হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আমরা তাদের আবারও গ্রেপ্তার করছি। আমরা থেমে নেই। পুরোনো ও ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ক্রয়বিক্রয়ের দোকানগুলোর ওপরও আমাদের নজরদারি রয়েছে। কোনো দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চোরাই মোবাইল কেনাবেচার তথ্য পাওয়া গেলে আমরা অভিযান চালাচ্ছি এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।

বিশেষজ্ঞ আইটি এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল উদ্ধারে অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, মোবাইল হারানো বা চুরি হলে দ্রুত থানায় জিডি করার পাশাপাশি ফোনের আইএমইআই নম্বর সংরক্ষণ করা জরুরি। ফোনের বাঙ, ক্রয়রসিদ অথবা *#06# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বর আগে থেকেই লিখে রাখা উচিত। একই সঙ্গে Andriod ফোনে Find My Device এবং iPhoneএ Fine My চালু রাখা, শক্তিশালী স্ক্রিন লক ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা দরকার। ফোন চুরি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ডিভাইসটি লক বা প্রয়োজন হলে দূর থেকে ডেটা মুছে ফেলতে হবে। পাশাপাশি আইএমইআই ব্লক করার জন্য সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর বা বিটিআরসির নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। সেকেন্ডহ্যান্ড মোবাইল কেনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। ফোনের আইএমইআই, ক্রয়রসিদ ও বৈধ মালিকানার তথ্য যাচাই না করে কম দামে সেট কেনা হলে অজান্তেই চোরাই ফোনের বাজারকে উৎসাহিত করা হতে পারে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে রেকর্ড ডেঙ্গু রোগী
পরবর্তী নিবন্ধনগরের প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে মিছিল-সমাবেশ করবে বিএনপি