হল্যান্ড থেকে

লন্ডন থেকে ফিরে এসে : যেন আছি দেশের কাছাকাছি-২

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

বিলেতের সাথে আমার পরিচয় বিলেতে আসার অনেক আগ থেকে। সে পরিচয় ঘটে প্রথম রবি ঠাকুরের লেখার মধ্য দিয়ে, যখন বিলেত তো অনেক দূর অস্ত‘, বাড়ির কাছে কলকাতাও দেখা হয়নি। ইংল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতার বর্ণনা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এইভাবে দিয়েছেন– ‘মেঘ, বৃষ্টি, বাদল, অন্ধকার, শীতএ আর একদন্ডের তরে ছাড়া নেই। আমাদের দেশে যখন বৃষ্টি হয় তখন মুষুলধারে বৃষ্টির শব্দ, মেঘ, বজ্র, বিদ্যুৎ, ঝড়তাতে একটা কেমন উল্লাসের ভাব আছে। এখানে এ তা নয়, এ টিপ টিপ করে সেই একঘেয়ে বৃষ্টি ক্রমাগতই অতি নিঃশব্দে পদসঞ্চারে চলেছে তো চলছেই। এখানে আকাশ সমতল, মনে হয়না যে মেঘ করেছে। সূর্য তো এখানে গুজবের মধ্যে হয়ে পড়েছে। যদি অনেক ভাগ্যবলে সকালে উঠে সূর্যের মুখ দেখতে পাই, তবে তখনই আবার মনে হয়– ‘এমন দিন রবে না তা জেনো।’ আর সেকারণে বিলেতের উদ্দেশ্যে রওনা দেবার আগে লন্ডনেথাকা ভাগ্নি নিপাকে ফোন করে জানতে চাই, ছাতা নিয়ে আসতে হবে কিনা। দরকার হয়তো হবে না, তবে তুমি তো জানোই, লন্ডনের আবহাওয়ার মতিগতি‘, তার উত্তর। ক্ষণস্থায়ী সামারে এই হয় যদি বিলেতের আকাশের রূপ, তাহলে পাঠক বুঝতেই পারছেন বছরের বাকি দীর্ঘ সময়টায় কী হতে পারে। রবি ঠাকুর যে সময়টায় বিলেত এসেছিলেন, তখন মাদার ন্যাচারআজকের মত এতো বেপরোয়া হয়ে উঠেনি। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো। যে কদিন বিলেত ছিলাম, প্রতিদিনই রবি তার আলো ছড়িয়েছিল অকৃপণভাবে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম বিলেত এসেছিলেন ১৮৭৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। তখন তার বয়স মাত্র ১৭। বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে বিলেত পাঠিয়েছিলেন তার ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে, উদ্দেশ্য তাকে (রবি) ব্যারিস্টার বানাবেন। ব্রাইটনের এক পাবলিক স্কুলে ভর্তিও হয়েছিলেন এবং কিছুদিন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইন নিয়ে পড়াশোনাও করেছিলেন। কিন্তু ওই যে কথায় আছে– ‘ম্যান প্রোপোজেস, গড ডিস্পজেস‘- মানুষ চায় এক, সৃষ্টিকর্তা লিখে রাখেন ভিন্ন। ভাগ্যিস সৃষ্টিকর্তা রবির ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু লিখেছিলেন, তা না হলে যে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কী হতো কে জানে।

বিলেতে আমাদের লক্ষ্যগ্রীনস্ট্রিট। বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানি দোকানপাটের মেলা। যেস্থানে ছিলাম সেখান থেকে দ্বিতীয় দিন গ্রীনস্ট্রিটে পৌঁছে মনে হলো মিনিঢাকা বা ঢাকার উন্নত সংস্করণে এসে দাঁড়িয়েছি। গোটা দুইদিন ধরে ওই এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি কেনাকাটা করেসকাল এগারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা অবধি। এর মাঝে কফি খাওয়া, লাঞ্চ এবং ডিনার সারা। যেটুকু সময় ওই এলাকায় কেনাকাটা করে বেড়িয়েছি চোখে দুতিনটি ইংরেজ প্রাণী ছাড়া আর যাদের দেখেছি তারা আমার মত কৃষ্ণবর্ণের কিংবা ভদ্র ভাষায় বলতে হয় শ্যামবর্ণের। তা দেখে আমার যে অভিজ্ঞতা, তার ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। আজ থেকে ১৪৮ বছর আগে যখন তিনি প্রথমবারের মত বিলেত এসেছিলেন তখন। য়ুরোপপ্রবাসীর পত্রেতিনি তার প্যারিস সফরের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন এইভাবে -”আমাদের দিশি কাপড় দেখে রাস্তার একএকজন সত্যি সত্যি হেসে উঠে, এক একজন এত আশ্চর্য হয়ে যায় যে তাদের আর হাসবার ক্ষমতা থাকেনা। প্যারিসে আমাদের গাড়ির পিছনে পিছনে এক দল ইস্কুলের ছোকরা চিৎকার করতে করতে ছুটেছিল, আমরা তাদের সেলাম করলেম। একএকজন আমাদের মুখের উপর হেসে উঠে, একএকজন চেঁচাতে থাকে– ‘ঔধপশ, ষড়ড়শ ধঃ ঃযব নষধপশরবং। এখন পরিস্থিতি হয়েছে ঠিক উল্টো। সাদা চর্মধারীর দেখা খুব একটা মেলে না এই এশীয় অধ্যুষিত এলাকায়। এখন যেদিকে তাকাই দেখি কেবল নষধপশরংয‘, সাদা নেই। ব্রিক লেইনের দশাও একই। অথচ সেখানে এক সময় ছিল সাদাদের ঘাঁটি। এশীয়আফ্রিকীয়দের ভীড়ে সাদারা অন্যদিকে চলে গেছে। অনেকটা নিজ দেশে মাইগ্রেশনের ভাষায় ডোমেস্টিক মাইগ্রেশনবা ইন্টারনাল মাইগ্রেশন। আমার সঙ্গী, ডাচ প্রফেসর বেন ভারতীয় পোশাকের দোকানের বাইরে আমার পাশে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকায়, লোকজনের চলাচল দেখে। মুখে কিছু বলেনা। তবে তার চোখ বলে সে কিছুটা অবাক লন্ডনের এই এলাকার ডেমোগ্রাফির এই দশা দেখে। দেখে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, আছি, যেন দেশের কাছাকাছি। লন্ডনের কথা বাড়ানোর আগে ফিরে যাই শুরুর দিকটায়, হল্যান্ডের বন্দর নগরী রটরডামের রেল স্টেশন থেকে আমাদের যাত্রা শুরুর গল্পে।

শুরুটা ছিল অম্লমধুর। দিনটি ছিল ১২ জুন শুক্রবার। সুন্দর রৌদ্রস্নাত দিন। দুপুর ১৫:২৮ মিনিটে ছাড়বে লন্ডনগামী বিশেষ ট্রেন, ইউরো ষ্টার। অতি আধুনিক, আরামপ্রদ এবং দ্রুতগামী এই ট্রেন কোন অংশেই প্লেনের চাইতে কম নয়। আমস্টারডাম, রটরডাম থেকে এই ট্রেনে চড়ে যাওয়া যায় লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস এবং জার্মানির কোলেন শহরে। আমরা ট্রেন ধরবো রটরডাম রেল স্টেশন থেকে, কেননা আমস্টারডাম থেকে এগিয়েআসা ট্রেনটি হেগ শহরে থামেনা। অন্য রুট হয়ে এটি আসে রটরডাম রেল স্টেশনে। অনলাইনে টিকেট কাটা হয়েছিল আগেই। হেগ স্টেশন থেকে ট্রেনে রটরডাম রেল স্টেশন পৌঁছুতে প্রায় মিনিট ৩৫ লেগে গেলো। আত্মজা সপ্তর্ষি ও শ্যালিকা পূরবী তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে রটরডাম স্টেশনে পৌঁছুবে এবং একসাথে ট্রেন ধরবোএমনই ঠিক করা আছে। রটরডাম পৌঁছে অপেক্ষায় থাকি ওদের জন্যে। খানিকবাদে দেখি বিশাল এক লাগেজ নিয়ে পূরবী উপস্থিত। সুমনার দশাও ভিন্ন নয়। দুজনের যুক্তিশপিং করে ফেরার সময় তো লাগবে, না হলে শপিংকরা জিনিসগুলি কীভাবে নেবো। তাদের দেয়া যুক্তিতে যুক্তি আছে টের পাই। মিনিট দশেকের মধ্যে এলো সপ্তর্ষি। ওর সাথে একটি ছোট হ্যান্ডব্যাগ, আমার একটা ক্যাবিনব্যাগ, তাতে পথে পড়ার জন্যে একটি বই। ভেতর থেকে কফি খাবার খুব তাগিদ ছিল। অপেক্ষার সময়টায় কফি কিনে স্টেশনের একটি বেঞ্চে বসে খেতেথাকি। এই খেতেবা খাওয়াশব্দটা নিয়ে বাঙালি নয় এমন বিদেশী বন্ধুদের কেউ কেউ বেশ মজা পায়। কৌতুক করে বলে, ‘তোমরা বাঙালিরা বেশ ইন্টারেষ্টিং, তোমরা যে জিনিস পানকরার তা খাও‘, আবার যে জিনিস খাবার কথা, তাও খাও। তোমরা চা খাও, পানি খাও। আবার ভাতও খাও। কেবল তা নয় মার খাও, গালি খাও। খাওয়াটা মনে হয় তোমাদের জীবনে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।উত্তরে বলি, একেবারে ঠিক কথাটাই বললে। আমি লন্ডনে এলে প্রথমে মাথায় আসে কী খাবো। বাংলাদেশীখাবারের এত মেলা, কোনটা ছেড়ে কোনটা খাই সেটি ঠিক করতেই অনেকটা সময় চলে যায়।

এলো ইমিগ্রেশনের পালা। রটরডাম রেল স্টেশনেই ইমিগ্রেশনপর্ব। এই সমস্ত ঝামেলা ‘ব্রেক্সিটের’ আগে ছিলনা। দুটো কাউন্টার। একটি হল্যান্ডের ইমিগ্রেশন, সেটি পেরিয়ে ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন। পাসপোর্ট এগিয়ে দিতেই হল্যান্ডের কাউন্টারে যে মহিলাটি ছিলেন এক পলক দেখে ফেরত দিলেন। এগিয়ে গেলাম ব্রিটিশ কাউন্টারের সামনে। পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিতেই তার তাবৎ প্রশ্নকোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কদিন থাকবো, জন্ম কী পাকিস্তানে? ইত্যাদি ইত্যাদি। ভেতরে ভেতরে খুব বিরক্তি হচ্ছিলাম। কিন্তু বল তার কোর্টে, ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ। ব্রিটিশ এই বেয়াদপ গোছের কর্মচারী আমাদের ইউরোপীয় পাসপোর্ট দেখে এমন করছে, বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখলে কী করতো কে জানে। যাই হোক, সে একসময় পাসপোর্ট ফেরত দিলো। দিতে বাধ্য হলো। তার তো আটকানোর কোন পথ নেই। আবারো অপেক্ষার পালা। বলা হলো ট্রেন আধ ঘন্টা লেইট। ট্রেন এলে সবাই যার যার নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়লাম। আমার সামনে মুখোমুখি এক যাত্রী। সামনে ছোট্ট ল্যাপটপ খুলে আছে, সাথে একটি ইংরেজি বই। তারপর আমাদের চলার পালা। এ নিয়ে পরবর্তীতে লেখা যাবে।

ঠিক হয়ে আছে লন্ডন পৌঁছার পরদিন সকাল ১১টায় আমরা সবাই এক জায়গায় মিলিত হবো। তারপর যে উদ্দেশ্যে দল বেঁধে আসা সেকাজে অনেকটা কোমরবেঁধে নেমে পড়বো। যদিও যেকাজে লন্ডন আসা তা আমার অপছন্দের তালিকার একেবরে শীর্ষে। হল্যান্ড থেকে আমরা এসেছি মোট ৭ জন। আর লন্ডন থেকে যোগ দেবে সপ্তর্ষির ঘনিষ্ঠ ডাচ বান্ধবী কনি। কনির কথা গেল সংখ্যায় লিখেছিলাম। এখন সে লন্ডনে গাইনি বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করছে। কথা ছিল নিপার বাসা থেকে বাসট্রামে গ্রীনস্ট্রীট যাবো। মেট্রো পরিবর্তন, আবার আর একটি গাড়ি ধরো আমার কাছে ঝামেলা মনে হয়। তাই শেষ তক ঠিক হলো ক্যাবে (টেক্সি) যাবো। হল্যান্ডের তুলনায় টেক্সিভাড়া অনেক কম, ২০ পাউন্ড। একই দূরত্বে হল্যান্ড হলে গুনতে হতো কম করে ৪০ পাউন্ড। তাই গায়েও খুব একটা লাগার কথা নয়। অনলাইনে টেক্সি ডাকা হলো। ডাকার পাঁচ/সাত মিনিট বাদেই দুয়ারে দাঁড়ায়ে টেক্সি। অনলাইনে অর্ডার দেয়ার সময় পেমেন্ট করতে হলো। হল্যান্ডে ভিন্ন পদ্ধতি। আগে পে করতে হয়না। কোন দেশে গেলে সুযোগ পেলে ট্যাক্সি চালকের সাথে আলাপ করি। তাতে অনেক সময় অনেক মজার বিষয় জানা যায়। লেখারও উপকরণ হয়। চালককে দেখেই টের পেলাম বাংলাদেশী। আমি তার বাপাশে, সুমনা নিপা পেছনের সীটে। যেতে যেতে তার সাথে শুরু হয় আলাপ, যার সারমর্ম হলো৯ বছর ধরে তিনি আছেন লন্ডনে। নাম জাহাঙ্গীর। এসেছেন ইতালি থেকে। মাঝে ১৯৯৭ সালে হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডাম গিয়েছিলেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, শুনেছিলাম কাগজদেয়া হবে। কিন্তু পাইনি। কাগজহলো কোন একটি দেশে আইনগতভাবে বসবাস করার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট। কথা বলছি, এমন সময় এলো এক মহিলার ফোন। ফোন অনই ছিল। পরে জানলাম, তার স্ত্রী। সিলেটি ভাষায় মহিলা ফোনের ওপাশ থেকে বলে, ‘আসবার সময় পাউরুটি আর পানে নিয়ে আইসো। কথা শেষে বলেন, আমার স্ত্রী। পান খান, তাই না?’ না, তার উত্তর। তাহলে যে উনি আপনাকে পাউরুটি এবং পাননিয়ে যেতে বললেন?’ একটু হেসে বলেন, পান না, ‘পানে‘, এটি ইতালি শব্দ, এর অর্থ দুধ। আলাপী হলেও জাহাঙ্গীর যে দক্ষ চালক নন সেটি প্রমাণ করার জন্যে একবার নয় দুদুবার পাশে চলা অন্য গাড়ির সাথে প্রায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন। গন্তব্যস্থলের কাছাকছি পৌঁছুতেই দেখি পূরবী তার মেয়ে দীপিকা সহ হেঁটে চলেছে। গাড়ির জানালা খুলে ওদের ডাক দেই। চমৎকার রৌদ্রস্নাত দিন। চালককে বলি, ‘আমাদের এখানেই নামিয়ে দেন। বাকিটা পথ আমরা হেঁটে যাবো।‘ (২০২৬)- চলবে।

লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে কবি আল মাহমুদ : স্মৃতির ক্যানভাসে দেখা
পরবর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের সফট স্কিল বাড়াতে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ ইউজিসি’র