বাংলা ছড়া সাহিত্য বা শিশুসাহিত্য শুরুর দিকে বেশি চর্চা হতো শিশুদের নীতিশিক্ষা, উপদেশ, চরিত্র গঠন, এবং শিশুর মনোরঞ্জনের জন্য। তবে সময়ের পরিক্রমায় কালের বিবর্তনে ছড়া বা শিশুসাহিত্যের বিষয়বস্তুতেও এসেছে পরিবর্তন। ছড়ায় ফুটে উঠছে মানুষের শাশ্বত জীবনের সামগ্রিক বিষয়। দেশ,সমাজ,বিশ্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধ ইত্যাদির মাধ্য দিয়ে ব্যাপ্তি ঘটেছে ছড়া সাহিত্যের। ছড়া আদিকাল থেকে কার্যকরি হাতিয়ার। অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে। সংকটে–সংশয়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধে ছড়া হয়ে উঠে আক্রমণাত্মক। ছড়া রাজনীতির ময়দানে প্রতিপক্ষ ঘায়েলের মাধ্যম। বিপ্লবের ময়দানের ছড়া হয়ে উঠে জ্বালাময়ী স্লোগান। আবার কখনো ছড়া হয়ে উঠে সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম কিংবা গণ–মানুষের কল্যাণকামী।
এই প্রবন্ধে আলোচনা করবো মিজানুর রহমান শামীমের ছড়া সাহিত্য নিয়ে। যিনি বর্তমান সময়ের বিশিষ্ট অগ্রজ ছড়াকারদের একজন। তিনি লিখেছেন অসংখ্য ছড়া। যার ছড়া পাঠে নান্দনিক আনন্দ অনুভূত হয়। তার ছড়া লেখার কৌশল ও ছন্দজ্ঞান অসাধারণ। মিজানুর রহমান শামীমের ছড়াগুলো আত্মার উপলব্ধি, মানবীয় আবেগ, বোধের অন্তহীন প্রকাশ করে তখন তারমধ্যে এক স্বয়ংক্রিয় শৈল্পিক চিত্র দেখা যায়। ছড়া শিল্পের, শৈল্পিক একটা পর্যায়। আর কম শব্দে অনেক বেশি কথা বলা বা না বলা কথার আড়ালে এক মহাজাগতিক ইশারা রেখে যাওয়ার নামই শিল্প। কবি তাঁর নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত দুঃখ, ক্ষোভ থেকে ছড়া লিখেন, কিন্তু শৈল্পিক হয় তখনই, যখন সেই ব্যক্তিগত আবেগটি পাঠক নিজের মনে করে গ্রহণ করে। পাঠকের মনে যদি এমন বোধ হয় যে, এটি তো আমারই কথা, যাতে আমি ভাষা দিতে পারছিলাম না, যখন সেই ছড়া পাঠকের কল্পনায় বিভিন্ন ছবি বা স্মৃতির উদ্রেক করে, তখনই বুঝতে হবে ছড়াটি শৈল্পিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ছোটোদের জন্য কিছু লেখা চাট্টিখানি কথা নয়, রীতিমতো কঠিন, বিশেষ করে ছড়া। শুধু অন্ত্যমিল দিলেই কিন্তু ছড়া হয়ে যায় না। ছড়ায় থাকতে হয় সঠিক ছন্দের প্রয়োগ। ছড়ার ক্ষেত্রে ছন্দ হলো অতি প্রয়োজন এক্ষেত্রে কান হলো হাকিম। কান যদি সায় দেয় ছন্দের মাত্রায় কিছুটা তফাৎ হলেও সমস্যা হয় না। ছড়ার ক্ষেত্রে একটা শিক্ষণীয় অথচ উপভোগ্য ভাব ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই সত্যিকারের সফল ছড়া হয়। এতেই ছড়া লেখার সার্থকতা। মিজানুর রহমান শামীমের ছড়ায় বাড়তি শব্দ নেই। স্বচ্ছ নদীর মতো ঝিরঝির করে বয়ে যায় তাঁর ছন্দ। ভাষার ব্যবহার ছোটোবড়ো সকলের জন্য মানানসই। তাঁর ছড়া পাঠ করে আমার মনে হয়েছে, যতটা মজার, ততটাই সচেতন করছেন। তাঁর ছড়াগুলোর ছন্দ ও নিজস্ব ভাষায় যে শক্তি ও স্বাতন্ত্রের পরিচয় রেখে যাচ্ছেন তা ছড়াকারের সৃষ্টিক্ষমতা ও মৌলিক অবদানের পরিচয়বাহী। তাঁর ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য সহজ, প্রাঞ্জল ও প্রভাবসঞ্চারী ভাষা। তিনি অপ্রয়োজনীয় আলাপ এড়িয়ে স্বল্প পরিসরে ছড়াকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। পাশাপাশি সহজ ভাষার সঙ্গে প্রয়োজনমতো কাব্যিক ব্যঞ্জনা এবং আঞ্চলিক শব্দের সংযত ব্যবহার করেন। তেমন একটি ছড়া হলো-“নুন আনতে পান্তা ফুরোয়/ নেই তলানি ডালের/দুই বেলাতে নাই খোরাকি/ বাসি আতপ চালের।/চালের পাতিল ডালের পাতিল/সব পাতিলই উজার/পানি খেয়েই তুলছি ঢেকুর/করছি শোকর গুজার।”(নুন আনতে পান্তা ফুরোয়)
ছড়ার মধ্যে বিষয় বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। একেবারেই ভিন্ন, ভিন্নতর বিষয় উঠে আসে। এখানেই কবির চিন্তাচেতনার ও ভাবনার ব্যাপকতা যেমন লক্ষ করা যায়, তেমনই কবির আশ্চর্য সব উপমার হদিস পাওয়া যায়। এখানেই প্রকাশিত হয় ছড়াকারের প্রধান শক্তি সহজ অথচ ধারালো শব্দচয়ন। তিনি ছড়ার শরীর নির্মাণে কোনো কৃত্রিম অলঙ্কারের আশ্রয় নেন না। অন্তমিল আর লয়ের এক চমৎকার ব্যবহার করেন, যা ছড়াকে গতিশীলতা দেয়। পড়ার সময় একটি অন্তর্নিহিত ছন্দ পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে, যা প্রতিবাদের সুরকে আরো জোরালো করে তোলে। তাঁর ছড়ায় আবেগ আছে, আবেগের উচ্ছ্বাস আছে, আছে এক গভীর সংযম। ফলে ছড়াগুলো পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে। তাঁর ছড়ার ভাষা সহজ, স্নিগ্ধ। তিনি দুর্বোধ্য আধুনিক শব্দ চয়নের দিকে যাননি, আবার একেবারে পুরানো শব্দের পুনরাবৃত্তিও করেননি। তাঁর ভাষায় প্রকৃতি, গ্রামবাংলা, ঋতু, বৃষ্টি, গাছ, নদী, পাখি, ফুল–এসব বারবার ফিরে আসে। এই প্রকৃতিচিত্র কখনো অলঙ্কার নয, বরং অনুভূতির বাহক। ফলে ছড়াগুলো পাঠককে দৃশ্য, শব্দ ও আবেগে স্পর্শ করে। ছড়াকার অত্যন্ত সুন্দর করে লিখেছেন-“আমাদের গান শোনাবে পাখি/ফুল বীথিদের মিত্র/ছবির মতো গ্রামখানা পুরো/ জীবন্ত চলচ্চিত্র”। (গ্রাম ও শহর–নুন আনতে পান্তা ফুরোয়)
তাঁর ছড়ার সবচেয়ে বড়ো শক্তি আন্তরিকতা। তিনি কোনো কৃত্রিমতা দিয়ে ছড়ার অঙ্গ নির্মাণ করেননি, হৃদয়ের অভিজ্ঞতাকে সরল অথচ ছন্দময় ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর ছড়া পাঠককে নিয়ে যায় এক গভীর নস্টালজিয়ার জগতে। এখানে স্মৃতি শুধু অতীতের ঘটনা নয়, স্মৃতি যেন জীবন্ত এক সত্তা, যে গাছের ছায়ায়, চাঁদের শরীরে, বৃষ্টির পানিতে, এমনকী ভেঙে যাওয়া ঘরের মধ্যেও বেঁচে থাকে। তাঁর ছড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত। ক্ষমতার আস্ফালন, শাসন ও শোষণের যে নিষ্ঠুর রূপ, বা অবক্ষয়ের কালকে ছড়াকার ছন্দের মূল পটভূমি করে তুলেছেন। আপাদমস্তক তীব্র সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বেদনাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া এইসব ছড়া পাঠককে এক নির্মম সততার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ছড়াকারের দৃষ্টি ক্ষমতার অলিন্দে বন্দি নয়, বরং ক্ষমতার চাকার নীচে পিষে যাওয়া সাধারণ মানুষের দিকে। ছড়াকার দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র, সমাজ বা একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতা মানুষের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারকে কেড়ে নেয়। শাসনব্যবস্থার ভন্ডামি ও নিষ্ঠুরতাকে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ম ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তাঁর ছড়ার ক্ষমতার এই সর্বগ্রাসী চরিত্র ফুটিয়ে তুলেন। তাঁর অনেক ছড়ায় স্পষ্ট বুঝিয়েছেন, শোষকের অত্যাচার যতই সুসজ্জিত হোক না কেন, তা কখনো আড়াল করা যায় না। এক্ষেত্রে তাঁর শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত প্রতীকী। এটি শুধু দিনের শেষ নয়, এটি আসলে একটি যুগের, একটি আদর্শের আর মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কাল। সমাজজুড়ে যে ক্লান্তি, হতাশা আর নৈতিক পতন গ্রাস করেছে, ছড়ায় তাঁর এক বিষাদময় সুর অনুরণিত হয়েছে। সময়ের এই ক্লান্তি ও অন্ধকারকে ছন্দের পরতে–পরতে ফুটিয়ে তুলেছেন। তীব্র যন্ত্রণা ও শোষনের মাঝেও তাঁর ছড়া কান্নায় ভেঙে পড়ে না, বরং প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করে। শোষিত মানুষের নীরবতাই যে একসময় গর্জে উঠতে পারে, সেই ইঙ্গিতেই ছড়ার ছন্দে ছড়িয়ে আছে। ছড়াকার সমকালীন জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে প্রকাশ করার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত জ্যান্ত ও তীক্ষ্ম চিত্রকল্প। রক্ত,অন্ধকার,শৃঙ্খল আর সাঁঝবেলার ধূসরতার মতো শব্দাবলি ছড়ার আবহকে আরো তীব্র করে তুলেছে। এটিই আমাদের চারপাশের চেনা এক বিশ্বস্ত দলিল। ছড়াকার এখানে কোনো দল বা মতাদর্শের সংকীর্ণ বৃত্তে বন্দি না থেকে, সার্বিক মানবতাবাদের পক্ষে প্রশ্ন করেছেন। ক্ষমতার দম্ভ যে চিরস্থায়ী নয় আর তার পতন অবশ্যম্ভাবী–এই ধ্রুব সত্যটিই অত্যন্ত ছন্দের নিপুণতায় উপস্থাপিত করেছেন। তিনি লিখেন-“শাসন শাসন/কিসের শাসন/কাড়লি তোরা/ভাতের বাসন/ডান্ডা হাতে/ গাড়লি আসন/ জানিস শুধুই / মিথ্যে ভাষণ/ শাসন শাসন /কিসের শাসন? (কিসের শাসন–সব পেটুকের দল) অন্য এক ছড়ায় লিখেন-“এই হারামী /রাখ ভাঁড়ামী/ছিঁড়ে দেবো কান/দেশটা বেচে/করিস আবার /দেশ দরদীর ভান।” (ছড়া–সব পেটুকের দল)
ছড়াকারের প্রাত্যহিক জীবনের নানান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ছড়াগুলো জটিলতায় লিপ্ত না–হয়ে, হয়ে উঠেছে সহজ ও স্বাভাবিক। একথা অনস্বীকার্য, দিন–বদলের সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক অভিজ্ঞতা আর শোকতাপ, সুখসহ অন্তর্দাহের সীমারেখার বদল হয়। একজন প্রকৃত ছড়াকার আপন বিবেচনাশক্তিতে নিজের প্রত্যয়িত অভিজ্ঞতাকে ছড়ায় প্রকৃতত্বে মানুষের অন্তরে পৌঁছানোর প্রয়াস করেছেন। প্রকৃতপক্ষে একজন সৃজনশীল মানুষ অনন্ত সময় জেগে থাকেন, নিরবছিন্ন পৃথিবীকে নিরীক্ষণ করে থাকেন নিজস্ব অনুভবের যুক্তিতে, সত্যের সংশ্লেষিত যন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে। মায়ামমতাহীন অবিশ্বাসের এই গ্রহে মানুষ জীবনের নানান অভিযাতে অস্থির হয়েছে কবি, বাহুল্যবর্জিত, নিরালম্ব ও অস্পষ্টতাহীন নিঃস্বর বারান্দায় কবিমানসের সাধ ও সংকল্প বারবার কল্পনায় পর্যবসিত না হয়ে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়েছে।











