সমকালের দর্পন

আমেরিকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অবঃ) | রবিবার , ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ

আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর নানা প্রান্তে নিজেকে অনেকগুলো যুদ্ধে জড়িয়েছে। অথচ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষ প্রান্তে জাপানের নাগাসাকিহিরোশিমা’য় আনবিক বোমা বর্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীতে যে অমানবিকতার অবতাড়না করেছে, তার জন্য আমেরিকাকে বিবেকের তাড়নায় দগ্ধ হওয়ার কথা। এটি তো হয়ইনি বরং আমেরিকা পৃথিবীব্যাপী নিজেকে নতুন নতুন যুদ্ধে জড়িয়েছে, পৃথিবীতে নানা তাণ্ডব চালিয়ে অবাধে মানুষ হত্যা করেছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্যকোরিয়ান যুদ্ধ ১৯৫০৫৩, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯৬৪১৯৭৫, পারসিয়ান গাল্ফ যুদ্ধ ১৯৯০৯১, আফগান যুদ্ধ ২০০১২১, ইরাক যুদ্ধ ২০০৩১১, ইরান যুদ্ধ ২০২৫ থেকে চলমান। এর বাইরেও ডোমিনিকান গৃহ যুদ্ধ ১৯৬৫৬৬, গ্রানাডা দখল ১৯৮৩, পানামা খাল দখল ১৯৮৯, বসনিয়ান যুদ্ধ ১৯৯৫, ১৯৯৯, লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ ২০১১। আরব বসন্তের নামে পুরা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক অভাবনীয় তাণ্ডব পরিচালনা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ভেনেজুয়েলায় দুনিয়ার যাবতীয় রীতিনীতি, আইন কানুন ভঙ্গ করে মধ্যরাতে কারাকাসে এক সামরিক অভিযান চালিয়ে সেদেশের প্রেসিডেন্ট মাদুরু’কে স্বস্ত্রীক গ্রেফতার করে আমেরিকান কারাগারে বন্দী করা ইত্যাদি বিশ্বব্যাপী আমেরিকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদের আরো একটি জলন্ত উদাহরণ। মাদুরু’র গ্রেফতার পরর্বতী আমেরিকানরা ভেনেজুয়েলার ১৭ টি তেলক্ষেত্রের একচ্ছত্র দখল নিয়ে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মালিক বনে গেছেন। এক হিসাবে দেখা গেছে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর আমেরিকা তার ভূঅর্থনৈতিক স্বার্থে পৃথিবীর ৩০ (ত্রিশ) দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে নিজেকে জড়িয়েছে।

আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসাবে যেখানেই আমেরিকার গৃহীত নীতি কৌশলের বিরুদ্ধে যারাই অবস্থান নিয়েছে তাদের কখনো ‘এক্সিস অব এভিল’ কখনো ‘টেরোরিস্ট’ কখনো ‘মিলিট্যান্ট’ ইত্যাদি অভিধায় অভিষিক্ত করে আমেরিকা তাদের উপর আক্রমণ চালিয়েছে বা চালিয়ে যাচ্ছে। এই আক্রমণে কোন কোন দেশের তাবেদার সরকারগুলোও আমেরিকার সাথে হাত মিলায়। এটি তারা করে অবশ্য আমেরিকার রোষানল থেকে বাঁচতে এবং ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে।

সাম্প্রতিক বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্‌্রাম্প আমেরিকার ক্ষমতারোহণের পর থেকে আমেরিকানদের চালু করা ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’কে এক চূড়ান্ত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এ ধারাকে আমরা ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসাবে আখ্যায়িত করতে পারি। এর সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্যারিফকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদের নতুন হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ এবং ‘ট্যারিফ আরোপ’ এ দুটির চুড়ান্ত রূপ হল আমেরিকার অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ। এ সন্ত্রাসবাদ থেকে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশও পরিত্রাণ পায়নি।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৯ ফেব্‌্রুয়ারি ২০২৬ অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার গঠন হওয়ার জন্য মাত্র ৩ দিন অপেক্ষা না করে অত্যন্ত তড়িগড়ি বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি অসম বাণিজ্য চুক্ষি সাক্ষর করে অথবা সাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক অর্থাৎ ১০ আগস্ট ২০২৬ ‘দি নিউ এজ’ পত্রিকার একটি রিপোর্ট থেকে এখানে উদ্বৃতি দিলে পাঠক বুঝতে পারবেন বা পাঠকের কাছে এটি স্পষ্ট হবে এই চুক্তিকে অসম বা অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদজনিত বলছি কেন ।

দি নিউ এজ’ এর রির্পোট অনুযায়ী জুলাই ২০২৬ এ বাংলাদেশের ক্রয় আদেশ দেওয়া আমেরিকান প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম পড়েছে ৩৩২ ডলার যা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কিনলে পড়ত ২৯৭.৯২ ডলার্‌। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে প্রতি টনে যেমন অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ ডলার প্রদান করতে হচ্ছে তেমনি ব্লেক সী তথা ইউক্রেনরাশিয়া অঞ্চল থেকে এ গম কিনলে বাংলাদেশকে টন প্রতি প্রায় ৭০/৭৫ ডলার কম মূল্য পরিশোধ করতে হত। ব্লেক সী তথা ইউক্রেনরাশিয়া অঞ্চল থেকে গমের জাহাজ বাংলাদেশে আসতে সময় নেয় ১৫ দিনের মত আর আমেরিকা থেকে একই জাহাজ সময় নেয় ৫৫ দিন।

সামরিক এবং অর্থনৈতিক এইসব হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী ভূরাজনীতিকে যেমন এক ধরনের টালমাটাল অবস্থায় নিপতিত করেছে, তেমনি নানা অর্থনৈতিক অবরোধ যা সন্ত্রাসের পর্যায়ে পড়ে তার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকেও বির্পযস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতির এই বিপর্যয়কর অবস্থা আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অতি সাধারণ মানুষদের কোথায় ঠেলে দিয়েছে তা আমার সাথে দুইজনের কথোপকথন থেকে ধারনা করতে পারবেন।

২৭ আগস্ট ২০২৬ চট্টগ্রাম শহরের আসকার দিঘির উত্তর পাড়ে আমি সি এন জি টেক্সির অপেক্ষায়। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। রাস্তাঘাটে টেক্সি কম। কারণ গ্যাসের সংকট। অবশেষে ইশারা করতে একটি টেঙি থামে, আমি চালককে আমার গন্তব্য খুলশি বলে, ভাড়ার কথা জিজ্ঞেস করি। টেক্সি চালক বলেন ১২০ টাকা। আমি উঠে পড়ি। টেক্সি চলা শুরু করতে, চালক আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন স্যার আপনি ভালো মানুষ, কোন দরাদরি করলেন না। দরাদরি করলে হয়ত ভাড়া আরো ২০ টাকা কম হত। এবার চালক তার কষ্টের কথা বলা শুরু করলেন। স্যার গত ভোর রাত থেকে ৬ ঘণ্টা টানা লাইনে অপেক্ষা করে শেষে ১৪০ টাকার গ্যাস ভরেছি। এখন র্নিঘুম রাত কাটানোর পর টেক্সি চালাচ্ছি, ভয় লাগে মাথা টাথা ঘুরে কোন দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে বসি। তিনি বলেই যাচ্ছেন, স্যার আমার এক ছেলে এক মেয়ে কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। আর দুজন স্কুলে। আমি আমার স্ত্রী এই আমরা ৬ জন। টেক্সির মালিককে দিতে হবে ১২০০ টাকা। এখন টেক্সি চালিয়ে কয় টাকা পাব জানি না। টেক্সি মালিকের ভাড়া দিয়ে কয় টাকা থাকবে, ৬ জনের পরিবার কীভাবে চালাব। গ্যাস যদি ঠিক মত পেতাম, যদি সারা রাত লাইনে অপেক্ষা না করে ঠিক মত একটু ঘুমাতে পারতাম তবে কোনও কষ্ট থাকত না। গন্তব্যে চলে আসাতে আমি ভাড়া চুকিয়ে নেমে পড়ি।

দ্বিতীয় ঘটনা। আগন্ত্তুক আমার বাসায় এসেছেন। তিনি পেশায় পলিটেকনিক ইঞ্জিনিয়ার। তিনি যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন তা বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। নাম করা একটি শিল্প কারখানার নাম বললেন। তিনি জেনে এসেছেন ঐ কারখানার মালিকের সাথে আমার পরিচয় আছে। আগন্ত্তুক এর বিশ্বাস আমি একটু ঐ মালিকের সাথে কথা বললে বা সুপারিশ করলে তার একটি ব্যবস্থা হতে পারে। আমি মাইক্রোফোন অন করে ঐ মালিককে ফোন করি। কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেই উনী বললেন “ভাই শারীরিকভাবে তো আছি, তবে মনে শান্তি নাই। এত কষ্ট করে মিল কারখানা করে এখন বিদ্যুৎ গ্যাস ইত্যাদির সমস্যায় পড়ে কারখানা বন্ধ করে দিব চিন্তা করছি” ! আমি টেলিফোন রেখে আগন্ত্তুকের দিকে দেখি, হতাশ মানুষটি যেন নিরাশার গভীর বিহবরে নিমজ্জিত। শেষ আবেদন “একটু চেষ্টা করে দেখবেন” বলে তিনি চলে যান।

এ হল আমেরিকাইসরাইলের শুরু করা ইরান যুদ্ধের আমাদের সাধারণ মানুষদের জন্য বয়ে আনা দুর্ভাগ্যজনক পরিনতি। এ যুদ্ধ আমাদের জ্বালানী খাতকে গভীর সংকটে নিপতিত করেছে, ফলশ্রুতি আমাদের মিল কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বৈদেশিক ক্রেতারা তাদের ক্রয় আদেশ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে, আমাদের কৃষক সার সংকটের মুখামুখি হয়ে সার লুটে অংশ নিচ্ছে, সারের উচ্চ মূল্যে কৃষকের সার কিনার সক্ষমতা কমে যাওয়াতে খাদ্য উৎপাদনে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এতে দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করা সাধারণ মানুষগুলির খাদ্য প্রাপ্তি অনিশ্চিতের মুখোমুখি। এর প্রভাব পড়বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্বক্ষেত্রে।

আর্ন্তজাতিক নানা উদ্যোগী গবেষণা সংস্থা সমূহের গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অবরোধ যেসব ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য করে আরোপ করা হয় তারা এর দ্বারা খুব একটা বেকায়দায় পড়ে না। তারা নানা কৌশলে এর থেকে পাড় পেয়ে যায়। অর্থনৈতিক অবরোধে ক্ষত বিক্ষত হয় সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে বিশ্বের রাঘব বোয়ালরা কীভাবে ইরান যুদ্ধে আমেরিকান অর্থনৈতিক এ অবরোধ থেকে বিপুল আয়ের পথ করে নিয়েছে তা এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হবে।

বিশ্বের বৃহৎ ৮টি বহুজাতিক তেল কোম্পানী ইরান যুদ্ধের সুযোগে সম্মিলিতভাবে শুধু এক প্রান্তিকেই মুনাফা করেছে ৯৩ (তিরানব্বই) বিলিয়ন ডলার। এই ৮টি বহুজাতিক কোম্পানী হল আরামকো, বি পি, শেল, ইকোনর, টোটাল এর্নাজি, এ্যানি, শেভরন এবং এঙন মোবিল। পাঠক জেনে অবাক হবেন এই একেকটি কোম্পানী প্রতি মিনিটে মুনাফা অর্জন করেছে ৭০০০০০(সাত লক্ষ) ডলার। কোম্পানি গুলিকে অবারিত মুনাফার এই সুযোগ করে দেয় অর্থনৈতিক অবরোধ। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয়, ফলে ৬০৭০ ডলার ব্যারেল দামের তেল ব্যারল প্রতি উঠে যায় ১২০১২৬ এ। এ থেকেই বুঝা যায় ধনবাদী বিশ্বের বহুজাতিক কোম্পানীগুলি তৃতীয় বিশ্বের মানুষ গুলিকে কীভাবে শোষণের যাতাকলে পিষ্ট করেছে।

ইরানের উপর অর্থনৈতিক যাতাকলের উপলক্ষটি তৈরী হয়েছিল ২০০৫ সালে। মূলত ইরাক যুদ্ধের পরপরই ইসরাইল এবং আমেরিকান ‘ডিভ স্টেট’ এবং ‘নিউকন তথা নিউ কনজারভেটিব’ যারা মূলত ইহুদিবাদী এবং ইসরাইলআমেরিকার স্বার্থকে এক করে দেখে, এদের তৎপরতা ছিল ইরান আক্রমণের। ইরাকে আমেরিকাবৃটেন চক্রের মানব বিধ্বংসী কোন ধরনের অস্ত্র উপস্থিতি’র বা আলামত জনসমক্ষে তুলে ধরার ব্যর্থতার কারণে আমেরিকা ইউরোপের সাধারণ মানুষের অধিকাংশই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। জনমতের বাইরে গিয়ে ‘ডিভ স্টেট’ এবং ‘নিউকন তথা নিউ কনজারভেটিব’এর দুষ্টচক্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে ব্যর্থ হয়। এরই মাঝে অত্যন্ত সুকৌশলে পারমানবিক শক্তি সংস্থা তথা ‘আই এ ই এ’ (ইন্টারন্যাশনাল এ্যাটমিক এর্নাজি এজেন্সি) এর একটি রিপোর্টকে ‘ডিভ স্টেট’ এবং ‘নিউকন’ চক্র সামনে নিয়ে আসে। এই রিপোর্টে ‘আই এ ই এ’ উল্লেখ করে ইরান ‘এন পি টি’ (নন প্রলিফেরেশান ট্রিটি) ভঙ্গ করেছে। এ রিপোর্ট জাতি সংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ ডিসেম্বর ২০০৬ সাল ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। আমেরিকান ‘ডিভ স্টেট’ এবং ‘নিউকন’রা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল এবং অকার্যকর করার কাজে মরিয়া হয়ে উঠে। অথচ পরবর্তীতে দেখা গেছে ‘আই এ ই এ’র রিপোর্ট ছিল একটি অজুহাত মাত্র। (চলবে)

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন পথ : বিএসসি-র নতুন মাইলফলক