ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সরকারি বেসরকারি সকল পক্ষের অংশীদারত্ব জরুরি

শুক্রবার , ২৮ জুন, ২০১৯ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ
37

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদনে তিন বছরে ভারতের অবস্থান ১৩১ থেকে ৭৭-এ এসে দাঁড়িয়েছে, আর বাংলাদেশ দুই ধাপ পিছিয়ে ১৭৪ থেকে ১৭৬-এ নেমেছে। এটি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁরা বলছেন- সমস্যা কোন্‌ জায়গায়? বাংলাদেশের অবনমন হচ্ছে কেন?
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছিল, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব না হলে দ্রুত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। এ লক্ষ্যে ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুই অংকের মধ্যে নামিয়ে আনার জন্য সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কোম্পানি আইন সংশোধন করে ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিভিন্ন ধরনের রেজিস্ট্রেশন ফি উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে এবং ৫০ হাজার টাকার নিম্ন মূলধনসম্পন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রে তা শূন্য করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিনিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সেবাগুলো দ্রুত এবং সহজলভ্য করার জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হয়েছে। ৬৪ জেলায় ওয়ানস্টপের আদলে বিনিয়োগ সেবা তদারকি করা হবে এবং জেলা পর্যায়েও পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের সব সেবা ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে প্রদান করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এই গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে বেসরকারি খাতের উন্নয়নের জন্য অর্থনীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের জিডিপি বর্তমানে ২৭৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬%, রপ্তানি আয় ৪১.০১ বিলিয়ন ডলার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২.০২ বিলিয়ন ডলার এবং নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পরিচয় বহন করে।
তাঁরা বলেন, অনেক দেশেরই উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু উত্তরণ পরবর্তী সময়টা তাদের জন্য সুখের হয়নি। বাংলাদেশকেও একই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এটা কতটা সহজ হবে তা নির্ভর করবে সরকার বেসরকারি খাত ব্যবস্থাপনায় কতটা কৌশলী হতে পেরেছে এবং কতটা দক্ষতা বাড়াতে পেরেছে তার ওপর। মূলত পরবর্তী মূল্যায়নে বাংলাদেশের সাফল্যের ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপের ওপর। এক্ষেত্রে সরকারকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণমূলক অনিশ্চয়তার আরেকটি প্রধান কারণ দলিলপত্রের নির্ভরযোগ্যতার অভাব। এই সমস্যার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বা দিক রয়েছে। প্রথমত, বিপুলসংখ্যক এসআরও এবং অন্যান্য আইনি বিধান হালনাগাদ কিংবা প্রয়োজনের নিরিখে পর্যালোচনা, পরিবর্তন কিংবা বাতিল করা হয় না। ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ৭০০-এর বেশি বন্ডুসংক্রান্ত এসআরও কেবল ভাসা-ভাসা অবস্থায় রয়েছে। ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো ও অনাবশ্যক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সমকালীন বিনিয়োগ সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং উদ্ভাবনবান্ধব নয়। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য ভ্যাট, শুল্ক ও আয়কর আইনের সেবাপ্রাপ্তিতে কোনো ওয়ান স্টপ গন্তব্যও নেই। এর ফলে বিধিমূলক তথ্য যাচাই করতে অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। এভাবে নীতি ও বিধিবিধানগুলোর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নকালে ব্যাপক দ্বিধা ও ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়, যার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব আছে। উল্লিখিত জরিপ অনুযায়ী, ১০০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীই মনে করেন যে শুল্কসংক্রান্ত বিধিবিধানে অসামঞ্জস্য বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে।
তথ্যগত অস্পষ্টতা এবং শুরুর প্রাক্কালে প্রাথমিক সমন্বয়হীনতা, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ বা তার ঘাটতি ভয়াবহ প্রতিকূল পরিণাম সৃষ্টি করতে পারে। পর্যাপ্ত নীতিমালা বিধিমূলক আদেশের অদৃশ্য প্রকৃতি নিজের মতো করে ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। সঠিক কার্যপরিক্রম বিন্যাসের ক্ষেত্রে এসব বিষয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপকভাবে দ্বিধায় ফেলে দেয়। যখন কোনো নতুন ব্যবসায়িক ধারণা মাঠে বাস্তবায়ন হয় এবং তার জন্য সংবিধিবদ্ধ কোনো উপযুক্ত আইনি বিধি থাকে না, তখন আরও বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়।
আসলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকায় থাকতে হবে। বছরব্যাপী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয়সমূহ নির্ণয়ে সরকারি-বেসরকারি সকল পক্ষের অংশীদারত্ব জরুরি।

x