কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুম্বাই, পুনে কিংবা রাজস্থানের মতো বড় বড় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষ ও সমাজকর্মীদের উদ্যোগে একটি বিশেষ সামাজিক সচেতনতা প্রচারণা শুরু হয়েছিল, যার মূল আহ্বান ছিল নগদ টাকা ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করে ভিক্ষুকদের খাবার ও পানি দেওয়া। বার্তাটিতে সরকারি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এর পেছনের মূল ভাবনাটি ছিল সুদূরপ্রসারী: নগদ টাকার জোগান বন্ধ করে অপরাধ চক্র ও ভিক্ষা মাফিয়ার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। বর্তমানে আমাদের দেশে দিন যতই এগোচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। যানবাহন বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট। এই যানজটে বসে থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা মেলে এক ভিন্ন চিত্রের ৪ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত ভিক্ষা করছেন। এক বাস থেকে আরেক বাসে, এক গাড়ির জানালা থেকে অন্য গাড়ির জানালায় ঘুরে বেড়ানো ভিক্ষুকের সংখ্যা রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গায় ক্রমেই বাড়ছে। কেউ অভাবের তাড়নায়, কেউবা এটিকে সহজ পেশা বানিয়ে নিয়েছে।
বর্তমান মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে আড়াই লাখ ভিক্ষুক রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন জরিপে এই সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ দিনগুলোতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোতে দৈনিক প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভিক্ষাবৃত্তির সাথে যুক্ত থাকে। নগরীর একেকটি বড় শপিং মল বা বিপণিবিতানের সামনে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১৫০ জন ভিক্ষুক অবস্থান নেয়, আর বড় বড় মাজার প্রাঙ্গণে এই সংখ্যা দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। তবে এই নিয়মিত সংখ্যার বাইরে সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটে ধর্মীয় ও বিশেষ দিনগুলোতে। জুম্মাবার, শবে বরাত, শবে কদর কিংবা ঈদের দিনগুলোতে এই সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে জুমার নামাজের পর ঢাকার একেকটি বড় মসজিদের সামনে ২০০ থেকে ৪০০ জন পর্যন্ত ভিক্ষুক সমবেত হয়। শবে বরাত ও শবে কদরের মতো পবিত্র রাতে প্রধান প্রধান মসজিদ এবং মাজারগুলোর সামনে এই সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে হাজার পর্যন্ত পৌঁছায়। এই বিশেষ দিনগুলোতে ধর্মপ্রাণ মানুষের দান করার মানসিকতা এবং ধর্মীয় আবেগকে সিন্ডিকেটগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ট্রাক বা বাসে করে ভিক্ষুকদের এনে নির্দিষ্ট স্পটে নামিয়ে দেওয়া হয়।
চিরাচরিত পেশাদার ভিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে ‘ছদ্মবেশী ভিক্ষাবৃত্তি’, যার একটি ঘটনা সমপ্রতি ঢাকার তেজগাঁওয়ে আমার স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ভরদুপুরে আমি যখন তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছিলাম, তখন রাস্তার পাশে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। একজন সুস্থ–সবল রিকশাচালক তার রিকশাটি রাস্তার পাশে রেখে হঠাৎ আমার সামনে এসে বললেন, ‘ভাই, খুব ক্ষুধা লাগছে, ভাত খাবো। কিছু টাকা দিন।’ তার কর্মক্ষম শরীর দেখে প্রথম দেখায় কেউ তাকে পেশাদার ভিক্ষুক ভাববে না। রিকশা চালিয়ে যার নিশ্চিত আয়ের মাধ্যম রয়েছে, সে কেন ভিক্ষা করবে – এই ভেবে আমি অবাক হলাম এবং স্বভাবতই তাকে কোনো টাকা না দিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পরবর্তী কয়েক মিনিটে যা ঘটল, তা এককথায় চোখ খুলে দেওয়ার মতো। সেই রিকশাচালক একে একে আরও তিনজন পথচারীর সামনে গিয়ে একই আকুতি জানালেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই ভাতের কথা বলে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা তুলে নিলেন। সাধারণ মানুষ ভাবলেন, একজন খেটে খাওয়া রিকশাচালক যখন বলছেন, ক্ষুধার্ত, তখন নিশ্চয়ই তিনি মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু টাকা পকেটে ভরার পরপরই সেই চালকের আসল রূপ উন্মোচিত হলো। তিনি আশেপাশের কোনো ভাতের হোটেলের দিকে না গিয়ে, অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে নিজের রিকশায় উঠে বসলেন এবং দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করলেন। ভাত খাওয়া নয়, বরং মানুষের তাৎক্ষণিক সহানুভূতিকে পুঁজি করে খুব সহজে এবং কম পরিশ্রমে টাকা কামানোর এক সূক্ষ্ম নাটকের মঞ্চায়ন করলেন তিনি। এই সহজ এবং করমুক্ত আয়ের লোভ মানুষকে দিন দিন শ্রমবিমুখ ও চতুর প্রতারক বানিয়ে তুলছে।
এই সুসংগঠিত এবং ছদ্মবেশী ভিক্ষাবৃত্তি সমাজব্যবস্থার ওপর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, এটি প্রকৃত পরিশ্রমী রিকশাচালক ও মেহনতি মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে, যারা সততার সাথে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জীবিকা নির্বাহ করেন। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের চতুর প্রতারণার ফলে মানুষের ভেতরের সহজাত মানবিকতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যখন একজন সাধারণ নাগরিক বারবার এমন ছদ্মবেশী প্রতারণার শিকার হন, তখন তিনি একসময় সত্যিকারের কোনো বিপদে পড়া অসহায় মানুষকে দেখলেও তাকে ‘প্রতারক’ ভেবে মুখ সরিয়ে নেন। ফলে সমাজের প্রকৃত অভাবী মানুষরা সাহায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে জোরালো অভিযান চালিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত পেশাদার ভিক্ষুক ও সিন্ডিকেট সদস্যকে আটক করে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সরকার থেকে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই পুনর্বাসন খাতে বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ঢাকার একটি ব্যস্ত মোড়ে বা ধর্মীয় দিনে ভিক্ষা করে একজন ব্যক্তি অনায়াসে মাসে ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয় করতে পারেন, যা গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসার আয়ের চেয়ে অনেক বেশি।
ভিক্ষাবৃত্তি নিঃসন্দেহে একটি সামাজিক অনাচার ও বৈষম্যের প্রতীক। তাই এই সূক্ষ্ম প্রতারণার জাল উপড়ে ফেলতে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। রাস্তায় যেকোনো আবেগঘন কথা শুনেই তাৎক্ষণিক নগদ টাকা বের করে দেওয়া কোনো দয়া বা পুণ্য নয়; বরং এটি অপরাধকে উস্কে দেওয়া।
ক্ষুধার্ত কাউকে দেখলে নগদ টাকা না দিয়ে সরাসরি খাবার কিনে দেওয়া, কিংবা ওষুধের কথা বললে দোকান থেকে ওষুধ কিনে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। নগদ টাকার জোগান বন্ধ করতে পারলে এই ছদ্মবেশী নাট্যকারেরা বাধ্য হয়ে আবার সৎ শ্রমের পথে ফিরে আসবে। পেশাদার ভিক্ষুকদের প্রতিরোধ করতে হবে, পাশাপাশি প্রকৃত অভাবীদের জন্য টেকসই আয়ের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় উদ্যোগ অপরিহার্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সমাজব্রতী












