আনোয়ারায় শুরু হচ্ছে নতুন শিল্প অধ্যায়। যাত্রা শুরু করেছে বহুল প্রত্যাশিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠছে এই শিল্পজোন। এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে গত ২৭ জুলাই। এর পরপর বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সাব–লিজ চুক্তি, ওয়ান–স্টপ সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন এবং ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রকল্পটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
গতকাল দৈনিক আজাদীতে আনোয়ারায় ‘নতুন যুগের’ অপেক্ষা শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে। এই শিল্পজোনকে ঘিরে চীনা বিনিয়োগকারীদের মাঝে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে ইতোমধ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চায়না ইকোনমিক জোন ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আলোর মুখ দেখা এই চীনা শিল্পজোনে আশার কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এই শিল্পাঞ্চলের প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় প্রকল্পের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনায় প্রথম কারখানা দ্রুত চালুর বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়। শুরুতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি ধারণা দিলেও ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
চীনের সঙ্গে জি–টু–জি (সরকার–টু–সরকার) সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠছে বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর এর অবস্থান কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে, আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায়। একদিকে কর্ণফুলী টানেল, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় শিল্প ও লজিস্টিকসের দিক থেকে প্রকল্পটির অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলটির অবস্থানগত সুবিধা থাকায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বিনিয়োগ সেবা নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের জন্য নেওয়া সড়ক প্রকল্পগুলোও সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁরা বলেন, এই শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান। সময়মতো অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করা গেলে এটি চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শিল্প করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য যে, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর মিরসরাই থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় নতুন শিল্প করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই করিডরে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও লজিস্টিক অবকাঠামোকে একই অর্থনৈতিক বলয়ে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে কর্ণফুলী টানেল চালু হয়েছে। আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশ পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। একই সঙ্গে আনোয়ারার কালাবিবির দিঘি থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়ার টইটং হয়ে কক্সবাজারের মাতামুহুরী পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত করা হবে। এতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে যাওয়ার পথ সহজ হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে একই সময়ের মধ্যে বন্দর, সড়ক ও শিল্পাঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। শিল্পাঞ্চলটির আরেকটি সুবিধা হবে নিজস্ব বহুমুখী জেটি। এতে কিছু কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নদীপথে আনা–নেওয়া যাবে। ফলে সব পণ্যের জন্য সড়কের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
খাত–সংশ্লিষ্টদের আশা, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসবে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের প্রচুর সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে এবং চট্টগ্রাম আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে ওঠার নতুন সুযোগ পাবে।








