শেয়ারবাজার : ঝুঁকির আড়ালে সম্ভাবনা, আর তার চাবিকাঠি বিনিয়োগ শিক্ষা

মোহাম্মদ আইয়ুব | বৃহস্পতিবার , ১৪ মে, ২০২৬ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

একজন মধ্যবিত্ত মানুষ তার জীবনের সঞ্চয় নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলেন। প্রথমে কিছু লাভ হলো, আশাবাদ বাড়ল। কিন্তু হঠাৎ বাজারে ধস নামল সবকিছু যেন ভেঙে পড়ল মুহূর্তেই। এই গল্পটি একা কারও নয়; আমাদের দেশের হাজারো বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে এটি মিলে যায়। তাই ‘শেয়ারবাজার’ শব্দটি অনেকের কাছে এখনো ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো শেয়ারবাজার কি সত্যিই এতটা ভয়ংকর? নাকি আমরা এটিকে ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি? আজকের বিশ্বে পুঁজিবাজার শুধু একটি বিনিয়োগের জায়গা নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তার উত্থান এসবের পেছনে একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই এই বিষয়টি বুঝেছে। তাই তারা পুঁজিবাজারকে শুধু সহায়ক নয়, বরং অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত তার একটি বাস্তব উদাহরণ। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভরতা, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ শেয়ারবাজারকে এখন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে দেখে। গুজব বা আবেগের বদলে তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা সেখানে ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থনীতির একটি সহজ সত্য হলো সঞ্চয় যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। পুঁজিবাজার এই সঞ্চয়কে শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। ফলে বিনিয়োগকারী যেমন লাভবান হন, তেমনি দেশের অর্থনীতিও গতি পায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা আরও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ সুদভিত্তিক বিনিয়োগে অনাগ্রহী হলেও, লভ্যাংশভিত্তিক বিনিয়োগে আগ্রহী। এই মানসিকতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি নৈতিক ও বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব। এতে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হতে পারে।

তবে বাস্তবতা পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। গত দুই দশকে শেয়ারবাজারে কয়েকটি বড় ধস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। অনেকেই একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাজার থেকে সরে গেছেন। এই অভিজ্ঞতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানসিক দূরত্বও তৈরি করেছে।

এই আস্থাহীনতার পেছনে কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। বাজার কারসাজি, গোপন তথ্যের অপব্যবহার, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অস্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ এসব অভিযোগ নতুন নয়। অনেক সময় এসব অনিয়মের দৃশ্যমান প্রতিকার পাওয়া যায় না। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন।

তবে সব দায় ব্যবস্থার ওপর চাপালে বিষয়টি একপাক্ষিক হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীদের আচরণেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের দেশে এখনো অনেকেই শেয়ারবাজারকে দ্রুত লাভের সহজ পথ হিসেবে দেখেন। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা পরিচিত কারও কথায় হঠাৎ বিনিয়োগ করার প্রবণতা বেশ সাধারণ। অথচ একটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ধরন বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই না করেই নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলোই পরে সমস্যার কারণ হয়। আসলে শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে লাভ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। বিনিয়োগকারী লভ্যাংশ ও মূলধন বৃদ্ধির মাধ্যমে লাভবান হন। পাশাপাশি, বর্তমান করনীতির আওতায় কিছু ক্ষেত্রে করসুবিধাও পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, শক্তিশালী কোম্পানিগুলো মূলধন পেলে তাদের ব্যবসা সমপ্রসারণ করতে পারে। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে, উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এর ফলে দেশের রাজস্ব আয় বাড়ে এবং বেকারত্ব কমে। তখন তরুণদের জন্য শুধু চাকরির পেছনে দৌড়ানোই একমাত্র পথ থাকে না; তারা উদ্যোক্তা হওয়ার কথাও ভাবতে পারে।

এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার শেয়ারবাজারে সফলতা দ্রুত আসে না। এটি ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তের ফল। নিয়মিত সঞ্চয়ের একটি অংশ ধরা যাক ১০% থেকে ১৫% যদি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে তা একসময় উল্লেখযোগ্য সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সচেতনতা ও অনুশীলন জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে ব্যাংকনির্ভর। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলধনের জন্য প্রধানত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে। এর ফলে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। খেলাপি ঋণের চাপ ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করছে। এই অবস্থায় একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি প্রয়োজন।

একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য ব্যাংক ও পুঁজিবাজারদুটিরই সমন্বিত বিকাশ দরকার। এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো বিনিয়োগ শিক্ষা। দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষক হিসেবে আমি দেখেছি, যারা জেনেবুঝে বিনিয়োগ করেন, তারা ধীরে হলেও এগিয়ে যান। আর যারা আবেগ বা গুজবের ওপর নির্ভর করেন, তারা প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে বিনিয়োগ শিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে এই ঘাটতি আরও বেশি। ঢাকায় কিছু উদ্যোগ থাকলেও, চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। অথচ এখানে সম্ভাবনা অনেক। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিনিয়োগের আগ্রহ আছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব তাদের এগোতে বাধা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে একটি বিনিয়োগ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। এটি শুধু বিনিয়োগকারীদের দক্ষতা বাড়াবে না; বরং পুরো বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীরা বাস্তবধর্মী জ্ঞান পাবে, চাকরিজীবীরা সঞ্চয়কে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে শিখবে, এবং নতুন বিনিয়োগকারীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাজারে আসতে পারবে।

শেয়ারবাজারকে শুধু ঝুঁকির দৃষ্টিতে দেখার সময় এখন পেরিয়ে গেছে। এটিকে বুঝতে হবে একটি সম্ভাবনাময়, জ্ঞাননির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার পাশাপাশি যদি বিনিয়োগ শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশেও একটি আস্থাভিত্তিক ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে আজ থেকেই আমাদের সচেতনতা, আমাদের সিদ্ধান্ত, এবং আমাদের শিক্ষার মধ্য দিয়ে।

লেখক: প্রশিক্ষক ও বিনিয়োগ শিক্ষা বক্তা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাজার বছরের পারস্য সভ্যতার প্রতি চ্যালেঞ্জ!
পরবর্তী নিবন্ধ‘সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি প্রাণে’