পুরান ঢাকা, ঢাকার প্রাচীনতম অংশ, তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং অনন্য ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এই এলাকাটির প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে মুগ্ধকর গল্প এবং স্মৃতিচিহ্ন। পুরান ঢাকা শুধু একটি জায়গা নয়; এটি বাংলার অতীত এবং বর্তমানের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। ৪০০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত এক মহা আখ্যান। এ জনবসতির হদিস মেলে আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টাব্দে। বুড়িগঙ্গা তীরের ঢাকা সপ্তদশ শতাব্দীতে হয়ে ওঠে অন্যতম এক নগরী, মোগল সাম্রাজ্যের বাংলা প্রদেশের রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর।
সুবাদার ইসলাম খানের সে রাজধানী উপমহাদেশের ঘটনাবহুল ইতিহাসের এক অন্যতম পটভূমি। অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর পদচারণায় বর্ণিল সব ঐতিহ্য একে একে জমা হতে থাকে ঢাকার নিজস্ব পলেস্তারায়। পরীবিবির শেষ শয়নের স্মৃতিচিহ্নবাহী লালবাগের কেল্লা থেকে নবাবদের স্মৃতিবিজড়িত আহসান মঞ্জিলের প্রাঙ্গণে, সুপ্রাচীন বুড়িগঙ্গার অগণিত ঢেউয়ে, বিনত বিবির মসজিদ, খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ কিংবা শায়েস্তা খাঁর মসজিদসহ অসংখ্য মসজিদের সুরেলা আজানের ধ্বনিতে, ফরাশগঞ্জের ফরাসি কুঠির রাস্তার চিরচেনা মসলার ঘ্রাণে, প্রাচীন বাজার, রূপলাল দাসের সাধের ভবনে, বিউটি বোর্ডিংয়ে পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত সেদিনের তরুণ কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল আজাদ বা আরও যত কবি ও সাহিত্যিকদের আলাপচারিতায়, রেবতী বাবুর লজে, ঢাকেশ্বরীর ঢাকে, হোসেনি দালানের তাজিয়া মিছিলের রবে, আরমানিটোলার চার্চে, কার্জন হলে লালে ৪০০ বছরের এ মহানগর ক্রমে হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক নিখাদ বিবরণ।
কালে কালে পুরান ঢাকায় গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক বাজার, যা আজও জানান দেয় ইতিহাসের।
শাঁখারিবাজার : চারশো বছরের পুরনো ঢাকা শহরের এক ঐতিহ্যপূর্ণ এলাকা শাঁখারিবাজার। শঙ্খ বা শাঁখ শিল্পে পটুয়ায়েরা বংশানুক্রমে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখেন। তাঁদের পেশার নামানুসারেই শাঁখারিবাজার নামকরণ করা হয়েছে। এখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজার যাবতীয় সামগ্রী, শাঁখা, পূজার থালা, সিঁদুর, টিপ, আবির, প্রদীপ, বিয়ের টোপর, ফুল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়।
একসময় ঢাকা বিখ্যাত ছিল শাঁখারিদের তৈরি শাঁখার জন্য। ইতিহাস বলে, আঠারো শতকে প্রায় সাড়ে আটশো শাঁখারি শিল্পী ঢাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। শাঁখারিবাজার হিন্দু বসবাসকারী এলাকা হওয়ায় ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ, হানাদার বাহিনী সবার প্রথমে শাঁখারিবাজার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাঁখারিরা দেশত্যাগ করেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর তাঁরা আবার এসে বসবাস শুরু করেন এই শাঁখারি পট্টিতেই।
তাঁতীবাজার : তাঁতীবাজার, অর্থাৎ যেখানে কাপড়ের বাজার বা তাঁতীদের অবস্থান। কিন্তু পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের সংজ্ঞা একটু ভিন্ন। এখানে কাপড় নয়, সোনা–রূপার ব্যবসায় ব্যস্ত তাঁতিরা। একসময় কাপড়ের রমরমা ব্যবসা ছিল ঠিকই। কাপড়ের ব্যবসায় লোকসান দেখা দিলে তাঁতিরা ধীরে ধীরে বস্ত্রবুনন ছেড়ে অলংকার ব্যবসার দিকে ঝুঁকে যান, কারণ অলংকারের ব্যাপক চাহিদা ছিল সে সময়। জানা যায়, তাঁতীবাজারের আশপাশ ঘিরেই সে সময় ঢাকা হয়ে উঠেছিল মোগল ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
লক্ষ্মীবাজার : ইতিহাস বলে, ১৭৩০ সালে কাশ্মীরের মিয়া সাহেব আব্দুর রহিম রিজভী নামের এক মুসলিম ব্যক্তি পুরান ঢাকার এই এলাকায় এসে একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর থেকে এই এলাকার নাম হয় মিয়া সাহেবের ময়দান। তাঁর মৃত্যুর পর এখানেই তাঁর একটি মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়।
পলাশীর যুদ্ধের পর এখানে, এই এলাকাতেই লক্ষ্মীনারায়ণ ঠাকুর, স্বনামে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির স্থাপন করেন। ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে তাই পূর্বের নাম পরিবর্তন করে লক্ষ্মীবাজার রাখা হয়।
চকবাজার : মোগল যুগে, মোগলরা যেখানেই যেত, সেখানেই দুর্গ নির্মাণ করত। আর এভাবেই দুর্গকে ঘিরে আশপাশে বাজার বসত। দুর্গকে কেন্দ্র করে যেসব বাজার গড়ে উঠত, তাদের ‘পাদশাহী বাজার’ বলা হতো। এভাবে চকবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার পেছনে চকবাজারের আরেকটি কারণ আছে। চকবাজারকে পূর্বে ‘নাখাস’ নামেও ডাকা হতো। ‘নাখাস’ শব্দের অর্থ ক্রীতদাস। প্রথমদিকে এখানে ক্রীতদাস বেচাকেনা হতো, তাই এ সূত্রেই হয়তো বাজার বসেছিল আজকের চকে।
বেগমবাজার : এই এলাকার নামের পেছনে একটা ঘটনা আছে। লোকে বলে, ১৯৩৯–১৯৪০–এর দিকে ঢাকার নায়েব–ই–নাজিম ছিলেন সরফরাজ খানের আদরের কন্যার নাম ‘লাডলি বেগম’–এর নামে এই এলাকাটির নামকরণ হয়েছে বেগমবাজার। বেগমবাজার মসজিদের কাছে নির্মিত মাছের বাজারের মালিক ছিলেন লাডলি বেগম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৭৭৭ সালে বড় ধরনের এক অগ্নিকাণ্ডে বাজারটি পুড়ে যায়।
বঙ্গবাজার : প্রথমদিকে ঢাকার চকবাজারে মুসলিম পুঁথি ছাপা হতো কেতাবপট্টি নামের এলাকার। এরপর বাবুবাজারেও বই ছাপা হতো। ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের পর বাংলাবাজারে আস্তে আস্তে বইয়ের দোকান চালু হতে লাগল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে ঘিরে পূর্ববাংলায় এক সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হয়। ওই সময় থেকে বাংলাবাজার হয়ে ওঠে কবি–সাহিত্যিক–শিল্পী–গবেষকদের আড্ডাখানা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে পশ্চিম বাংলার মুসলমান বই ব্যবসায়ীরা বাংলাবাজারে এসে বসেন। এর সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিল একঝাঁক নতুন প্রকাশনা সংস্থা নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, মালিক লাইব্রেরি, খোশরোজ কিতাব মহল, হার্ডসন অ্যান্ড কোম্পানি ইত্যাদি। এগুলো ছাড়াও, ফিরিঙ্গিবাজার, কাপ্তানবাজার, নয়াবাজার, আলুরবাজার, বাবুবাজার, লাজিরাবাজার, বকশীবাজার, কলতাবাজার, ঠাটারিবাজার এলাকাও সে আমলেরই নিদর্শন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক; ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।












