পরীক্ষার ফলাফল প্রতিটি শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বড় মাইলফলক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অনেক শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়, বিশেষ করে এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে একটি পুরো বছর পিছিয়ে পড়ে। আমাদের দেশে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী দুই বিষয়ে ফেল করলে তাকে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই এক বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে একটি মূল্যবান বছর ঝরে যায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় চরম মানসিক হতাশা, যা অনেক সময় অনেক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা জীবন থেকেই চিরতরে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু আমরা যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব যে তারা এই সমস্যার এক চমৎকার ও যুগোপযোগী সমাধান বের করেছে।
উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা বলা যেতে পারে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষাবোর্ড সিবিএসই এবং বিভিন্ন রাজ্য বোর্ডে কম্পার্টমেন্টাল এক্সাম বা সম্পূরক পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। মূল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, সাধারণত দুই মাসের মধ্যে, এই বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। যেসব শিক্ষার্থী এক বা দুটি বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারেনি বা ফেল করেছে, তারা এই সুযোগটি গ্রহণ করে মাত্র দুই মাসের মাথায় পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে তাদের মূল শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয় না এবং তারা অন্য সহপাঠীদের মতোই যথাসময়ে একাদশ শ্রেণি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন এবং এদের মধ্যে পাস করেছে ৭৭,৪৫৩ জন শিক্ষার্থী। শুধু চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে মোট ৫৩ হাজার ২২৯ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যার মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছে ৩৫ হাজার ৮৬৬ জন এবং গণিতে ২৫ হাজার ৭৭৩ জন। ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া হলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাস করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় এক বছর পর আবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অনেকেই ঝরে পড়বে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর দুই মাসের মধ্যে দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এক বছর অপেক্ষা করার সময়টি একজন উঠতি বয়সী কিশোর বা তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এই সময়ে সমাজে ও পরিবারে তাকে নানামুখী মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় পড়াশোনার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে যায় এবং ড্রপআউট বা ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক সময় বাল্যবিবাহের মতো অপ্রীতিকর সামাজিক ব্যাধি নেমে আসে। দুই মাস পর পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হলে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।
প্রথমত, শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার গতি ধরে রাখতে পারবে, কারণ পরীক্ষার পড়া তাদের স্মৃতিতে তখনও তাজা থাকে। দ্বিতীয়ত, এটি শিক্ষাবর্ষের অপচয় রোধ করবে এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ সুগম করবে। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য এটি বাস্তবায়নে কিছুটা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও, শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই আধুনিক ও মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলো যদি সফলভাবে এই পদ্ধতি পরিচালনা করতে পারে, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও তা বাস্তবায়ন করা পুরোপুরি সম্ভব। পরীক্ষা ব্যবস্থা হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশ ও উত্তরণের হাতিয়ার, ঝরে পড়ার কারণ নয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় মূল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার দিনক্ষণ নির্ধারণের নীতিমালা তৈরি করতে পারে। এটি বাস্তবায়নে ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া যেতে পারে পুনর্নিরীক্ষণ ও প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য, এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণ করে দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা যেতে পারে। এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য বোর্ডের প্রশাসনিক কাঠামো ও ডিজিটালাইজেশন জোরদার করা প্রয়োজন। ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও কেন্দ্রভিত্তিক সীমিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খুব সহজেই কম খরচে ও অল্প সময়ে এই বিশেষ পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থী ১ বা ২ বিষয়ে অকৃতকার্য হবে, তাদের জন্য এই অন্তর্বর্তীকালীন দুই মাসে বিশেষ অনলাইন ক্লাস বা সংক্ষিপ্ত রেমিডিয়াল কোর্সের আয়োজন করা যেতে পারে, যেন তারা ঘাটতিগুলো দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে।
পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এটি শিক্ষার্থীদের অহেতুক ঝরে পড়া রোধ করবে, তাদের মধ্যে পড়াশোনার মানসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং সামাজিক ও পারিবারিক মানসিক চাপ বহুলাংশে কমিয়ে আনবে। সর্বোপরি, পাসের হার ও শিক্ষার মানের ভারসাম্য রেখে বিশ্বমানের একটি আধুনিক, সহানুভূতিশীল এবং কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ডে সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য মূল ফলাফলের দুই মাসের মধ্যে সম্পূরক পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। এতে দীর্ঘ এক বছর নষ্ট হওয়ার মানসিক যন্ত্রণা ও ঝরে পড়ার ঝুঁকি কমবে, বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। ভারতের সিবিএসই বা পাকিস্তানের বোর্ডের মতো সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নীতি তৈরি করে খুব সহজেই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটি শুরু হলে শিক্ষার্থীরা পড়ার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে এবং মূল শিক্ষাবর্ষ অক্ষুণ্ন রেখে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের দিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবে।
লেখক: শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক।











