প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ শিল্প–কারখানা চালুর উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছেন। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসংক্রান্ত সভায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত অপর এক খবরে বলা হয়েছে, বন্ধ থাকা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প সুদে এই অর্থ ব্যাংকগুলোকে ঋণ হিসেবে দেবে এবং ব্যাংকগুলো যাচাই–বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ দেবে।
জানা গেছে, একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। তবে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স থাকলে তা নবায়নযোগ্য। ব্যাংক পর্যায়ে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ।
এর আগেও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বিএনপির একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেছিলেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ উদ্যোগের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন, মালিকানা বা অংশীদারত্বের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রুগ্ন ও বন্ধ পাটকল ও চিনিকলগুলো খুলে দিয়ে সেখানে পুরাতন শ্রমিকদের বহাল রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে শিল্প খাতের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং শিল্প খাতের বিকাশে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্পনীতি প্রণয়ন করছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে। এসব নীতির লক্ষ্য হলো শিল্প খাতের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প খাতের বিকাশে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁরা বলেন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতের আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ওষুধ শিল্পে এর প্রভাব গভীর। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধুমাত্র উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডলার সংকটও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা তাঁদের প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতে না পেরে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চালাচ্ছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। তাই সঠিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাত একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এই খাতের উন্নয়ন শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ‘নাজুক’ অবস্থায় এমন আলোচনা ছিল সর্বত্র। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, বিনিয়োগ স্থবিরতার চাপ সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে দেড় বছর পর এসে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন হলো, অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘বিগত সরকারের পতনের পর অর্থনীতির যে দুর্দশা দেখা দিয়েছিল, তা সামাল দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ’। তাঁরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণকে অগ্রাধিকার না দিয়ে নিজেদের অগ্রাধিকার দিয়েছে। উচ্চ সুদ মানেই বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করা। সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এর ফলে বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বরং বেকারত্ব বেড়েছে বলে বিভিন্ন সভা–সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা ও স্থবিরতা আছে, সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা আসে। মানুষের প্রত্যাশা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে নয়; অর্থনৈতিক জীবনেও স্বস্তি ফিরে আসবে।








