ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সটি বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম তদারকি, সমন্বয় বৃদ্ধি ও জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
সভায় ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে– বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার মাধ্যমে ব্যাপক হারে লিফলেট ও সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিতরণ; স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা; স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা; ফগার মেশিন ও মশক নিধন কার্যক্রমের মান (কোয়ালিটি) নিয়মিত পরীক্ষা ও তদারকি করা; এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা; নির্মাণাধীন ভবন, ছাদবাগান, টায়ারের দোকান, গ্যারেজ এবং জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন বৃদ্ধি; ডেঙ্গুর লার্ভা শনাক্ত হওয়া স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক মনিটরিং ও তদারকি কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা; ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। সভায় বক্তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এখন থেকেই সমন্বিত ও জোরালো প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি। জাতীয় কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে কয়েকটি সহজ কাজ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত একযোগে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এই অভিযান টানা দুই বা তিন দিন চলবে। প্রতিবছর দুবার এ অভিযান পরিচালিত হবে।’ তাঁরা বলেন, ‘এই অভিযানের কাজগুলো হবে– এক. এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার আবাসস্থল এবং ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা। দুই. সারা দেশে একযোগে মশা ও শূককীট নিধনে কার্যকর ওষুধ ছিটানো। বড় শহর, মফস্বল, শহরতলি এবং গ্রামাঞ্চলে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন করতে হবে। তিন. স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা–কর্মচারী, স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী, আনসার–ভিডিপি সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এনজিওর কর্মকর্তা–কর্মীসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে যুক্ত করে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। চার. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা প্রদান শুরু করতে হবে। পাঁচ. ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর নয়, সারা বছর ধরে মশা নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’ তাঁরা আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুর মতো তীব্র সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মশামুক্ত দেশ গড়তে গৃহীত সব কার্যক্রমে সব শ্রেণির মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকারি–বেসরকারি সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে সেটিই হবে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। বাস্তবমুখী ও প্রয়োগযোগ্য পরিকল্পনা এবং কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। তবে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে কখনও সংঘবদ্ধভাবে, কখনও পেশাগতভাবে এবং কখনও ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। সবাই দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গুবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের বিজয় অনিবার্য।’
তাঁরা বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে গেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর বড় চাপ তৈরি হয়। গ্রাম ও শহরগুলো থেকে রোগীরা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসতে বাধ্য হন। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পরিবারগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। ফলে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নির্দেশ দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, সেটা যেন বাস্তবায়ন হয়; সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। তবে এডিস মশা নির্মূল ও ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আগেভাগে প্রস্তুতি, সমন্বিত ও উদ্যোগ।








