প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার পাশাপাশি একটি বয়সবান্ধব সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘতর জীবনের জন্য ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা’। আমাদের সামনে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে। মানুষ যখন আগের চেয়ে দীর্ঘ জীবন লাভ করছে, তখন সেই দীর্ঘ জীবনকে কীভাবে আরও সুস্থ, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অর্থবহ করা যায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার একটি বড় অর্জন। তবে দীর্ঘায়ু নিজেই শেষ কথা নয়। একজন মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন, কিন্তু যদি সেই জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি অসুস্থতা, একাকীত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা প্রয়োজনীয় পরিচর্যার অভাবে ভোগেন, তাহলে সেই দীর্ঘায়ুকে পরিপূর্ণ জীবন বলা কঠিন ।
বাংলাদেশও বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে প্রবীণদের কল্যাণকে শুধু পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি এখন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা এবং জাতীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রবীণদের জন্য আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, আর্থাইটিস, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, একাকীত্ব, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা শুধু রোগ নিরাময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিরোধ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুনর্বাসন, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি প্রবীণদের সামাজিক অবস্থান নিয়েও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। বয়স বৃদ্ধি মানেই একজন মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, মূল্যবোধ ও বাস্তব উপলব্ধি সমাজের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।
আমাদের মনে রাখতে হবে আজকের প্রবীণরাই একদিন তাঁদের শ্রম, মেধা ও ত্যাগের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশকে গড়ে তুলেছেন। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তাই কোনো দয়া নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব । একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তি ও দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার এই সময়ে পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব যেন প্রবীণদের একাকীত্বের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও আমাদের সচেতন হতে হবে।
দীর্ঘায়ুর এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের পরিকল্পনা হতে হবে আরও সুদূরপ্রসারী। প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ ও সহজলভ্য গণপরিবহন, উপযোগী বাসস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ এবং প্রয়োজনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা–এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, পরিবার এবং সাধারণ নাগরিক সবার সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু একটি দিবস পালন করে প্রবীণদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হওয়া উচিত তাঁদের জীবন ও প্রয়োজন নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম), চট্টগ্রাম বিভাগীয় শাখা দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণদের কল্যাণ, অধিকার, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করে আসছে। আমাদের প্রত্যাশা, সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হবে যেখানে একজন প্রবীণ মানুষ বয়সের কারণে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা অপ্রয়োজনীয় মনে করবেন না; বরং তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ সদস্য হিসেবে জীবনযাপন করতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬–এর প্রতিপাদ্য আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় দীর্ঘ জীবন শুধু বেশি বছর বেঁচে থাকার নাম নয়; দীর্ঘ জীবনকে সুস্থ, নিরাপদ, সক্রিয়, সম্মানজনক ও অর্থবহ করে তোলাই আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত। আসুন, প্রবীণদের জন্য শুধু সহানুভূতি নয় অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করি। একটি প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম), চট্টগ্রাম বিভাগীয় শাখা।









