সাম্প্র্রতিক সময়ে দেশে আইন–শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তুচ্ছ ঘটনা, আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো বিরোধের জেরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে মানুষ। পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে একদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এক শ্রেণির মানুষ পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ– কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়ে গেছে। সামান্য কারণেই খুনের ঘটনা ঘটছে। সমাজ, পরিবার বা প্রতিবেশীর সুসম্পর্ক কমছে। তাঁরা বলেন, ‘দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের বাইরে প্রতি বছর ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রে প্রাণ দিতে হচ্ছে গড়ে ক’হাজার মানুষকে। সরকারি হিসাবে কম হলেও খুন হচ্ছেন বহু মানুষ। এ কেবল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক। এই ব্যাধি সর্বত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদ, দেশি–বিদেশি বৃহৎ ধনী,পুলিশ প্রশাসনের উচ্চস্তরের মধ্যে যে লুটেরা–জোট গড়ে উঠেছে, সেটা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিচ্ছে সর্বত্র।’
কেন বাড়ছে এমন অপরাধমূলক ঘটনা? বিশেষজ্ঞরা তার মূল কারণ হিসেবে বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, সম্পদের লোভ, বেকারত্ব, ভিনদেশী সংস্কৃতির প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তিতে পর্নোগ্রাফির প্রসার ও সহজলভ্যতা, বেপরোয়া জীবনযাপন, পাচার, কর্তৃত্বের বিরোধ–শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রভাবে সমাজের বিবেক বর্জিত কতিপয় নোংরা মস্তিষ্কের লোক নৃশংস আচরণে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তাই এসব অপরাধ বা নৃশংসতা বন্ধ করতে হলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার অভাব ও বিকৃত মানসিকতার কারণে এমন নির্মমতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতা ও মাদকাসক্তির কারণেও সর্বস্তরে এমন ঘটনা ঘটছে। তাঁরা বলেন, বিত্ত–বৈভবের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন কোথাও কোথাও দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই বন্ধন সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে অপরাধ অনেক কমে যাবে। তাঁরা বলেন, সামাজিক অপরাধ দমনে সমাজ, সমপ্রদায় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ বিষয়ে কার কী ভূমিকা, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
সমাজ অপরাধমুক্ত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প উপায় খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। অপরাধ বন্ধ করতে শাস্তির পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো দল–মত নয়, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। গ্যাংভিত্তিক বড় বড় সন্ত্রাসী–অপরাধী জামিনে বেরিয়ে গিয়ে তারাও নিজের গ্রুপ বা দল বড় করছে, প্রভাব বাড়াচ্ছে। এসব গ্যাং লিডারের গ্রুপে উঠতি সন্ত্রাসী বা ছিনতাইকারীু ডাকাতরাও যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়গুলোতে বাড়তি নজর দিতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যেন কোনো বিচারবহির্ভূত অপরাধ সংঘটিত না হয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যেন না ঘটে। পুলিশের মনোবল শতভাগ বৃদ্ধি করতে হবে, তা না হলে তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবাও পাওয়া যাবে না। ঢাকা–চট্টগ্রামের মতো বাণিজ্যিক হাবগুলোয় দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ বাহিনীকে গ্রহণ করতে হবে। যে যার মতো করে লোক উঠিয়ে নেওয়ার প্রবণতা রোধ করতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। অপরাধ দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বস্তুত পেশাদার সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেফতার ও রহস্য উদ্ঘাটন করলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির লাগাম টানতে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক বলয় থেকে সব ধরনের অপরাধ ও চাঁদাবাজি নির্মূল করতে হবে।







