সাড়ে ৩ বছর পার, এখনো শুরু হয়নি বিচার

শিশু বর্ষাকে ধর্ষণ ও খুন

হাবীবুর রহমান | সোমবার , ২৯ জুন, ২০২৬ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ

নগরীর জামালখানে ১০০ টাকার লোভ দেখিয়ে শিশু বর্ষাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটির বিচার এখনো শুরু হয়নি। অথচ ঘটনার পর সাড়ে ৩ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস খুনের ১৯ দিনের মাথায় এবং চট্টগ্রামের বাকলিয়ার আলোচিত ৪ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের ২৬ দিনের মাথায় বিচার কার্যক্রম শেষ করা গেলেও প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া বর্ষা কী দোষ করল? এ বিষয়ে প্রশ্ন রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ প্রেশার গ্রুপ তৈরি না হওয়ায় শিশু বর্ষা ধর্ষণ ও খুনের মামলার বিচার দীর্ঘ সময় পরও শুরু করা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির। তিনি বলেন, ঢাকার রামিসা, চট্টগ্রামের বাকলিয়ার ৪ বছরের শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষসহ মিডিয়া মিলে একটা প্রেশার গ্রুপ হয়ে রাষ্ট্রকে চাপ দিয়েছিল। সেই চাপে পড়ে রাষ্ট্র অল্প কিছুদিনের মধ্যে উক্ত দুই ঘটনায় বিচার শেষ করেছে। আমাদের দেশে প্র্যাকটিস হচ্ছে, ধাক্কা লাগাও, দাবি আদায় করো। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধান বলছে, রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকারের অধিকারী। সে জায়গায় আমরা বর্ষাকে বৈষম্যের শিকার হতে দেখেছি। রাষ্ট্রের উচিত সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা।

২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার কমবেশি হবে। জামালখানের শিকদার হোটেল এলাকার একটি গলির ভেতরে একটি মুদি দোকানের গুদামে পেঁয়াজের বস্তার উপরে পড়েছিল রক্তাক্ত একটি দেহ। সাত বছর বয়সী শিশু বর্ষার দেহ ছিল সেটি। সেদিন অভিযুক্ত লক্ষণ দাশ শুধু যৌন কামনা চরিতার্থ করেনি, কান্নারত শিশু বর্ষার নাকমুখ, হাত চেপে ধরে মৃত্যুও নিশ্চিত করেছিল। মৃত্যু হয়েছে বুঝতে পেরে একটি বস্তায় বর্ষার লাশ ঢোকানো হয়। যে ১০০ টাকার লোভ দেখিয়ে গুদাম পর্যন্ত শিশু বর্ষাকে ডেকে নিয়েছিল সেই নোটটি রক্তে লাল হয়েছিল। মুদি দোকানের কর্মচারী লক্ষণ দাশ ১০০ টাকার নোটটিও বস্তায় ঢোকায়। বস্তার ভেতর বর্ষার কাপড়ও ভরে। গিঁট দেওয়ার পর পাশের নালায় বস্তাটি ফেলে দেয়। গুদামে ফিরে দেখতে পায়, পেঁয়াজের বস্তার পাশে পড়ে রয়েছে বর্ষার জুতা জোড়া। এটা তো প্রমাণ। প্রমাণ রাখা যাবে না। কোনো চিহ্নও রাখা যাবে না। এসব ভেবে লক্ষণ জুতা নিয়ে নালায় ফেলে দেয়।

শিশু বর্ষাকে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ করে খুন ও লাশ গুমের চেষ্টার মামলায় গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এতে লক্ষণ দাশকে একমাত্র আসামি করা হয়। শিকদার হোটেলের পাশের শ্যামল স্টোরের কর্মচারী ছিল সে। স্টোরটির গুদামে শিশু বর্ষাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। চিপসসহ নানা কিছু কেনার জন্য শ্যামল স্টোরে প্রায় যেত বর্ষা। এ কারণে সে লক্ষণকে চিনত। ঘটনার দিন গুদামের সামনে দাঁড়িয়েছিল লক্ষণ। তখন বর্ষা সম্ভবত দোকানের দিকে যাচ্ছিল। লক্ষণ তাকে বলে চিপস কিনতে ১০০ টাকার জন্য গোডাউনে আসো। পূর্ব পরিচিতির কারণে বর্ষা তার পিছু পিছু গোডাউনে গিয়েছিল। গুদামে আসার আগেই বর্ষার হাতে কথামতো ১০০ টাকার একটি নোট দেয় লক্ষণ, যা পরে রক্তাক্ত হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া চার্জশিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার তিন দিন পর শিকদার হোটেলের পাশের নালা থেকে বস্তাবন্দি বর্ষার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ তদন্তে নামে। নানা তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করে। একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়। সেই ফুটেজে ধরা পড়ে যায় লক্ষণ দাশ। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে প্রেরণ করা হলে সে বর্ষাকে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা, এমনকি বস্তায় ভরে লাশ নালায় ফেলার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ঘটনার পর বর্ষার মা ঝর্ণা বেগম বাদী হয়ে একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। পরে লাশ উদ্ধারের পর তিনি নগরীর কোতোয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছে লক্ষণ।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও ডিএনএ রিপোর্ট দাখিলে দীর্ঘ সময় চলে গেছে, যার কারণে চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হয়। চার্জশিট দাখিলের পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালএ মামলাটি বদলি করা হয়। চলতি বছরের ৩০ মার্চ সেটি গৃহীত হয়। ১৭ মে চার্জ গঠনের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আসামিকে হাজির না করায় চার্জ গঠন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২ মাস পর আগামী ১৬ জুলাই চার্জ গঠনের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়।

তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালএ থাকা মামলাটি শুরুর দিকে ভুলবশত চট্টগ্রাম মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছিল। পরে বাদীর আবেদনে সেটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালএ বদলি করা হয়। এতে একটি ধার্য তারিখ ও প্রায় ২ মাস সময় অপচয় হয়। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক সমাপ্ত করতে আর কত সময় অতিবাহিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। দেরি হওয়ায় সাক্ষী হাজির করা মুশকিল হবে বলে জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধটেকনাফে দিনদুপুরে হোমিও চিকিৎসককে অপহরণ
পরবর্তী নিবন্ধপতেঙ্গায় মোবাইল বিস্ফোরণে দগ্ধ ব্যক্তির মৃত্যু