মহেশখালীতে হচ্ছে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল

গ্যাস সংকট মোকাবিলা চীনা কোম্পানির দাবি করা ফি আগের টার্মিনালের চেয়ে ৩৪-৩৭ শতাংশ বেশি বিওও নাকি বিওওটি মডেল, চিন্তা করছে সরকার

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:১০ পূর্বাহ্ণ

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত টার্মিনালের পুনঃগ্যাসীকরণ সেবার জন্য চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) দাবি করা দৈনিক ফি দেশের বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের তুলনায় ৩৪ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি। তার ওপর বিল্ড–ওন–অপারেট (বিওও) মডেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চুক্তির মেয়াদ শেষে টার্মিনালের মালিকানা পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতাও থাকবে না। এতে করে বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মাঝে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

মহেশখালীর কুতুবজোমে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতাসম্পন্ন একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে সিএনইই। বিওও মডেলে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। প্রাথমিকভাবে তাদের দাবি ছিল দৈনিক ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার। দরকষাকষির বিভিন্ন পর্যায়ে তা কিছুটা কমানো হলেও বর্তমান টার্মিনালগুলোর তুলনায় চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত ফি এখনো অনেক বেশি। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার পরিশোধ করা হয়। সেই হিসাবে সিএনইইর প্রস্তাবিত দৈনিক ফি এক্সিলারেটের তুলনায় ৮৮ হাজার ডলার বেশি, যা প্রায় ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সামিটের তুলনায় ব্যবধান ৯২ হাজার ৮৮৫ ডলার বা প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

চীনা কোম্পানির প্রস্তাবিত এই ফি আগে সামিটের বাতিল হওয়া প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায়ও বেশি। ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের দ্বিতীয় এফএসআরইউ প্রকল্পের জন্য বিল্ড অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওওটি) মডেলে দৈনিক ৩ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই তুলনায় সিএনইইর প্রস্তাবিত ফি দৈনিক ৪২ হাজার ডলার বেশি। অন্যদিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের যে বেঞ্চমার্ক হার সুপারিশ করা হয়েছিল, নতুন প্রস্তাব তার চেয়ে প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি সরকারের কাছে দুটি বিকল্প সুপারিশ করেছে। এর একটি হলো, ১৫ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার এবং অন্যটি ২০ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ফি।

প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিওও মডেলে বেসরকারি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ করে তার মালিকানা ধরে রেখে পরিচালনা করে। অন্যদিকে বিল্ড–ওন–অপারেট–ট্রান্সফার (বিওওটি) মডেলে নির্ধারিত পরিচালন মেয়াদ শেষে অবকাঠামোর মালিকানা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশের আগের এলএনজি টার্মিনাল–সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রে বিওওটি মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে নতুন টার্মিনালে বেশি ফি দিয়েও দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে না আসার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ইতোপূর্বে সামিট এলএনজি তাদের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সামিটের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছর পর ভাসমান টার্মিনাল ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ), মুরিং ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মালিকানা বিনামূল্যে পেট্রোবাংলার হাতে চলে আসবে। পেট্রোবাংলাকে দেওয়া সাম্প্রতিক চিঠিতে সামিট জানিয়েছে, শুধু দৈনিক ফির পার্থক্য হিসাব করেই ১৫ বছরে প্রায় ২৩ কোটি ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আজাদীকে জানান, এই ধরনের প্রকল্পে শুধু দৈনিক ফি হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পের সক্ষমতা, অর্থায়ন ব্যয়, নির্মাণ ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, চুক্তির মেয়াদ, ঝুঁকি বণ্টন ও হস্তান্তর শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় দেখার পর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সরকার তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালের ব্যাপারে ভেবেচিন্তে অগ্রসর হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকটে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। এতে করে আগের দুটি টার্মিনালের সাথে বর্তমানে নির্মিত হবে এমন টার্মিনালের দৈনিক ফি কোনোভাবেই এক হতে পারে না। তবে বিওও এবং বিওওটি মডেল নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধযুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়েছি, এখন বাড়তি সহায়তা পাওয়া উচিত
পরবর্তী নিবন্ধপাহাড়তলী বাজারে ৩ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা