ইরান সুপ্রাচীন সভ্যতার অধিকারী একটি দেশ ও জাতি। ইরানের পূর্বের নাম ছিল পারস্য যার রয়েছে পাঁচ হাজার বছরের কৃষ্টি ও সভ্যতার উজ্জ্বল নিদর্শন। ইরান সাম্রাজ্য বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নবম শতাব্দীতে বাগদাদ সাম্রাজ্য ভেঙে পারস্য স্বাধীন হয়েছিল। পারস্যের প্রতিষ্ঠাতা সাইরাস দ্য গ্রেট শুধু বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেনি বরং তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শক্তি, স্থায়িত্ব নিহিত থাকে ন্যায়, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার ওপর। প্রশাসনিক, শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষ্টির দিক থেকে পারস্য সভ্যতা যুগান্তকারী। সেই সাম্রাজ্যের ইতিকথা জানা দরকার। প্রথমেই বলে রাখি ১৯২৫ সনে ‘রেজা শাহ পহলবি’ ক্ষমতায় আসার পর পারস্যের নাম রাখা হয় ইরান।
আজ ইরান সাম্রাজ্যের ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রের যুদ্ধ ও ধ্বংসলীলা চলছে। ভারতবর্ষে আর্যরা আসে মহেঞ্জোদারো যুগের পর। খ্রিষ্ট জন্মের পাঁচ–ছয়’শ বছর আগে ইরানিরা জাতিতে প্রাচীন আর্য বংশীয় ছিল। এই পারস্যবাসী আর্যরা সিন্দুনদের তীর থেকে একেবারে মিশর পর্যন্ত বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেছিল। তাদের ভাষা ছিল আর্যভাষা। ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিস্তার লাভের ফলে পারস্যবাসীরা ইসলামকে গ্রহণ করে। গ্রহণ করেও ইরানীরা তাদের নিজস্ব ধারা বজায় রাখল। ফলে মতভেদ দেখা দিল। আরবদের সাথে দুইটি সম্প্রদায় বিভক্ত হলো–প্রধানত ‘শিয়া’ অন্যরা ‘সুন্নি’। পারস্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে লাগলো। তারপরেও তাদের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ প্রাণশক্তি নিয়ে বেঁচে রইল। দুই হাজার বছরেরও বেশি কাল ধরে একেবারে ‘অসিবীয়দের’ যুগ থেকেই বহুবার তার শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন হয়েছে। বহু রাজবংশ, বহুধর্ম এসেছে গেছে। কখনো বিদেশীরা আবার কখনও নিজেরা সাহিত্যে, চিত্রে, ভাস্কর্যে অপূর্ব সব বস্তু সৃষ্টি করে চললো। ইতিহাসের পরিক্রমায় ইরান এক সময় তুর্কি ও মোগলদের অধীনে চলে যায়। কিন্তু ইরান সেই বিজেতাদেরই জয় করে নিল তাদের সংস্কৃতি দিয়ে। ষোড়শ শতাব্দীতে ইরানীদের জাতীয়তাবাদের জয় হলো।
১৫০২–১৭২২ সন পর্যন্ত দুশো কুড়ি বছর ‘সাফাভি’ রাজারা পারস্যে রাজত্ব করেছিল। এ সময়টাকে পারস্যের শিল্পকলার স্বর্ণযুগ বলা হয়। তখনকার রাজধানী ছিল ‘ইসপাহান’ যেটা বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। ইসপাহান অপূর্ব সুন্দর, অট্টালিকায় ভরপুর। চিত্রকলা, শিল্পকলায় বিখ্যাত কেন্দ্র। এটা শুধু একটা শহর নয় এটা হাজার বছরের শিল্প ঐতিহ্যের নিদর্শন। ২২ হাজারের বেশি ঐতিহাসিক নিদর্শন এখানে আছে। রাজা ‘সাফাভির’ বংশধর শাহ আব্বাস ১৫৮৭–১৬২৯ সাল পর্যন্ত পারস্যে রাজত্ব করেন। অনেকে মনে করেন তাদের এই শিল্পকলাতে ইতালির প্রভাব বিদ্যমান। এই শাহ আব্বাস ছিলেন সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক। বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে পারস্যে তৈল অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম খনি আবিষ্কার হলো। তাতে ইরানের ওপর সকলের লোভ পড়ল। ১৯১৮ সনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ইংল্যান্ড ইরানকে তাদের রক্ষণাধীন অঞ্চল করতে চেয়েছিল। কিন্তু তুরস্কের কামাল পাশা বৃটিশদের হাত থেকে পারস্যকে মুক্ত করে। সেই সময় পারস্যের দিকে সাম্রাজ্যবাদীরা যতই এগিয়ে আসতে লাগলো ‘শাহ’ যতই ক্রমে এদের হাতের পুতুল হয়ে উঠতে লাগলো। দেশের মধ্যে এর অবশ্যম্ভাবী ফল জাতীয়তাবাদ ততই বেড়ে উঠতে লাগলো। একটি জাতীয়তাবাদী দল সৃষ্টি হলো। এই দলটি বিদেশীদের হস্তক্ষেপ পছন্দ করলো না। আবার শাহদের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাল। এদের দাবি দেশে একটি প্রজাতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থা ও আধুনিক রীতিকে সব সংস্কার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯০৬ সনে অনেক চাপের মুখে শাহ একটি প্রজাতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে রাজী হলো। নাম দিল ‘মজলিশ’। ইরানের বর্তমান সরকার বিদেশীদের লুণ্ঠনের ঘোর বিরোধী। ১৯০১ সনে বৃটিশ কোম্পানী ‘দি অ্যাংলো পর্শিয়ান অয়েল’ কোম্পানি–ষাট বছরের যে চুক্তি হয়েছিল নতুন সরকার তা বাতিল করে।
এইভাবেই রেজাশাহ পহলবি ইরান শাসন করছিল। কিন্তু তাদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব ও বিদেশী প্রভুদের পদলেহন বহুদিন ধরে চলতে থাকায় ইরানবাসী সহ্য করতে পারেনি। শেষে শাহ পহলবিকে বিপ্লবের মাধ্যমে সিংহাসনচ্যুত করা হয় এবং তিনি ১৯৭৯ সালে বিদেশে পালিয়ে যান। অতি প্রাচীনকালে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে পারস্য খুব বড় জাতি ছিল। পারস্যের এই জাতীয় জাগরণ এটা চলছে ঠিক তার দুইহাজার বছরের প্রাচীন রীতি–নীতিরই পথ ধরে। পারস্যের অষ্টাদশ শতাব্দীর ইতিহাস কেবল গৃহযুদ্ধ। রাজা বদল ও কুশাসনের দুঃসময় কাহিনিতে পূর্ণ। ইরানীরা সেই জাতি যারা নানা রাজবংশ ও নানা জাতির উত্থান পতনের মধ্যেও ইরান তার প্রাচীন শিল্পকলার রীতি এবং জীবনের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। পারস্যের কবি ‘ফিরদোসি’ গজনির সুলতান মাহমুদের অনুরোধে একটি জাতীয় মহাকাব্য রচনা করেন নাম ‘শাহ নামা। ফিরদোসির পরে আসলেন জ্যোতিষী কবি ‘ওমর খৈয়াম’। এরপর কবি ‘শেখ সাদি’। এইভাবেই যুদ্ধবিগ্রহ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে থাকলো। তবু ধরে রাখলো পারস্য শিল্পকলা ও সংস্কৃতি। সাম্প্রতিক ইসরাইল–আমেরিকা ভার্সেস ইরান যুদ্ধাবস্থার দিকে তাকালে দেখতে পাই কীভাবে একটা যুদ্ধোন্মাদ মুক্তি একটি সুপ্রাচীন সভ্যতা বহনকারী জাতির মনোবল তার ধন সম্পদ, মানবসম্পদ ও কৃষ্টিকে নিঃশেষ করে দিতে চায়। দেখেছি সেই চেনামুখ প্রথমে দানবীয়ভাবে আবির্ভূত হয়ে প্রাচীন সভ্যতার ওপর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে। তার ইতিহাস কৃষ্টি সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে। হুমকি দিয়েছে গোটা সভ্যতাকে মুছে দিতে। এই হুমকি শুধু সরকার ও সামরিক বাহিনীর ওপর নয়, হতে পারে আরও ভয়ঙ্কর।
শত্রুপক্ষ চেয়েছিল পরমাণু শক্তিধর ইরানকে খণ্ড বিখণ্ড করতে তার পরমাণু শক্তি ধ্বংস করতে। চেয়েছিল ইরান সরকারকে নতিস্বীকার করাতে। তারা বুঝে নাই যে ইরানীরা সংঘবদ্ধ জাতি। তাদের সংকল্প দৃঢ়, তারা পরাজয় মানে না। অনেক মূল্যবান জাতীয় নেতা হারানোর ও বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পরও তারা সংকল্পে অটল, অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ে তারা ভেঙে পড়েনি বরং পালটা লড়াই করে প্রমাণ করেছে হাজার হাজার বছরের সভ্যতাকে বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। ইরানীদের পলিসি তারা আঘাত শোষণ করে নিচ্ছে। ক্রমাগত আঘাতের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। তাদের নীতি হলো টিকে থাকো–পালটা আঘাত করো। যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে–যে ইরানকে দুর্বল করতে চেয়েছিল, ইরান আরও শক্তি সঞ্চয় করছে।
ইরানের বন্দরগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোনদিকে যায় একমাত্র সময় বলে দিবে। এই যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণে ইউরোপীয়দের সমর্থন হারিয়েছে। অন্যদিকে ইরান তার চীন ও রাশিয়ার সাথে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ কোনোপ্রকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আপাতত ইরান–যুদ্ধে যে ভাবে টিকে আছে তা যুদ্ধ জয় মনে হলেও শোকের কালো চাদরে মোড়া মানবিক মূল্য ও মানসিক ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করবে। মনে পড়বে যুদ্ধের শুরুতেই বোমার আঘাতে নিহত দু’শয়ের কাছাকাছি স্কুল ছাত্রীদের করুণ মৃত্যুর কথা। তবে এত কিছুর পরেও রক্তপিপাসু শত্রুরা ইরানের মেরুদণ্ড ভাঙতে পারেনি। ইরানের মেরুদণ্ড সোজা আছে। সভ্যতার এতটুকু খাদ পড়েনি। এই যুদ্ধে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে বর্তমান বিশ্বের মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। যুদ্ধের সর্বগ্রাসী প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহের ওপর মারাত্মকভাবে নিপতিত হবে। তারপরও বলব রণউন্মাদনার চেয়ে মানবতা শ্রেয়।
লেখক : প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।












