এক আগস্টে তাকে সপরিবার হত্যা করা হয়, এই আরেক আগস্টে তার বাড়িটিও ভাঙা হয়। আগস্ট এমনই বেদনাবিধূর এমনই কলংকময়। আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলের নরম পলিমাটির সোঁদা গন্ধ মাখা সরল সিধা কৃষক, আউল বাউল, সাধক সুফি মুনি ঋষিদের এক সুরে এক তালে নিয়ে আসা, উত্তরের সাহসী নুরুলদীনদের মুক্তির উচ্চ কণ্ঠে ডাক, তিতুমিরের বাঁশের কেল্লার লেলিহান শিখা, হাজী শরীয়তের চারণ বেশে রাঢ় বাংলার মাঠে ময়দানে স্বাধীনতার বীজ ছড়ানো, বীর চট্টলায় হাবিলদার রজব আলী’র বৃটিশদের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহ, জালালাবাদের পাহাড়ে সূর্যসেনদের আত্মদানের মহোৎসবের অনন্য ইতিহাসকে ধারণ করে, পূর্বের গারো, সাঁওতাল, মনিপুরি, খাসিয়া দক্ষিণ পূর্বের পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, পাংখোদের নানা রঙ মননে ছড়িয়ে নিয়ে দক্ষিণ পশ্চিমের সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অমিত সাহসকে নিজের মাঝে আত্মস্থ করে দক্ষিণের সুনিল সাগরের বিশালতাকে চেতনায় ধারণ করে বার ভূঁইয়াদের স্বাধীনতার স্পৃহা, পাহাড়পুর, মহাস্থান, শালবন বিহার, পদ্মা মেঘনা, যমুনা ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, কর্ণফুলি, সন্ধ্যা, গোমতি’র উচ্ছ্বাস আর জোয়ার ভাটাকে অবলীলায় নিজের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে, পিঙ্গল আর্যদের সাথে পেরে না ওঠা, শ্যামল বর্ণের দ্রাবিড়ীয় গোষ্ঠীর যে মানুষেরা নিরাশ্রয়ের আকুতির আর্তনাদ এ এই ব–দ্বীপের বাতাসকে একদিন ভারী করেছিল সে আর্তনাদ, সে বোবা কান্না কান পেতে শুনে, আমাদের এই শ্যামল সুজলা সুফলা মাটির কোয়েল, দোয়েল, কোকিল, শ্যামা, ফিঙে, ময়না, টিয়াদের পারলৌকিকতার গানকে ধারণ করে, রবীন্দ্র–নজরুলের অবিনাশী সৃষ্টি, জীবনান্দের অপরূপ রূপসী বাংলার রূপে ডুবে বুঁদ, রাখাল রাজার বেশে ইতিহাসের আল বেয়ে হেঁটেছেন বাংলার অলিগলি, হাঁটতে হাঁটতে, দেখতে দেখতে, বুকে টানতে টানতে সব কিছুকে আত্মস্থ করে একদিন তিনি অগ্নিগর্ভ বজ্রকণ্ঠ ধারণ করেন, তার বজ্রকণ্ঠের বজ্র নিনাদ, কে রুখে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
ঐ পাড়ে পাড়ি দেওয়া শিল্পাচার্য জয়নুলকে, পটুয়া কামরুলকে বা শিল্পী সুলতানকে যদি আজ বলি আপনাদের সময় তো এখন অফুরন্ত, বাংলার মাঠ ঘাট, সবুজ শ্যামল, পাখপাখালি, অগণিত দুঃখী মানুষের মুখ যদি একটি মুখে আঁকতে বলি, আমি নিশ্চিত তারা রঙ তুলিতে বজ্রকণ্ঠ মুষ্টিবদ্ধ তর্জনীর রেসকোর্সের সেই মুখটিই আঁকবেন আমার অজ পাড়া গাঁ আঁধার মানিকের কুমার পাড়ার আশি ঊর্ধ্ব কংকালসার মাথা নুইয়ে নুইয়ে হাঁটা অশ্বিনী কাকাকে যদি বলি, এই নাও বাংলার কাদা মাটি, বানাও দেখি সারা বাংলার একটি প্রতিচ্ছবি। আমি জানি ফোকলা দাঁতের অশ্বিনী কাকা হেসে বলবেন এত বুকেই আছে, তেমন সময় লাগবে না বানাতে– ঐ রেসকোর্সের বজ্রকণ্ঠ মুষ্টিবদ্ধ তর্জনীর সেই মুখটিই তো!
এই উপ–মহাদেশের দেশগুলিতে রয়েছে অসংখ্য জাতিসত্তা, অপ্রিয় হলেও সত্য তারা অনেকেই ইতিহাস ঐতিহ্যে, সংগ্রাম আর আত্মোৎস্বর্গের মহিমায় বাঙালি জাতির চেয়ে সমুজ্জ্বল–সমৃদ্ধ। যেমন পাঞ্জাবী, মারাঠি, রাজপুত, সিন্ধি, বালুচ, অহোম, নাগা, মনিপুরি। এমনকি আমাদের নিকট প্রতিবেশী মায়ানমারের শান, মন, কারেন, কাচিন। এদের অনেকেই সুদীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষায়, আত্মদানে গৌরবমণ্ডিত হলেও কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। প্রশ্ন আসতে পারে তবে আমরা পেরেছি কীভাবে?
উত্তর ঐ বজ্রকণ্ঠ, ঐ তর্জনী উঁচু মুষ্টিবদ্ধ হাতের শক্তিতে। শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক আবুল ফজল তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন “দেড় হাজার মাইলের দূরবর্তী জিন্দানখানা থেকে তিনি অর্থাৎ তার নাম, আদর্শ আর তার আত্মা পুরুষই যেন গত ন মাস ধরে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে যুগিয়েছে মরণ পণ সংগ্রামের প্রেরণা। যে প্রেরণা অজেয় শক্তি হয়ে আমাদের জন্য ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতাকে পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের নির্মম কবল থেকে। অনুপস্থিত সেনাপতির এমন সেনাপতিত্ব সত্যই অভিনব, ইতিহাসে এমন নজির বিরল”।
আমাদের চিন্তাশীল জগতের পুরোধা পুরুষ সরদার ফজলুল করিম তার ‘এবারের সংগ্রাম’ লেখাটিতে উল্লেখ করেছেন “আমি জানতাম ৭ই মার্চের রেসকোর্সের নানা শংকা আশংকাকে উপেক্ষা করে যে মানুষটি হাজির হবেন তার দৈর্ঘ এবং সাহস অতীতের সকল দীর্ঘদেহীকেই অতিক্রম করে যাবেন”। এবং সেদিন তিনি গিয়েছিলেনও!
আমাদের সংসদের মাননীয় স্পীকার (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) মেজর হাফিজ উদ্দিন, উনার লিখিত বই, ‘সৈনিক জীবন–গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’। এ বইয়ের ৮২–৮৩ পৃষ্ঠায় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যশোর সেনানিবাস থেকে বিদ্রোহের পটভূমি এবং বিদ্রোহের পরপরই সাধারণ মানুষের যে অনন্য ঐতিহাসিক অনুভূতি তা প্রকাশ করেছেন এইভাবে “প্রায় আটশ গজ দূরে অবস্থিত গ্রামে পৌঁছে দেখি এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। শত শত গ্রামবাসী কোদাল, খন্তা, কুড়াল, বর্শা ইত্যাদি দেশি অস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের অভিনন্দন জানিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে তারা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। … ..চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান তার নামে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছেন।
জেনারেল জিয়াউর রহমান এর লেখা – ‘Birth of Nation’ ২৬ মার্চ ১৯৭২ সালে তৎকালীন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ লেখায় জেনারেল জিয়া লেখেন – Since my school days I was deeply hurt by the attitude of the Pakistanis .. From that time I carried a single dream in my Pakistan’s existance. অর্থাৎ পাকিস্তানীদের আচরণে স্কুল জীবন থেকে আমি মনোবেদনা আর যাতনায় ভুগছিলাম। একটি তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমি সেই সময় থেকে বয়ে বেড়িয়েছি, সুযোগ পেলে পাকিস্তানের অস্তিত্বে আঘাত হানার। জেনারেল জিয়া ঐ লেখায় আরো লিখেছেন The historic March 7 (1971) – space at race Course Maidan appeared to us the green single . ৭ই (১৯৭১) মার্চে রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে আমরা সবুজ সংকেত পেয়ে যাই। আমরা আমাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি।
ভূ–রাজনীতিতে লিজেন্ড ফিদেল কাস্ট্রো তাকে নিয়ে লিখেছেন “আমি হিমালয় দেখিনি, আমি তাকে দেখেছি, সাহসে এবং ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন হিমালয় সম”। ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামী নেতা তার চোখে “তার চরিত্র বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি ছিলেন আপসহীন বিশাল হৃদয়ের এক সংগ্রামী নেতা”।
আহমদ ছফা বাংলা কথাসাহিত্য এবং চিন্তা চেতনা এবং মননশীলতার একজন অন্যন ব্যক্তিত্ব। এই আহমদ ছফা তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা সময়ে সময়ে করেছেন। এসবের পরও তিনি তাকে নিয়ে লিখেছেন ‘আজ থেকে অনেক দিন পর হয়তো কোন পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেন জানো, খোকা আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলো যার দৃঢ়তা ছিলো, তেজ ছিলো আর ছিলো অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্ত্তু মানুষটির হৃদয় ছিলো, ভালবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্ত্তু চিক চিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জোস্নারাতে রুপোলি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্ত্তু আমাদের অন্তরে শান্তি আর নিশ্চয়তা বোধ জাগিয়ে তোলে তা হল তার ভালোবাসা। জান খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান’। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এই কথাটি দিয়ে শেষ করি ‘তিনি যা তিনি তাই, তার আসন ধূলিমলিন হবার নয়’।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












