মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাং দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি ঢাকা জেলার আইনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত। গত ৯ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। মানুষ যার কাছে প্রাপ্তির আশা করে, তার কাছেই প্রত্যাশা করে। আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে কিশোর গ্যাং। তারা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দিন দিন বিচরণ করছে। মাদক যদি এখনই রোধ করতে না পারি, একসময় এর বিস্তার দিন দিন বাড়তেই থাকবে। এখনই যদি এটাকে টেনে ধরতে না পারি, তাহলে একসময় এই সমাজ ভেঙে যাবে। এই পরিবেশ থাকবে না, অসুস্থ মানুষের বসবাসে পরিণত হবে। আমাদের প্রথম টার্গেট– কীভাবে মাদক নির্মূল করা যায়।’
মাদক নির্মূলে প্রতিটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে টিম গঠন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশনা দেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তালিকা তৈরি করেন। সেই তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরকারের কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও মাদক কারবারিদের তৎপরতা থেমে নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, নারায়ণগঞ্জসহ অনেক এলাকায় মাদকের আখড়া গড়ে উঠেছে, যা নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সদস্যদের যোগসাজশে মাদক কারবারিরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে প্রায় ৪০ লাখ নতুন মাদকসেবী যুক্ত হয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরাও এখন মাদকের শিকার হচ্ছে। স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক সহজলভ্য হওয়ায় তরুণ–তরুণীদের মধ্যে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে মাদক গ্রহণ করছে, যা অভিভাবক ও কর্তৃপক্ষের জন্য চিন্তার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি দেওয়া হয়নি, যা শিক্ষাঙ্গনকে মাদক বিক্রির অন্যতম কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিণত করেছে।
‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যে জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ মাসে কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আসা ছয়টি বড় ঘটনায় ২৭ লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এ তথ্যই বলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসের মতো ভয়ংকর মাদক কীভাবে বানের স্রোতের মতো দেশে প্রবেশ করছে এবং গ্রাম–মফস্বলেও কিশোর–তরুণদের কাছে সহজলভ্য হয়ে গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালনাধীন এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, দেশে বর্তমানে ৮৪ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকের পেছনে সেবনকারীরা বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তাদের একটি বড় অংশই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে মাদকের এই বিস্তার পুরোনো সংকট হলেও চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে যে শিথিলতা বিরাজ করছে, তার সুযোগে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাচারকারীরা। দুর্বল অভিযোগপত্র এবং যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতায় মাদকের মামলায় বিচার ও সাজার হারও কম। বিচারহীনতার এই বাস্তবতাও মাদক নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠার বড় কারণ।
মাদকের অবাধ বিস্তার নাগরিক নিরাপত্তার বড় হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। এর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের যেসব সীমান্ত দিয়ে দেশে মাদক প্রবেশ করে, সেই উৎসমুখ বন্ধ করতে না পারলে যতই পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, সেটা ফলপ্রসূ হবে না।







