দেশের কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় তিনটি সার কারখানা চলতি মাসের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। পর্যায়ক্রমে দেশের সারের চাহিদার বড় অংশ দেশীয় কারখানায় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা, আমদানিতে ব্যয় হওয়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, বিসিআইসির অধীন সাতটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকটে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেঙ লিমিটেড (টিএসপিএল), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)। এসব কারখানা পুনরায় চালু করতে গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত চাপে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালু করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল পাওয়া গেলে চলতি মাসের মধ্যে কারখানাগুলো চালু করা হবে।
সূত্র জানায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোতে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ টন ইউরিয়া, ৬৮ হাজার ২৫৯ টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছে। একই অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ টন। রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন দিয়ে ইউরিয়ার মোট চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের অবদান ছিল প্রায় ৯ দশমিক ১০ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
দেশের কৃষি খাতে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা পূরণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হয়। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪৪ লাখ টন এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৯ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়েছে। দেশের সব সার কারখানা চালু করে ইউরিয়া সার আমদানি বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে শুধু আমদানি ব্যয় কমবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলেও কৃষি খাতকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করেন।
উৎপাদন বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে জ্বালানি ও কাঁচামালের সংকট। ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান উপকরণ প্রাকৃতিক গ্যাস। পর্যাপ্ত গ্যাস ও নির্ধারিত চাপ ছাড়া ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায় না। অন্যদিকে টিএসপি ও ডিএপি উৎপাদনের জন্য ফসফরিক অ্যাসিডসহ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন।
বিসিআইসি সূত্র জানায়, ফসফরিক অ্যাসিডের ঘাটতি এবং সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় টিএসপি কমপ্লেঙের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডিএপি কারখানাও ফসফরিক অ্যাসিডের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন করতে পারছে না। এসব সমস্যা সমাধানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে বিসিআইসি।
বন্ধ কারখানা চালুর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান কারখানাগুলোর প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে। এ লক্ষ্যে পুরনো কারখানাগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি নতুন ইউরিয়া ও টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সারের চাহিদা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কারখানাগুলোকে সারা বছর সচল রাখাও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সাথে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত সারের ব্যয় যাতে আমদানিকৃত সারের তুলনায় অযৌক্তিকভাবে বেশি না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।












