নানা ধরনের অপরাধে কিশোররা জড়িয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরাধের পরিধিও বেড়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তাণ্ডব বর্তমানে জনজীবনের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা কিংবা নৃশংস আক্রমণের মতো ঘটনাগুলো এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র। সমপ্রতি মোহাম্মদপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা বর্তমানে কতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি, যৌথ বাহিনী ও পুলিশের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের বাগে আনতে পারছে না। অজ্ঞাত কারণে তারা অসহায়। বৃহস্পতিবার পত্রিকান্তরে খবরে প্রকাশ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গডফাদারদের নাম বদলালেও বাস্তবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ও তাদের অপতৎপরতার কোনো হেরফের হয়নি; বরং কোনো কোনো এলাকায় আরও ভয়াবহ রূপে এই সামাজিক ব্যাধির বিস্তার ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেই এ অপরাধী চক্র সক্রিয়, যা নগরবাসীকে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেন, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও আইনের দুর্বল শাসন কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির কারণ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তুলনায় কিশোরদের আইন ভাঙার শাস্তি কম হওয়ায় একদল অসাধু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের আশ্রয়ে গড়ে তুলছে কিশোর গ্যাং এবং তাদের দিয়ে সংঘটিত করাচ্ছে মাদক ব্যবসা, খুন, এমনকি মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ। সাধারণ মানুষের কাছে এখন আতঙ্কের নাম কিশোর অপরাধ। শহরে বা গ্রামে কিশোররা শিক্ষক কিংবা বয়স্ক কাউকেই তোয়াক্কা করে না। তামাকদ্রব্যের সহজপ্রাপ্যতা কিশোরদের অপরাধ জগতে শুরুটা করে দিচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতি, পদ পদবির জন্য কিশোররা রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারী হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে কিশোররাই হবে মানবতার অগ্রদূত, আমাদের দুঃখ, সেখানে তারা হয়ে উঠছে যমদূত। এদের নির্মূলে খুব দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মনে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, ধর্ষণ ভীতি বাড়তেই থাকবে।
বিশ্লেষকরা বলেন, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কর্মসংস্থানের অভাব, অপরাধ ও সহিংসতা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার জন্ম দেয়। যাবতীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, কর্মসম্পাদনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাপ্ত সরকারি–বেসরকারি সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে কিশোর তরুণদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিশোর গ্যাং, যা এখন সমাজের বিষফোড়া হিসেবে পরিণত হয়েছে। কিশোর গ্যাং মানে আতঙ্ক। এটাকে কোনোভাবেই যেন প্রতিহত করা যাচ্ছে না। এদের কর্মকাণ্ড যেন দিনদিন আগ্রাসী ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সারা দেশে এখন এর বিস্তার লাভ করেছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, যৌন হয়রানি, মাদক গ্রহণ, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি এই কিশোর গ্যাং কালচারের শিকড় তুলে না ফেলা যায়, তবে ভবিষ্যতে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। এ জন্য সর্বপ্রথম পরিবারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু নিজে ভালো থাকলে চলবে না, অন্যরাও যাতে ভালো থাকে সে চেষ্টাও করতে হবে। সন্তান যেন লেখাপড়ার পাশাপাশি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে মা–বাবা এবং অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এটা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার কাজ নয়, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনীতির দুষ্টচক্রে নিজের স্বার্থে কেউ কিশোর গ্যাং গড়ে তুললে পুলিশের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কঠোর হস্তে তা দমন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে জোর দিতে হবে। তা না হলে সামনে খুব খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। কিশোর গ্যাং যেহেতু এটি একটি সামাজিক অপরাধ, তাই সমাজের সবার দায়বদ্ধতা রয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে সঠিক পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ কিশোর অপরাধ কমাতে অনেক সাহায্য করবে। সেই সঙ্গে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কঠোর হতে হবে।
আমরা জানি, পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিশোর অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছেন। রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারি। তবে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা রোধে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি সময়ক্ষেপণ করা হয়, তাহলে এই দেশ অচিরেই অরাজক দেশে পরিণত হবে। তাই দেশকে বাঁচাতে কিশোর অপরাধ কঠোরভাবে দমন করা জরুরি।








