প্রসঙ্গ : চট্টগ্রাম শহরে সকাল-সন্ধ্যা হাঁটার জায়গা

প্রীতিশ রঞ্জন বড়ুয়া | বৃহস্পতিবার , ১১ জুন, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

সকাল সন্ধ্যায় হাঁটা শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত উপকারী। সকালে হোক বা সন্ধ্যায় হোক, কিংবা দিনের যেকোনো সময়ে নিয়মিত ন্যূনতম এক ঘণ্টা হাঁটতে পারলে শরীর ও মন ফুরফুরে থাকে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। যেমন, সকালে হাঁটলে শরীরে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং সারাদিন শরীর সতেজ থাকে। সন্ধ্যার সময় হাঁটা শরীরকে শান্ত করে এবং রাতে ভালো ঘুম হয়। বর্তমানে ডাক্তাররা তাঁদের প্রেসক্রিপশনে সকালসন্ধ্যা ৪৫ মিনিট থেকে ৬০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন। কারণ, হাঁটা হলো একটি সহজ কিন্তু কার্যকর ব্যায়াম, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

চট্টগ্রাম শহরে সকাল সন্ধ্যা হাঁটার জন্য বেশ কিছু সুন্দর জায়গা আছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া যারা কর্মজীবী বা অফিসফেরত, তাঁদের জন্য হাঁটার জায়গা নেই বললেই চলে। যেমন সিআরবি এলাকা চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে সুন্দর, পরিবেশবান্ধব হাঁটার জায়গা। এখানে রয়েছে অনেক বড় পুরোনো গাছপালা, পাহাড় এবং সবুজশ্যামল শান্ত পরিবেশ। এটি সাত রাস্তার মিলনস্থল এবং সকলের পছন্দের তালিকায় একটি আইকনিক স্থান। এখানে বিভিন্ন পাখির ডাক শোনা যায় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। তবে খুব ভোরে এবং সন্ধ্যার পর নিরিবিলি হয়ে গেলে ছিনতাইয়ের ভয় থাকে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই এবং হকার ও খাবারের দোকানের কারণে পরিবেশ কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত। নিরাপত্তাজনিত কারণে অফিসফেরত লোকজন হাঁটতে যায় না।

ডিসিহিল পার্ক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেকোনো সময় হাঁটার জন্য খুবই উপযোগী স্থান। একদিকে প্রকৃতির সান্নিধ্য, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক নির্যাসদুটোই পাওয়া যায়। ছোট পাহাড়ি উঁচুনিচু ঘুরানো হাঁটার রাস্তা রয়েছে। খোলা জায়গায় নার্সারি ও অনেক গাছপালা আছে। অনেকে হালকা শরীরচর্চা করেন। যেমনশতায়ু, দীর্ঘায়ু, প্রভাতী আড্ডা, মর্নিং বার্ড ইত্যাদি নামে বিভিন্ন গ্রুপ নিয়মিত শরীরচর্চা করে থাকে। অনেক বয়স্ক লোকও হাঁটেন। বসার জায়গা আছে, অনেকে আড্ডাও দেন। মাঝেমধ্যে উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। তবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। রাত আটটায় গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে কর্মজীবী অফিসফেরত লোকজনের হাঁটার সুযোগ হয় না।

বিপ্লব উদ্যানে সকালের দিকে হাঁটতে পারলেও বিকেলে হাঁটা যায় না। এটি আড্ডার স্পট হিসেবে প্রাণবন্ত। বিভিন্ন ফুড স্টলে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। গাড়ির আওয়াজ, হকার, খাবারের দোকান সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশ অশান্ত বলা যায়।

জিলাপি হিলে অনেক ঘুরানোপ্যাঁচানো রাস্তা ধরে পাহাড়ের ওপর উঠতে হয়। উপরে শরীরচর্চার জন্য ছোট্ট একটি জায়গা আছে। পাহাড়ের ওপর সুন্দর পরিবেশ। তবে পর্যাপ্ত আলো নেই এবং নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।

লালদীঘি পার্কের পরিবেশ শান্ত। ধীরেসুস্থে হাঁটা যায়, আবার বসে সময় কাটানোর জন্যও ভালো। সকালে বেশি ভালো লাগে। দীঘির চারপাশে বিভিন্ন স্থাপনা থাকায় পুরোটা ঘুরে হাঁটা যায় না। বিকেলে রাস্তায় গাড়ি ও মানুষের ভিড়ের কারণে সেখানে যাওয়া কষ্টকর। জাম্বুরি পার্ক আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত একটি আধুনিক শহুরে পার্ক। সন্ধ্যার নয়নাভিরাম রঙিন আলোকসজ্জা, পরিপাটি ওয়াকওয়ে এবং ছোট লেকের কারণে সব বয়সী মানুষের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়। হাঁটার পাশাপাশি লেকের পাড়ে ও ঘাসের ওপর বসে আড্ডাও দেওয়া যায়। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হয়। পাঁচলাইশ জাতিসংঘ পার্ক ছোট পরিসরে সুন্দর একটি হাঁটার জায়গা। অনেকে এখানে হালকা ব্যায়ামও করেন। ফয়’স লেক প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য অন্যতম সেরা জায়গা। পাহাড়, লেক ও সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ। সকালে কুয়াশা ও স্নিগ্ধতায় লেকের পরিবেশ অসাধারণ লাগে। বোটিং, রিসোর্ট ও থিম পার্কও আছে। এটি চট্টগ্রামের অন্যতম বড় বিনোদনকেন্দ্র। তবে শহর থেকে কিছুটা দূরে এবং টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয় বলে সকাল সন্ধ্যা হাঁটার জন্য তেমন কেউ যায় না। বাটারফ্লাই পার্ক পতেঙ্গায় সুন্দর পরিবেশে অবস্থিত। দূরত্ব এবং প্রবেশ ফি থাকার কারণে নিয়মিত হাঁটার জন্য কেউ যায় না। নেভাল ও বিচ এলাকায় সকালসন্ধ্যায় হাঁটা যায়। সমুদ্রের সুশীতল বাতাস আছে। তবে শহর থেকে দূরে হওয়ায় নিয়মিত যাওয়া সম্ভব নয়। পার্ক ছাড়াও শহরের বিভিন্ন হাউজিং সোসাইটিতে হাঁটার সুন্দর পরিবেশ আছে। যেমননাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি পরিষ্কার, নিরাপদ, গোছানো পরিবেশ ও সুন্দর ওয়াকিং ট্র্যাক আছে। পরিবার নিয়ে হাঁটার জন্য ভালো। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার রাস্তায় সকালসন্ধ্যায় শান্ত পরিবেশে হাঁটা যায়। পরিকল্পিত কোনো হাঁটার ট্র্যাক ও বসার কোনো ব্যবস্থা নেই।

হালিশহর আবাসিক এলাকা সমুদ্রের কাছাকাছি। খোলা জায়গাও আছে, কিন্তু সব ব্লকে হাঁটার মানসম্মত পরিবেশ নেই। খুলশী আবাসিক এলাকা পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, শান্ত এবং সকালসন্ধ্যায় হাঁটার জন্য আদর্শ স্থান। তবে অভিজাত এলাকা হওয়ায় বাইরের লোকজন হাঁটতে যায় না। ডা. খাস্তগীর স্কুলের সামনের ফুটপাতে খুব সকালে বা সন্ধ্যায় হাঁটা যায়। বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য কিছু আসনও আছে। কিন্তু বিভিন্ন খাবারের দোকান ও হকাররা সেসব জায়গা দখল করে ব্যবসা করে। সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে। কাজীর দেউরি থেকে চট্টেশ্বরী রোড পর্যন্ত সড়কে অনেকেই সকালবেলা হাঁটেন। দেব পাহাড়জামাল খান এলাকার রাস্তা সকাল সন্ধ্যা হালকা হাঁটার জন্য ভালো। কাজীর দেউরি হয়ে স্টেডিয়ামের চারপাশের ফুটপাতেও হাঁটা যায়।

নগরীর বিভিন্ন ফুটপাতের প্রায় ৮০ শতাংশ হকারদের দখলে। তাই সন্ধ্যায় হাঁটা বড় অসুবিধা। তাছাড়া ময়লাআবর্জনা ও দুর্গন্ধের কারণে সকালবেলাতেও ফুটপাত দিয়ে হাঁটা দুর্বিষহ। তারপরও শরীর সুস্থ ও মনকে সতেজ রাখার জন্য, যেসব স্থানে হাঁটার সুযোগ আছে, সেসব জায়গায় এলাকাভিত্তিকভাবে সবার হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। হাঁটার সময় আরামদায়ক জুতা পরা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমা কেন কাঁদে
পরবর্তী নিবন্ধবিপুল করুণার উপকূলে প্রফেসর ডা. মাহমুদুল হক চৌধুরী