সামপ্রতিক সময়ে ক্রমাগত অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও এর ক্ষয়–ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে নিদারুণভাবে। দেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া এ অতিবৃষ্টির কারনে বন্যায় মানুষের ঘর–বাড়ি, মুরগীর খামার, প্রাণিসম্পদ, বীজতলা ও ফসলী জমির ক্ষতি হয়েছে অবর্ণনীয়ভাবে। বাংলাদেশের কৃষি আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাতগুলোর একটি বহন করছে। টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের কৃষিকে নতুন করে সংকটের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কৃষি, যেখানে একদিকে পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে অতিবৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা একযোগে আঘাত হানে, সেখানে কৃষকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ ধরনের দুর্যোগ শুধু ফসলের ক্ষতিই করে না; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্যস্থিতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই এই ক্ষয়ক্ষতিকে শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চল এর চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামপ্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কৃষি খাতে প্রায় ৩০৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। টানা ভারি বর্ষণ ও বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৮১৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর ফসলি জমি। এতে প্রায় ৮৮ হাজার ৫৩৯ টন বিভিন্ন ধরনের ফসলের উৎপাদন নষ্ট হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭২১টি কৃষক পরিবার। জেলা ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামে ১৬ হাজার ২৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর এবং কক্সবাজারে ২ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ও আউশ ধানে। দুই জেলায় মোট ৯ হাজার ২০৮ হেক্টর সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৫৬ হাজার ৭৩০ টন উৎপাদন নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। একই সঙ্গে আউশ ধানের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৭৪১ টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। এছাড়া আমনের বীজতলা, আদা, হলুদ, পান, মরিচ, কলা, পেঁপে, পেঁয়াজ, ভুট্টা, চিনাবাদামসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজি। প্রায় ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে ৪৩ হাজার ৫০ টন উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৮৬ কোটি টাকারও বেশি। অন্যদিকে আমনের বীজতলা, আদা, হলুদ এবং পানের বরজেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। কক্সবাজার জেলায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ৬৮৪ হেক্টর সবজি, ১ হাজার ৭৯৭ হেক্টর আউশ ধান এবং ৪২ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক কৃষককে নতুন করে আমনের বীজতলা তৈরি করতে হবে এবং পুনরায় চাষাবাদের জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে শুধু ক্ষতিপূরণ প্রদান করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পুনর্বাসন পরিকল্পনা।
প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত শনাক্ত করে ডিজিটাল কৃষক ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রণোদনা, উন্নতমানের বীজ, চারা, সার এবং কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করতে হবে। সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছেই পৌঁছায়, সেজন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সবজি, ডাল, তিল, ভুট্টা এবং অন্যান্য দ্রুত উৎপাদনযোগ্য ফসলের বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত আমনের বীজতলার পরিবর্তে মানসম্মত চারা উৎপাদন ও দ্রুত বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আমন মৌসুমে উৎপাদন ঘাটতি না হয়। তৃতীয়ত, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জন্য জলাবদ্ধতা ও বন্যাসহিষ্ণু ফসলের জাত সমপ্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ব্রি উদ্ভাবিত জলমগ্নতা সহনশীল ধানের জাত যেমন ব্রিধান৫১, ব্রিধান৫২, ব্রিধান৭৯ এবং ব্রিধান১১০ জাতগুলো বন্যাপ্রবণ উপজেলাগুলোতে দ্রুত সমপ্রসারণ করতে হবে। সয়শ্লিষ্ট বিজ্ঞানীর মতে, ব্রিধান১১০ প্রায় তিন সাপআহ পযন্ত জলমগ্ন অবস্থা সহ্য করতে পারে। তবে এসব ধানের জাতের বীজ সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী সবজি ও মসলা ফসলের সহনশীল জাত দ্রূত কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
চতুর্থত, এ দুই জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পৃথক কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। পাহাড়ি ঢলপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং নিচু জলাবদ্ধ এলাকার জন্য একক কৃষি কৌশল কার্যকর নয়। তাই উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে সেই অনুযায়ী ফসল নির্বাচন, বপনের সময় এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার, আধুনিক নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য সমন্বিত অবকাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। ষষ্ঠত, আদা, হলুদ, পান, সবজি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের জন্য পৃথক পুনর্বাসন প্যাকেজ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ এসব ফসলে কৃষকের বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি এবং ক্ষতির আর্থিক প্রভাবও অনেক গভীর। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং আবহাওয়াভিত্তিক ঝুঁকি অর্থায়নের আওতায় আনা জরুরি। সপ্তমত, কৃষি সমপ্রসারণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের কাছে নিয়মিত আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা, বন্যা–পূর্ব প্রস্তুতি, বন্যা–পরবর্তী করণীয় এবং বিকল্প ফসল সম্পর্কে পরামর্শ পৌঁছে দিতে হবে। ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা, মোবাইল অ্যাপ এবং এসএমএসভিত্তিক পরামর্শ ব্যবস্থার সমপ্রসারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অষ্টমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সহনশীল নতুন জাত, উঁচু বেডে চাষ, ভাসমান কৃষি, সংরক্ষণ কৃষি (ঈড়হংবৎাধঃরড়হ অমৎরপঁষঃঁৎব), উন্নত নিষ্কাশন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আবহাওয়া পূর্বাভাসের ব্যবহার নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষির এসব ক্ষয়–ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার থেকে নানামূখী পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে।
সবশেষে, কৃষি, পানি সম্পদ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কৃষিকে টেকসইভাবে দুর্যোগ–সহনশীল করা সম্ভব নয়। কৃষি বাজেটে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ–পরবর্তী পুনর্বাসন এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষকদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী দুর্যোগ–পরবর্তী কৃষি পুনরুদ্ধার কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সামপ্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি, কার্যকর সমপ্রসারণ সেবা এবং অঞ্চলভিত্তিক অভিযোজন কৌশল গ্রহণের মাধ্যমেই এই অঞ্চলের কৃষিকে আরও সহনশীল, উৎপাদনশীল ও টেকসই করা সম্ভব। তাই আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ভিত্তি রচিত হবে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ।











