পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)- প্রিয় নবীজির আগমন দিবস, সমগ্র কূলকায়েনাতের জন্য মহা আনন্দের দিন। এটি কেবল ব্যক্তি মোহাম্মদের স্মরণ নয়; বরং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়স্বরূপ তাজিমের সাথে মহব্বত প্রকাশের দিন। ‘রহমত’ হিসেবে পাওয়া নূরের প্রতি দরুদ–সালাম পেশ করার দিন। নবীপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আনন্দে উদ্বেলিত থাকার দিন। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উদার চিত্তে একে অপরকে ক্ষমা করার দিন। হিংসা– বিভেদ, বৈষম্য ভুলে একে অপরকে আপন করে নেওয়ার দিন। যে নেয়ামত প্রাপ্তির ফলে সমগ্র সৃষ্টিজগত আনন্দে উদ্বেলিত ছিল, সেই নেয়ামত হলো দো–জাহানের বাদশাহ, রহমতুল্লিল আলামিন, কূল –কায়েনাতের মাথার মুকুট, হজরত আহমদ মোজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.)। নূর নবীজির আগমন প্রকৃতির জন্য এক ও অদ্বিতীয় হেদায়েতের সূর্য, যে সূর্যের প্রভাবে প্রকৃতি সহ নিষ্প্রাণ মানবতা ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ। তিনি শুধু ঐতিহাসের মহান ব্যক্তিত্ব নন; বরং আল্লাহর গুণাবলীর পূর্ণ প্রতিফলন। তিনি আল্লাহর হেদায়েত, জ্ঞান এবং রহমতের বহিঃপ্রকাশ। তিনি আল্লাহ রব্বুলআলামিনের খামচি দিয়ে আলাদা করা খণ্ডিত নূর, যে নূর সৃষ্টিজগত সৃজন হওয়ার পূর্বে আধ্যাত্মিক শক্তিরূপে বিরাজমান ছিল। তিনি মানবীয়রূপে আল্লাহর নূরের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তিনি নূর, তিনি আধ্যাত্মিক শক্তি, তিনি বেলায়তের শক্তি, তিনি জ্ঞান, তিনি সৃষ্টির মূল। তিনি রহমত, তিনি নেয়ামত। তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন।
আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নেয়ামত দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিজগতকে অনুগ্রহ করেছেন। আলো, বায়ু, বৃক্ষ তরুলতা, পাহাড়, পানি, খাদ্য, জীবন, বিবেক, জ্ঞান সবই তাঁর নেয়ামত। এসব নেয়ামতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হলো নূর নবীজির আগমন। কারণ, আল্লাহ তাঁকে আমাদের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে চেনার পথ, ঈমানের পথ, নৈতিকতার পথ এবং পরকালীন মুক্তির পথ লাভ করেছে। এই নেয়ামতের বদৌলতে মানুষ রবকে চিনতে শিখেছে। তিনি অন্ধকার জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন। এবং শেষ বিচারের দিন তাঁর সুপারিশ ব্যতীত গুনাহগার উম্মতদের মুক্তি অনিশ্চিত। তিনি না আসিলে জগৎ অন্ধকারে ডুবিত। আত্মশুদ্ধি, আত্মার উন্নতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ দেখিয়েছেন। মানুষের বাহ্যিক শরীরের পাশাপাশি একটি রূহানি সত্তা আছে। মানুষ যখন নিজের রূহের পরিচয় ভুলে যায়, তখন সে কেবল বস্তুজগতের আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রসুল(দ.)-এঁর আগমন সেই রূহানি স্মরণকে জাগিয়ে তোলে। তিনি শিখিয়েছেন হিংসার পরিবর্তে ভালোবাসা, অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা, লোভের পরিবর্তে দান, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়, অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান, প্রাণীর প্রতি মমতা, প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণ।
তিনি প্রকৃতির উপাসনা শেখায়নি; প্রকৃতিকে উপাস্য বানায়নি বরং প্রকৃতির মধ্যে স্রষ্টার নিদর্শন চিনতে, শেখাতে শিখিয়েছে। কেননা পবিত্র কোরআনে আছে, “প্রতিটি সৃষ্টিতে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শন”।
প্রকৃতির ওপর আধিপত্য নয়; বরং দায়িত্বশীল সহাবস্থানের শিক্ষা দিয়েছেন। রহমত হিসেবে আগমন করে শিখিয়েছেন –কীভাবে আল্লাহকে ভালোবাসতে হয়, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে হয়। কীভাবে দুঃখকষ্টে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে ক্ষমা করতে হয়, মানবের প্রতি সহনশীল হতে হয়, মানুষের সেবা করতে হয়, হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে রাখতে হয়। তিনি মানব অন্তরে ঈমানের আলো জ্বালিয়েছেন। অসহায়কে আশ্রয় দিয়েছেন।
তিনি শুধু মানবজাতির প্রতি সদয় আচরণ করেছেন তা নয়; এমনকী বৃক্ষ, তরুলতা প্রাণীদের প্রতিও রহমত, দয়া করেছেন। তিনি এমন এক নেয়ামতের সূর্য, যার প্রভাব মানবাত্মা থেকে সমাজ, সমাজ থেকে প্রকৃতি এবং প্রকৃতি থেকে সমগ্র সৃষ্টিজগত পর্যন্ত বিস্তৃত। আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত সকল কিছুই নেয়ামত। অন্য নেয়ামতসমূহ মানুষকে পার্থিব জীবনযাপনের উপকরণ দেয়; কিন্তু রসূলে পাক নামক নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সর্বশেষ্ঠ নেয়ামত– যেটি মানুষকে জীবনের তাৎপর্য, মাহাত্ম্য ও চূড়ান্ত গন্তব্যের সন্ধান দেয়। এই গন্তব্য হলো মানব চরিত্রে আল্লাহর গুণের প্রতিফলন। তিনি মানুষকে শুধু আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ভোগ করতে শেখাননি; বরং নেয়ামতের মালিককে চিনতে, তাঁর প্রতি শুকরিয়া আদায় করতে এবং সৃষ্টির প্রতি রহমত করতে শিখিয়েছেন। একজন মানুষ যদি সম্পদ পায় –একটি নেয়ামত পায়। জ্ঞান পায়–একটি নেয়ামত পায়, জীবন পায়–একটি নেয়ামত পায়। কিন্তু যে নেয়ামত স্রষ্টার পরিচয়, আত্মার পরিচয় এবং সঠিক জীবনপথের পরিচয় দেয়, সত্যের সন্ধান দেয় সেই নেয়ামত আল্লাহ থেকে পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আর এই মহানেয়ামত হল তাজদারে মদিনা হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.)। তিনি হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নূর (আলো)।
সমগ্র সৃষ্টির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া নেয়ামত, রহমতের আগমনী দিনকে স্মরণপূর্বক প্রেমিকগণ যার যার তরিকার রীতি অনুসরণ করে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আল্লাহর শোকরিয়া আদায়সহ আনন্দে আত্মহারা হয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) পালন করেন। এটি শুধু ঈদ নয়; বরং সকল ঈদের সেরা ঈদ হিসেবে প্রেমিকগণ উদযাপন করে। ঐদিন আকাশ, বাতাস ফেরেস্তাসহ কুলকায়েনাত আনন্দে আত্মহারা হয়ে দরূদশরিফ পাঠ করে রসূলে পাক (দ.)কে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। ঐ দিন ছাড়াও বছরের যেকোনো দিনেও ঈদে মিলাদুন্নবী(দ.) পালন করা যায়। এটি প্রেমিকদের হৃদয়ের খোরাক। প্রত্যেকটি নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হয়। রসুলের আগমন এমন এক সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত, যে নেয়ামতের শুকরিয়া সারাজীবন আদায় করলেও শেষ হবে না। নবীপ্রেমিকগণ নূর নবীজির আগমন দিবসে (১২ রবিউল আউয়াল) শুকরিয়া আদায় স্বরূপ নূরপাকে বিশেষ দরুদ সালাম, তাজিম পেশ করে। এটি নবী প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। নবীপ্রেম খোদাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ স্রষ্টাপ্রেমের পূর্বশর্ত নবীপ্রেম। নবীপ্রেম হল সুফিবাদের প্রাণ। নবীপ্রেম ইবাদতের প্রাণ। যে এবাদতে নবীপ্রেম নেই, নবীজির দরুদ নেই, তাজিম নেই ; সেই ইবাদতে প্রাণ নেই।
অতএব –প্রকৃত উম্মত (নবীপ্রেমিক) যদি নবীর রহমতকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তবে তাঁর আচরণেও রহমত প্রকাশ পায়। নবীপ্রেম মানুষের আচরণে প্রকাশিত না হলে ইবাদতের পূর্ণতা আসে না। যার হৃদয়ে নবীপ্রেম আছে, সে খোদার রহমত প্রাপ্ত হয়। নবীপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে– মুখে নয়; অন্তরে, চরিত্রে, ইবাদতে, ক্ষমায়, বিনয়ে, মানবসেবায়, প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণে। অর্থাৎ রাসূলে পাক(দ.) যেভাবে মানবজাতিসহ প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণ করেছেন, রহমত করেছেন; সেইভাবে মানবচরিত্রে রহমতের প্রতিফলন ঘটানোই হলো প্রকৃত নবীপ্রেম।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক। সাজ্জাদানশীন,মতিভাণ্ডার দরবার শরিফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।











