‘আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’। ‘বড় কে’ এ কবিতাটার প্রথম কয়েক লাইন আমরা অনেকে জানি। লেখক কে তা আবার সবার জানা নেই। কবিতাটা যাদের পাঠ্য ছিল তাদের অনেকের জানা থাকার কথা। কারো কারো কবিতাটা মুখস্তও থাকতে পারে। লেখক হরিশচন্দ্র মিত্র। এসব এখন আলোচনার বিষয় নয়।
কেউ প্রভাব প্রতিপত্তিতে বড় আবার কেউ শক্তিতে বড়। শক্তি না থাকলে প্রভাব বিস্তার করা যায় না। আর্থিক শক্তি, পেশি শক্তি, সামাজিক শক্তি কোনটার চেয়ে কোনটা কম নয়। আবার একটা আরেকটার পরিপূরক। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা চলতে পারে না। এসব শক্তির সমন্বয় ঘটলে অবস্থান সুদৃঢ় হয়। বড় হওয়ার সিঁড়ি মজবুত হয়। পাকাপোক্ত হয়। কখনো মচকে যায় না। ভেংগে পড়ে না। এমনকি ঘুণেও ধরে না। আরেকটা শক্তি আছে। প্রশাসনিক শক্তি। এটার মাধ্যমে বড় হওয়ার সোপান সুনিশ্চিত হয়ে যায়। এরা এমন বড় হয়ে যায়, বড় থেকেও বড়। প্রশাসনিক শক্তি অন্যান্য শক্তিগুলোকেও শাণিত করে। বিশেষ করে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কার্যকর ভূমিকা পালন করে। শুধু আর্থিক সুবিধা নয় অনেক অসুবিধা বা বাধাকে দূর করতে পারে। কোথাও প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাও উপড়ে ফেলতে পারে। এজন্য প্রশাসনিক শক্তি অন্যসব শক্তিকে যে কোন সময়ে প্রভাবিত করতে পারে। এ শক্তির উপর দাঁড়িয়ে অন্য শক্তিগুলো অর্জন করা যায়।
এখন লোকে কাকে বড় বলে সে প্রশ্নে এলে অনেক কিছু এসে যায়। লোকে কিসের বিবেচনায় বড় বলে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। তার অন্যতম কারণ এখন বড় লোক হতে হলে সাধারণ মানুষের বিবেচনার প্রয়োজন পড়ে না। অর্থাৎ মানুষ কাকে বড় বলে তা মোটেই গুরুত্ব বহন করে না। সে নিজেকে বড় বলে প্রতিষ্ঠিত করে সে বড় হয়। তা ধনসম্পদে হোক কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তিতে হোক।
অনেক বড় লোক আছে যারা বড় বলার ধার ধারে না। কে তাদের বড় বললো বা বললো না এতে তাদের কিছু যায় আসে না। এরা নিজেরা নিজেদের ওভাবে বড় বলে দাবী করে না। যদিওবা প্রকৃত পক্ষে তারা তাদের শিল্প কলকারখানা বা নিজেদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে তাদের সুনাম বা ব্রান্ডিং তাদের পরিচয়। অন্য কোন কিছুর প্রয়োজন হয় না। কর্পোরেট কালচারের মধ্য দিয়ে তারা পথ চলে। কয়েক দশক ধরে তারা তাদের মতো করে চলতে থাকে। লাভ লোকসান কোনটাতে তাদের পথ চলা থেমে যায় না। অনেকে এদেরকে কর্পোরেট হাউসও বলে থাকে। আসলে কর্পোরেট কালচার একবার গড়ে তুলতে পারলে তা আর সহজে যায় না। ঘাত প্রতিঘাত সামলিয়ে এগিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করে। এরা সব সময় বড় থাকে।
এক সময়ে জ্ঞানী শিক্ষিত লোকজনদের সবাই মান্য করতো, সম্মান করতো। তারা ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলো। ধন সম্পদে বড় না হলেও তারা মান সম্মানে অনেক বড় ছিল। সমাজের সবাই তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। তারা ছিল সৎ ন্যায় নীতিবান। অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দিতো না। তারা মানুষদের ভালো পরামর্শ দিতো। বিবেক বুদ্ধি দিয়ে মানুষের উপকার করতো। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বুদ্ধিজীবী বলা হয়। অনেক চিকিৎসক ও সাংবাদিকেরাও বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ছিল। এরা সৎভাবে জীবন যাপন করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতো। সে সময়ে স্কুল কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষকরা এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভাব অনটনে থাকলেও সাধারণ মানুষ তাদের সবসময় সম্মানের জায়গায় রাখতো। এরাও নিজেদের সম্মান রক্ষা করে চলতো। এসব শিক্ষকদের মানুষ নিজেদের চেয়ে আলাদা মনে করতো। অনেকের উচ্চ ডিগ্রি না থাকলেও এদেরকে সবাই জ্ঞানী হিসাবে মানতো। এরা যা জানতো তা ভালো করে জানতো। অন্যান্যরা এদের জানা নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলতে পারতো না। চলাফেরা আচার আচরণে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করে চলতো। এজন্য সমাজে এদের গ্রহণ যোগ্যতা ছিল অনেক বেশি।
বেশির ভাগ মানুষ সাধারণভাবে জীবন যাপন করতে চায়। খেয়ে পরে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে চায় ।এদের একটি অংশ বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বড় হতে চাওয়া খারাপ কিছু না। অনেকে বড় হতে চায়। স্বাভাবিক জীবন যাপন করে কেউ বড় হলে এতে দোষের কিছু নেই। যে কোন কেউ বড় হতে পারে। এখন কিভাবে বড় হলো, কোন পথে বড় হলো এসব দেখার বা বিবেচনার বিষয়। যদিওবা তার মাপকাঠি এতো সহজ নয়। কিছু কিছু লোকের বড় হওয়ার স্বপ্ন বা ইচ্ছা এতো প্রবল এর জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত থাকে। এদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এদের অনেকে আবার বড় লোক হয়ে যেতে পারে। এরাও চায় লোকজন যেন এদের বড় বলে। এরা নিজেরাও নিজেদের বড় বলে প্রচার শুরু করে। সভা সেমিনারও করে। কোন কিছু করলে তার প্রচার অনেক বেশি করে। যেখানে প্রচারের সুযোগ পায় সেখানে ছুটে যায়। টাকা পয়সা খরচ করে প্রচারের ব্যবস্থা করে। এরাও এক সময়ে বড় লোকের কাতারে চলে যায়। কাজের চেয়ে প্রচারে বেশি ব্যস্ত থাকে। সাধারণ মানুষ এদেরকেও বড় লোক বলে জানে। কিন্তু সব বড় লোককে মানুষ মানে না। ভক্তি করে না, শ্রদ্ধা করে না।
প্রকৃত বড় লোক কারা তা নির্ণয় করা এতো সহজ নয়। ধন সম্পদের মালিক হলে তিনি নিশ্চিত বড় লোক। মান সম্মানে বড় হলে তিনি বড় লোক। আবার শক্তি সামর্থে বড় হলে তাদের বড় লোক বলা হয়। প্রভাব প্রতিপত্তি যাদের আছে তাদের বড় লোক না বলে পারা যায় না। আসলে বড় লোক কে, বড় লোক কারা তা সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। সবদিক বিবেচনা করে বড় লোক খুঁজে পাওয়া আরো কঠিন। অথচ বড় লোকের অভাব নেই। যেদিকে তাকাই বড় লোকের ছড়াছড়ি নামকরা বড়লোক, স্বনামধন্য বড়লোক, প্রতিষ্ঠিত বড়লোক। এমনকি তিন পুরুষ ধরে বড়লোক। কিন্তু প্রকৃত বড় লোকের সন্ধান পাওয়া ভার। যে বড় লোকের মাঝে সত্যিকারের বড় লোকের সব গুণাবলী বিরাজ করে। যার অন্যতম গুণ হলো সৎ ও সত্যবাদী। যিনি কখনো প্রতারণা করেন না, কাউকে ঠকান না। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকেন। এরকম বড় লোকের সন্ধান পাওয়া সত্যিই কঠিন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী












