আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে অগণিত প্রশংসা এবং রাসূল (দ.) এর দরবারে লাখো–কোটি দরুদ ও সালামের হাদিয়া। দরুদ শব্দের অর্থ রহমত, দয়া ও করুণা প্রার্থনা করা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক এই প্রার্থনাই দরুদ। পবিত্র দরুদ শরীফের সুবাসে সকলের হৃদয় হয়ে উঠে নির্মল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম প্রেরণ কর” (সূরা আল–আহযাব, আয়াত ৫৬)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে এই একটি কাজ আছে যেটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই করেন।
মানুষ আজ শারিরীক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতা ও নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। আর এই সংকটে প্রশান্তি দিতে পারে নবী প্রেমের রুহানী সম্পর্কের অন্যতম মাধ্যম দরুদ শরীফ।
হতাশা ও বিষণ্নতার চরম সময়ে দরুদ শরীফ আপনাকে দিবে পরম শান্তি। দরুদ শরীফ পাঠ প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উম্মতের দূরত্ব কমিয়ে দেয়।
আমাদের শৈশবে গ্রামে একটি সুন্দর রেওয়াজ ছিল, প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরুদ শরীফ পাঠের আসর। এটি ছিল শুধু একটি আমল নয় বরং আমাদের পিতা–মাতাদের পক্ষ থেকে সন্তানদের জন্য একটি বিশেষ শিক্ষা ও নির্দেশনা। দরুদ পাঠের সেই সুর সকলকে নিয়ে যেত এক অপার্থিব জগতে। যান্ত্রিক এই সময়ে সুন্দর রেওয়াজগুলো অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই দরুদ শরীফের সাধনায় ছিল সকল মুমিন বান্দার ধ্যান। বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেছেন, “আমার যত পূর্ণতা তা একমাত্র দরুদ শরীফের মাধ্যমে অর্জিত।”
প্রিয় নবীজী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি (দয়ালু নবীজী–এর পরিবারের প্রতি) ভালোবাসা ছাড়া দরুদ শরীফের আধ্যাত্মিক বরকত পাওয়া সম্ভব নয়।
দরুদ শরীফের বিষয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলেন, “দু’আ আসমান ও জমিনের মধ্যে আটকে যায় এবং এর কিছুই উপরে উঠে না যতক্ষণ না আপনি আপনার নবী (দ.) এর উপর দুরূদ পাঠান। ( তিরমিযী আল–জামি‘উস–সহিহ)।
‘শরফুন নবুওয়ত’ কিতাবে আরো উল্লেখ আছে, উম্মুল মু‘মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) একদিন প্রদীপ জ্বালিয়ে কাপড় সেলাই করছিলেন। হঠাৎ তাঁর হাত মুবারক থেকে সুঁই মাটিতে পড়ে গিয়ে প্রদীপ নিভে গেল। ঠিক সেসময় রাসূল (দ.) ঘরে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করার সাথে সাথে তাঁর জ্যোতির্ময় চেহারার আলোর দীপ্তি ও উজ্জ্বলতায় সেই সুঁইটি পাওয়া গেল। এতে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) অতীব আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান এবং আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (দ.)! আপনার পবিত্র মুখাবয়ব কতই না উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়! অতঃপর রাসূল (দ.) ইরশাদ করেন, ঐ–ব্যক্তির জন্য আফসোস ও অনুশোচনা যে বিভীষিকাপূর্ণ কিয়ামত দিবসে আমার সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হবে। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা ( রা.) আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ঐ ব্যক্তি কে হবে যে আপনার সাক্ষাৎ পাবে না? হুযুর পাক (দ.)বলেন, কৃপণ। হযরত আয়েশা ( রা.) সবিনয়ে আরয করলেন, সে কোন ধরনের কৃপণ! রাসূল (দ.) ইরশাদ করেন, ‘ঐ–ব্যক্তিই বড় কৃপণ, যার সম্মুখে আমার নাম মুবারক উচ্চারিত হয়; অথচ সে আমার প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করে না। ‘মুখে নাম উচ্চারণ করলে যেমন দুরূদ ও সালাম পড়া ওয়াজিব, তেমনি কলমে লেখার সময়ও দরূদ এবং সালাম লেখা ওয়াজিব। শুধু তাই নয়, আরো অসংখ্য আশেকে রাসূলগণের লেখায় ও বাণীতে দরুদ শরীফের শান মান মর্যাদার কথা উঠে এসেছে।
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ( রহ.) বলেছেন, “ যে ব্যক্তি নিয়মিত দরুদ শরীফ পাঠ করে, তার জন্য দোজখের আগুন হারাম হয়ে যাবে। ” হযরত আনাস বিন মালেক ( রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন– “হে লোক সকল! তোমরা দরূদ শরীফের মাধ্যমে মাহফিলের সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধি করো। কেননা কিয়ামত দিবসে আমার প্রতি প্রেরিত তোমাদের দরূদ শরীফ তোমাদের জন্যে আলো ও জ্যোতিস্বরূপ হবে।”
ইবনে আবু আসেম হযরত আবদুল্লাহ বিন্ উমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত “ যে কেহ আমার উপর একবার ‘দরূদ শরীফ’ পাঠ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাহার উপর দশবার রহমত নাযিল করেন এবং ফেরেশতারাও তাহার প্রতি রহমত নাযিল হবার জন্য দশবার প্রার্থনা করে থাকেন। যাহার ইচ্ছা হয় বেশি করুক অথবা কম করুক।” হযরত আলী (রা.) বলেন,“সমস্ত দোয়াই বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, যতক্ষণ রাসূলুল্লাহ (দ.)-এর উপর এবং তাঁর সন্তান–সন্ততির (আহলে বাইত) উপর দরূদ পাঠ না করা হয়।” বর্ণিত আছে যে, হুযূর পাক (দ.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আমার নিকট কিয়ামত দিবসে ‘হাওযে কাওছারে’ মানব সমপ্রদায়ের এত বেশি সমাগম ও ভীড় হবে যে, আমি তাদের পরিচয় পাব না কিন্তু আমার প্রতি তাদের অসংখ্য দরূদ শরীফ প্রেরণের কারণে তাদের পরিচয় লাভ করতে পারব। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) এর মসনবী শরীফে উল্লেখ আছে, একবার প্রিয়নবী (দ.) একটি মৌচাকের মৌমাছিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কীভাবে মধু তৈরী করে থাক? সে উত্তরে আরয করলো, হে আল্লাহর হাবীব (দ.) আমি বাগানে গিয়ে সর্বপ্রকারের ফুলের রস চুষে নেই তারপর সেই রস মুখে করে এনে মৌচাকে ঢেলে দেই আর সেটিই মধু হয়ে যায়। প্রিয় নবী (দ.) পুনরায় জানতে চাইলেন, এই রসে মিষ্টি কীভাবে সৃষ্টি হয়? কেননা ফুলের রস তো সুমিষ্ট নয় তখন মৌমাছি আরয করলো, যখন আমরা মুহাম্মদ মুস্তফা (দ.) এর উপর দরুদ পাঠ করি, তখন তিতা দূর হয়ে তা মিষ্টিতে পরিণত হয়। (সুবাহানাল্লাহ)
হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী (রহ.) এক লেখায় পাওয়া যায়, তাঁর মহান বুযুর্গ পিতা তাঁকে এই দরূদ শরীফটি শিক্ষা দিয়েছিলেন, “আল্লাহুম্মা ছাল্লেআলা মুহাম্মাদানিন নাবীয়্যিল–উম্মী ওয়া আলিহী ওয়া বারেক ওয়া সাল্লাম।”
স্বপ্নের মধ্যে তিনি এই দরূদ শরীফ রাসুল (দ.) এর সামনে পাঠ করলে, প্রিয় নবীজী তা পছন্দ করেন। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ আরও বলেন, তাঁর খান্দান ( বংশ) যা কিছু লাভ করেছে, তা এই দরূদ শরীফের কল্যাণেই হয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) এর এই সময়সহ আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, হৃদয়ের গভীর থেকে দরুদ শরীফের সুবাস ছড়িয়ে দিই নিজের জীবনে, পরিবারে, সমাজে। এই সুবাস যেন হয়ে ওঠে আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী, আমাদের অন্তরের চিরস্থায়ী আতর। লেখক: প্রাবন্ধিক, কলেজ শিক্ষক।












