স্মরণ: প্রকৌশলী এ এ এম জিয়া হোসাইন

মোয়াজ্জেম হোসেন | সোমবার , ১ জুন, ২০২৬ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ

আলোকিত গুণীজন, সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী, কোরিয়ান গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি ইয়ংওয়ান এর চিফ এডভাইজার, আনোয়ারা কর্ণফুলী ইয়ংওয়ান ইপিজেড প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন।

ইঞ্জিনিয়ার আবু আমির মোহাম্মদ জিয়া হোসাইন সংক্ষেপে এএএম জিয়া হোসাইন সাতকানিয়া পৌরসভা ১নং ওয়ার্ড দক্ষিণ রামপুর মৌলভি বাড়িতে ১ নভেম্বর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলানা আবদুল অদুদ খ্যাতিমান আলেম ছিলেন। তিনি ভারতের দেওবন্দে পড়াশুনা করেন। উর্দু ভাষায় শের ও কবিতা লিখতেন। তাঁর মাতার নাম খোরশেদা বেগম।

জনাব জিয়া হোসাইন মধ্য রুপকানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (দারোগা স্কুল) ভর্তি হন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে এসে সাতকানিয়া সরকারি প্রাথমিক ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে সাতকানিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণিতে মহসিন ফান্ড থেকে ১০ টাকা বৃত্তি লাভ করে, তা দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে আরবি বিষয়ে উরংঃরহপঃরড়হ নম্বরসহ ঢাকা বোর্ডের অধীনে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মেধা তালিকায় ১৯তম স্থানসহ প্রথম বিভাগে পাস করেন। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে ইটঊঞ) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ ১ম শ্রেণিতে ২য় স্থান অধিকার করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রীয় সরকারের বৃত্তির অধীনে চড়ংঃ এৎধফঁধঃব ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঊশরংঃরপং থেকে দুই বছরের উরঢ়ষড়সধ রহ ঊশরংঃরপং ডিগ্রি লাভ করেন।

ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রিক কোম্পানির অধীনে কাপ্তাই হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্টেএসিস্ট্যান্ট জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন। চাকরিতে থাকাবস্থায় ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে গ্রিসের এথেন্স পাড়ি দেন। এক বছর পড়াশোনা শেষে করাচি উবাবষড়ঢ়সবহঃ অঁঃযড়ৎরঃু তে ঞড়হি চষধহহবৎ হিসেবে যোগদান করেন। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ৯ টি ইনক্রিমেন্ট নিয়ে যোগ দান করেন, ২ মাস পর এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, ৪ বছর পর সুপারিনটেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সিডিএর চীফ ইঞ্জিনিয়ার ও ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সিডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সিডিএ কর্মরত থাকাবস্থায় সুদীর্ঘ ১৩ বছর ব্যাপী মেট্রোপলিটন সিটির পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, বহুতল বিশিষ্ট শপিং কমপ্লেক্স, শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের আবাসন সুবিধা ও অন্যান্য নগর অবকাঠামো তৈরী ও সেসবের বাস্তবায়নে বিরাট অবদান রাখেন। সিডিএতে কর্মরত অবস্থায় তিনি জমিয়তুল ফালাহ কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট (বিপণি বিতান), আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকা, খুলশী আবাসিক এলাকা, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা ও বাস স্টেশন সিটির বাইরে স্থানান্তরসহ চট্টগ্রাম মহানগরী মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের মেম্বার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণের পর ২ বৎসরের জন্য একই পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ পান। তারপর বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টরে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে এডভাইজার হিসেবে যোগদান ও ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সুদীর্ঘ কর্ম জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি সিডিএতে থাকাকালীন ১৯৬৭১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে টঘ এর ফেলোশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডের ঝঃৎঁপঃুপধষ টহরাবৎংরঃু থেকে প্রশিক্ষণ এবং ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ইধৎহরহমযধস টহরাবৎংরঃু থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি টঘওউঙ ‘র ফেলোশিপ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন সম্বন্ধে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও ইনভেস্টমেন্ট আনয়নের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেন।

ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন সমুদ্র তীরবর্তী সিটি নিয়ে মেমোগ্রাম লিখেন টঘ’র অধীনে। এছাড়াও ইংল্যান্ডে থাকাবস্থায় ইৎরঃরংয ঃড়হি ঢ়ষধহহরহম ঢ়ৎধপঃরপব নামক গ্রন্থ রচনা করেন।

ব্যক্তি জীবনে ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইন: বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটের ফেলো। বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের ফেলো। চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের আজীবন সদস্য। চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন আজীবন সদস্য। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক হাসপাতালের আজীবন সদস্য। চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের আজীবন সদস্য। লায়ন ক্লাবের চট্টগ্রাম ডিস্ট্রিক্ট গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন কয়েক দফা। আশির দশকে ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের কয়েক টার্মের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।তিনি কর্মজীবনে বিভিন্ন সভাসেমিনারে যোগদান ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড, হংকং, সৌদি আরব ও ভারত সফর করেন।

এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইনে গত ১২ মে ২০২৬ রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে জাতি একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারালো। ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইনের সহধর্মিনী সাবেক গণপরিষদ সদস্য ও জমিদার আহমদ কবির মিয়া চৌধুরীর কন্যা আয়েশা হোসাইন। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের পিতা। ইঞ্জিনিয়ার জিয়া হোসাইনের মৃত্যুতে শিক্ষা, নগর পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘ অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর কর্মময় জীবন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক এ গবেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপেশাদার ও ছদ্মবেশী ভিক্ষাবৃত্তি : সংকটে মানবিকতা
পরবর্তী নিবন্ধসিস্টেম উন্নয়নই হোক দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার