নিতাই সেন কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত। তাঁর কবিতার সাথে আমার পরিচয় সেই নব্বই দশকের শুরু থেকে। কবিতার পাশাপাশি তিনি চমৎকার সব ছড়াও লিখেন। শব্দগাঁথুনীতে কাব্যিক ভাবব্যঞ্জনা তৈরিতে সিদ্ধহস্ত এই কবি গদ্যতেও যে পারঙ্গম এর প্রমাণ মিললো তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার‘ নামের গদ্যগ্রন্থে। নিতাই সেনের এই গ্রন্থটি আত্মস্মৃতিরই খণ্ড খণ্ড কিছু উপাখ্যান বটে। এটি পড়তে পড়তে মনে আসে পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু সম্পর্কে সিলেটের প্রখ্যাত জমিদার ও রাজনীতিবিদ শ্রীব্রজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর কথা। নেহেরু সম্পর্কে ব্রজেন্দ্রনারায়ণ লিখেছিলেন-‘…আহারের সময় ভিন্ন তাঁহার (জওহরলাল) অবসরই ছিল না। কথা জমাইবার চেষ্টা করিয়া দেখিলাম, জওহরলাল অসম্ভব চাপা স্বভাবের… সকালসন্ধ্যা এক মিনিটও বিশ্রাম না করিয়া রাত্রি দুইটার সময় গৃহে ফিরিয়া অটোগ্রাফ লিখা শেষ করিয়া শয়ন। পরদিন প্রাতে ছয়টায় উঠিয়া আবার কাজ। এইরূপ কয়েকমাস তিনি সফর করিয়াছেন। মনের বল ও সময়ানুবর্তীতা এবং স্বল্পাহারই এর মূল রহস্য।…’ ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের সময় এবং এর আগে আরেকবার জওহরলাল নেহেরু অতিথি হয়ে সিলেট আসেন এবং শ্রী ব্রজেন্দ্রনারায়ণের আতিথ্য গ্রহণ করেন।
ফিরে আসি নিতাই সেনের আলোচনায়। নিতাই সেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। কর্মসূত্রে দীর্ঘসময় তিনি মাঠপর্যায়ে সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরি করেছেন। যেখানেই চাকরি করেছেন সেখানকার আলো–হাওয়া ও পরিবেশ–পরিস্থিতির সাথে মিশে পড়েন। জড়িত হয়ে পড়েন সেখানকার শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির সাথে। মজে যান ঐসব এলাকার ভূ–প্রকৃতির সাথেও। কবি–লেখক হিসাবে অনুসন্ধিৎসু মনে নিতাই সেন ঐসব স্থানের বিভিন্ন তথ্য হয়তো সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। সেসব তথ্যের সাথে স্মৃতির মিশেলে নিতাই সেন রচনা করেছেন অসাধারণ একটি গদ্যগ্রন্থ ‘স্মৃতির সম্ভার‘-যা প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০২৬–এ। এই গ্রন্থে সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, খাগড়াছড়ি, ব্রাম্মণবাড়িয়া এবং সেন্টমার্টিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সহজসরল বর্ণনাশৈলিতে তুলে ধরেন কাব্যিকগদ্যে।
‘স্মৃতির সম্ভার‘ গ্রন্থে রয়েছে সাতটি অধ্যায়। এগুলো হচ্ছে ১. শ্রীভূমি সিলেটে কিছুদিন, ২. প্রাচীন ভুলুয়া নগরীতে কিছু দিন: ফেনীপর্ব, ৩. প্রাচীন ভুলুয়া নগরীতে কিছুদিন: নোয়াখালীপর্ব, ৮. নবগঙ্গা পাড়ের মাগুড়ায়, ৫. স্মৃতিময় খাগড়াছড়ি, ৬. গানের শহর, ফুলের শহর–ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ৭. বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, সেন্টমার্টিনের সম্ভাবনা ও অন্তরায়।
সূচিপত্রের দিকে তাকালে মনে হয় নিতাই সেন ঐ সব এলাকার সবকিছুকে কবি মনের দরদী আকুলতা নিয়ে অনুপঙ্খ বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘স্মৃতির সম্ভার‘ গ্রন্থে।
কবি–লেখক নিতাই সেন কর্মসূত্রে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন সিলেটে। এখানকার আলো–হাওয়া পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে তিনি একাত্ম হয়ে যান। তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় বিশিষ্ট কবি, গবেষক ও সাহিত্য সংগঠক এ কে শেরাম সহ আরো অনেকের আন্তরিক সাহচর্য পেয়েছিলেন। কবি এ কে শেরামের প্রাণজ সাহচর্য তাঁকে এতটাই বিমোহিত করেছে ‘স্মৃতির সম্ভার‘ বইটি কবি এ কে শেরামকে উৎসর্গ করে বন্ধুত্বের সুমহান মর্যাদা দিয়েছেন। উৎসর্গপত্রের লেখাটি এখানে উল্লেখ করতে চাই, ‘সত্তর দশকের বাংলা ও মণিপুরী ভাষার অন্যতম কবি, আমার প্রিয় বন্ধু, আত্মার আত্মীয় কবি এ. কে শেরাম‘কে ভালোবাসাসহ।‘
সিলেটকে বলা হয় বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। এই অঞ্চল ইতিহাসের আলোয় উদ্ভাসিত। হযরত শাহজালাল ও তিনশ ষাট আউলিয়ার স্মৃতিধন্য পুণ্যভুমি সিলেটকে নিতাই সেন চমৎকারভাবে লেখেন:
‘একজন হযরত শাহজালাল (রা.)
লাউর গৌড় আর রাজ্য জৈয়ন্তিয়া
তিন পুণ্যভূমি সিলেটের ঠিকানা,
তেরশত তিন সালে শাহজালাল (রা.) আউলিয়া
সিলেট এসেই তিনি গড়েন আস্তানা।‘
ছড়া–কবিতা লেখায় নিতাই সেন যে দারুণভাবে পারঙ্গম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সিলেটে চাকরি করার সময় এ এলাকা নিয়ে নিতাই সেনের জবানী শুনলে অনুধাবন করা যাবে এতদঅঞ্চল নিয়ে তাঁর ভালোবাসার বিষয়টি। সিলেটকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন ‘শ্রীভূমি শ্রীহট্ট‘ বলে। নিতাই সেনের ‘স্মৃতির সম্ভার‘ গ্রন্থের শুরু হয়েছে ‘শ্রীভূমি সিলেটে কিছুদিন‘ শিরোনাম দিয়ে। এই অধ্যায়ে আলাদা আলাদা শিরোনামে সিলেটে তাঁর চাকরিজীবনের সুদীর্ঘকালের স্মৃতির বয়ান তুলে ধরেছেন সহজ সরল সাবলীল ভাষায়। নিপুণভাবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সংক্ষিপ্তভাবে সিলেট অঞ্চলের বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন আশ্চর্যজনক দক্ষতায়। যেমন, ‘বাংলাদেশের উত্তর–পূর্বকোণে সুরমা–কুশিয়ারা অববাহিকায় সিলেটের অবস্থান। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা বাংলায় রাজনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্য বিস্তার করে। ১৭৬৫ সালে মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে তারা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে–রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। ঐ সালেই সিলেট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনাধীনে আসে। সে–সময় মুহম্মদ আলী খান কুইমজঙ্গ সিলেটের ফৌজদার ছিলেন। ১৭৫২ সালে ১৭ মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর বিচার প্রশাসনের দায়িত্বও ইংরেজদের হাতে চলে আসে। ১৮৭৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট ছিলো ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটকে নবসৃষ্ট আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন করা হয়। তখন সিলেটকে পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে সিলেটকে পুনরায় আসাম প্রদেশে রাখা হয়। ১৯৪৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত সিলেট আসামেরই একটি জেলা হিসেবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর সিলেট ১৩০৩ সালে হযরত শাহ্ জালাল (রা.) (১২৭১–১৩৪৬) কর্তৃক বিজয়ের মাধ্যমে নবরূপে আধ্যাত্মিক পুণ্যভূমি হিসেবে ঐ অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করে। শাহজালাল (রা.) সিলেট আগমন সময়ে সিলেট ছিলো রাজা গৌড় গোবিন্দের রাজধানী।‘
এরকম আঞ্চলিক ইতিহাসের পাঠ নিতে নিতে একজন নিতাই সেনের পঠন–পাঠনের গভীরতা বুঝতে পেরে অবাক হই। তাঁর অসাধারণ বর্ণনা শৈলীর গুণে ছবির মতো ভেসে ওঠে সিলেট, ফেনী, নোয়াখালী, মাগুরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং অনন্য সুন্দর সেন্টমার্টিনের দৃশ্যপটসমেত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসমূহের বিভিন্ন দিক। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ঐ সব এলাকার শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি ও এর সাথে যুক্ত বরেণ্যদের সম্পর্কে আলোকপাত করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন নানা অঞ্চলের ইতিহাস–ঐতিহ্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত। ভাবগম্ভীর পরিবেশে মাজার এলাকা পরিদর্শন এবং সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মাজারের পাদদেশে বসে পরম করুণাময় এবং হযরত শাহজালাল (রা.) নিকট প্রার্থনা জানান, সিলেট অবস্থান সময় যেন তাঁর ভালোভাবে কাটে। এরপরে অন্যদিন খাদিম নগরে অবস্থিত শাহপরাণ (রা.) মাজারও পরিদর্শন ও জিয়ারত করেন। ঐদিন রাতে বসেই লিখে ফেলেন একটি শিশুতোষ ছড়া, যা তাঁর ‘সিলেটের ছড়া‘ গ্রন্থে সংকলিত হয়। ছড়াটি নিম্নরূপ:
হযরত শাহপরাণ (রা.)
‘শাহজালাল শাহপরাণ মামা ভাগ্নে দুই
আইতে সালাম যাইতে সালাম কী বাহারী ভূঁই,
ফকিরেরে সবাই চেনে সবাই জানে একনামে
মামুর জোরে ভাগিনা চলে সব কিছু হয় সব কামে।‘
ফেনী সহ অন্যান্য এলাকার বর্ণনায়ও লেখক অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘স্মৃতির সম্ভার‘ গ্রন্থের ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় এসে চোখ থমকে দাঁড়ায়। লেখক নিতাই সেন অপূর্ব কূশলতায় তুলে ধরেন কিছু কথা। তিনি বলেন,
‘আধুনিক ফেনীর স্থপতি কবি নবীন চন্দ্রসেন ১৮৮৩ সালের ২৩ মে নভেম্বর ফেনীর মহকুমা হাকিম হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রাজারঝির দিঘিকে সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন প্রশাসনিক ভবনসহ ফেনীতে বিভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবহার উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এবং উন্নয়নে তাঁর অবদান অপরিসীম। দুঃখের বিষয় ফেনীবাসী তাঁর অবদানকে আজো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। নতুন প্রজন্ম নবীন চন্দ্র সেন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ফেনী পাবলিক লাইব্রেরীতে আমি বহুচেষ্টা করেও খুঁজে পাইনি তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ বইটি। ইতিহাস ঐত্যিহ্য সচেতন ফেনীর বর্তমান প্রজন্ম এ বিষয়ে গবেষণামূলক বিবিধ মৌলিক কাজের মাধ্যমে ফেনীকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরবেন এটাই আমার একমাত্র প্রত্যাশা।‘ একজন সত্যিকারের লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গিজাত লেখা আমাদেরকে দারুণভাবে পরিতৃপ্ত করে।
শিল্পী সাগর আহমেদের নান্দনিক প্রচ্ছদ সম্বলিত গ্রন্থটি বের হয়েছে নয়নজুলি, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে। ৯৬ পৃষ্ঠার ঝকঝকে ছাপায় গ্রন্থটির মূল্য তিনশ টাকা।
লেখক: প্রাবন্ধিক












