চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আগামী ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জন্য সিটি কর্পোরেশনের ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছেন। এতে নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যা মোট বাজেটের ৪৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয় হবে সড়ক ও অকাঠামোগত উন্নয়ন, মশক নিধন, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ ২৯ খাতে। প্রস্তাবিত এ বাজেটে চসিকের নিজস্ব উৎসে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা আয় ধরা হয়। গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে বাজেট ঘোষণা করেন মেয়র। বাজেট অধিবেশনে গত অর্থবছরের (২০২৫–২০২৬) সংশোধিত ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার বাজেটও ঘোষণা করেন। অর্থবছরটিতে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ ৭ সিটি করপোরেশন টাকা। নিজ মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণার সময় তিনি বলেন, নগরবাসীর আশাুআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশায় ও চট্টগ্রাম মহানগরকে পরিবেশগত ক্লিন–গ্রিন, হেলদি ও সেইফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক পর্যটন নগর প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করছি।
নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকলেও নগরের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে নগরজুড়ে চলছে অপরিচ্ছন্নতার মহড়া। ময়লা আবর্জনা চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেমন জানি নগরের বাতাসে কেবল দুর্গন্ধ উড়ে বেড়াচ্ছে। মনে রাখতে হবে, পরিচ্ছন্ন শহর মানেই বাসযোগ্য শহর। নগরের প্রত্যেকটি জায়গা যদি পরিচ্ছন্ন থাকে, তা শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না– মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশও রক্ষা করে। এজন্য বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা একান্ত জরুরি। চট্টগ্রাম নগরী বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল ও কার্যক্রমের ফলে তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দরকার।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বাজেটে মশক নিধন খাতে ১৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ওষুধ ক্রয়ে ১৫ কোটি টাকা এবং ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কেনায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গত অর্থবছরে (২০২৫– ২০২৬) মশক নিধন খাতে বরাদ্দ ছিল ৭ কোটি টাকা। তবে খরচ হয় ৫ কোটি ৩৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৩ টাকা।
মশক নিধন প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত বলেন, মশক নিধন কাজের মান বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ৭ জন পরিদর্শক (মশক নিয়ন্ত্রণ) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে সকালবেলা মশা নিধনকারী লার্ভিসাইড এবং বিকালে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শহরজুড়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত বিশেষ দল দ্বারা ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে কীটনাশক এবং সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আমেরিকান প্রযুক্তির বিজ্ঞানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড বিটিআই মহানগর এলাকায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।
কিন্তু দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ না কমার পেছনে মশা নিধনে ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেন, আমরা যতই রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিই না কেন, মশা না কমলে দেশে ডেঙ্গু রোগীও কমবে না। সিটি করপোরেশনের ওষুধ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে স্প্রে জোরদার করতে হবে, ভেজাল ওষুধ ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে। মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে জানিয়ে তাঁরা বলেন, আশপাশের দেশ থেকে বাংলাদেশে পরিস্থিতি খারাপ। সবাইকে যার যার জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগামী দিনের জন্য বসবাসযোগ্য বাংলাদেশে সুষম ও টেকসই নগরায়ণের মূল চ্যালেঞ্জ তাই কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা নয়, বরং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে কতটা ভারসাম্যপূর্ণভাবে বণ্টন করা যায়, সেটা নিশ্চিত করা। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নগর এলাকার মানুষের জন্য পরিকল্পিত উপায়ে আবাসনসহ নাগরিক সুবিধা ও পরিষেবাগুলো পৌঁছে দিতে যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশে অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিণামদর্শী নগর উন্নয়ন ও ভৌত পরিবর্তনের ফলে মারাত্মকভাবে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। তাই এখন প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল এবং টেকসই নগর গড়ে তোলা।











