(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
একটির পর একটি স্টেশন ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলো আমার ট্রেন। স্ক্রিনে চোখ রেখে চুপচাপ বসেছিলাম। অনেক যাত্রী ট্রেনে, কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে, গল্প করছে এমন স্বাভাবিক দৃশ্য চোখে পড়লো না। যে যার মতো হাতের মোবাইলে চোখ দিয়ে কিছু পড়ছে, কেউ স্ক্রল করছে। তবে সবচেয়ে বেশি যাত্রীকে দেখলাম বই পড়তে। কেউ কেউ খাতায় কি কি সব লিখছে, যেনো হোমওয়ার্ক সেরে ফেলছে।
ইতোমধ্যে বন্ধু স্বপন কয়েকবার ফোন করেছে, স্টেশনের নাম বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, যাতে পার হয়ে না যায় সতর্ক করেছে। আমার ভাবীও ফোন করেছেন, কোথায় আছি জানতে চেয়েছেন। আবাসিক এলাকার বাস বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধুর কন্যা আমাকে গাড়ি দিয়ে স্টেশন থেকে নিয়ে আসবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন।
ভালোয় ভালোয় নির্দিষ্ট স্টেশনে নামলাম। স্টেশনে অপেক্ষা না করে বেশ দ্রুতই বাস স্টপেজে পৌঁছে গেলাম। ভাবীকে ফোন করার পর জানালেন যে, আরো দুইটি বাস আসবে। সুতরাং একটু অপেক্ষা করলেই আমি আবাসিক এলাকার বাস পেয়ে যাবো। মিনিট তিনেকের মধ্যেই একটি বাস এসে দাঁড়ালো, যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর আমি চড়ে বসলাম। আরো দুজন নারী পুরুষ বাসে চড়লেন। মিনিট দুয়েক পরেই বাস ছেড়ে দিল।
বাসায় পৌঁছে দেখি ভাবী বাচ্চাদের নিয়ে নিচে বসে টিভি দেখছেন। বাংলাদেশের চ্যানেলে খবর চলছিল। ভাবী আমাকে বসতে বলে, ফিলিপাইনের কাজের মহিলাকে টেবিলে ভাত লাগাতে বললেন। খেয়ে এসেছি শুনে ভাবী বেশ মন খারাপ করলেন। বললেন, আমরা সবাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আমি স্বপন জোর করে খাইয়ে দিয়েছে বলে কোনরকমে শেষরক্ষা করলাম।
ভাবী আমাকে চা দিতে বলে নিজে বাচ্চাদের নিয়ে খেতে বসলেন। আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টিভিতে খবর দেখতে লাগলাম। কত খবর, দেশের সব খবরই হংকং বসে পেয়ে গেলাম!
খাওয়া দাওয়া শেষে শাহীন ভাবী বললেন, কাল টিপু ভাই এবং ইয়াস আপনাকে হংকং ঘুরাবে। অন্য কোন প্রোগ্রাম রাখিয়েন না। স্বপনের আগাম দাওয়াতের কথা ভাবীকে আর বলা হলো না। আমি টিপু ভাই ও ইয়াসের সাথে হংকং ঘুরে বেড়াবো বলে প্রোগ্রাম ঠিক হলো।
স্বপনকে ফোন করে বাসায় পৌঁছানোর কথা জানিয়ে দিলাম। একইসাথে পরদিন তার সাথে আর দেখা হবে না সেটাও বলে দিলাম। সে অবশ্য, আপত্তি করলো না। বললো, ঠিক আছে, পরশু তোকে নিয়ে ঘুরবো।
রাতে বেশ ভালো ঘুম হলো। সকালে বেশ বেলা করে জাগলাম। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে নাস্তা করে ইয়াসকে নিয়ে বের হলাম। টিপু ভাই আমাদের সাথে কোন এক এমআরটি স্টেশনে মিলিত হবেন। সেটা ইয়াসের সাথে প্রোগ্রাম করা আছে।
ইয়াস আমাকে নিয়ে বের হলো। আবাসিক এলাকার বাসে চড়ে আমরা এমআরটি স্টেশনে পৌঁছালাম, ওখান থেকে পরবর্তী গন্তব্যে যাবো।
ইয়াসের জন্ম বেড়ে ওঠা সবই হংকংয়ে। লেখাপড়া করেছে হংকং এবং অস্ট্রেলিয়ায়। ভালো বাংলা জানে না, ইংরেজি আর ক্যান্টনিজ ভাষায় অভ্যস্ত। আমার সাথে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় নিজের পিতার গল্প শুনতে চায়। আমি বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে তার বাপের গল্প বলি, সে শুনে, কখনো কখনো তার চোখ ছলছল করে।
নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন আসলো। আমাদের দুজনের কাছেই অক্টোপাস পাস আছে, তাই টিকেট করার ঝক্কি নেই। ট্রেনে চড়ে বসলাম। ইয়াস এবং আমি পাশাপাশি দুইটি সিটে বসেছি। ট্রেন চলছে। সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো একটি একটি করে পার হয়ে যাচ্ছিলো, ছুটছে আমাদের ট্রেন।
একটি স্টেশনে আমরা নামলাম। বেশ বড় স্টেশন, প্রচুর যাত্রী। টিপু ভাই সেখানে অবস্থান করছিলেন। আমাদের সাথে দেখা হওয়ার পর তিনি ইয়াসের সাথে প্রোগ্রাম করে আবারো ট্রেনে চড়লাম। বললো, গাড়ি বা উবার নিয়ে ঘোরার চেয়ে ট্রেনে বেড়ানো অনেক সুবিধা। আমার কোন কিছুতেই আপত্তি নেই জানানোর পর টিপু ভাই বললেন, আমরা ভিক্টোরিয়া পিক দেখতে যাবো। আমি বললাম, গতবারও গিয়েছিলাম। আসলে হংকংয়ের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ভিক্টোরিয়া পিক। স্থানীয়দের কাছে শুধু ‘দ্য পিক’।
দ্য পিকের কাছের একটি স্টেশনে আমরা ট্রেন থেকে নামলাম। অল্পক্ষন হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম দ্য পিকে। প্রচুর মানুষ, চারদিকে আকাশছোঁয়া সব ভবনের ভিড়ে একটি পাহাড় কী সুন্দরভাবেই না দাঁড়িয়ে আছে।
পাহাড়ের ওপরে ওঠার জন্য গাড়ি বা বাসে যাওয়া যায়। কিন্তু দ্য পিকের সঙ্গে পিক ট্রামের সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য। দ্য পিকে উঠার জন্য ট্রামই রোমাঞ্চকর। পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়িয়ে গড়িয়ে ট্রামটি যখন উপরের দিকে উঠে তখন সত্যিই অন্যরকমের অনুভূতি হয়, ভিতরটা আনন্দে নাচে।
টিপু ভাই তিনটি টিকেট করলেন। বেশ দাম, তবে আমাকে জানালেন না। আমি গুগল করে জানলাম, একজনের ভাড়া ১১৬ হংকং ডলার, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮শ’ টাকা।
ট্রাম ধীরে ধীরে পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। প্রথমে জানালার বাইরে ভবনগুলো খুব কাছেই ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর সেগুলো নিচে নামতে শুরু করল। রাস্তা, গাড়ি, মানুষ–সবকিছু ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। আমরা ট্রামে চড়ে দ্য পিকের চূড়ায় ওঠে গেলাম।
জীবনে কত শহর, কত বিমানবন্দর, কত রেলস্টেশন, কত পাহাড় আর সমুদ্র পেরিয়েছি। কত জায়গায় পা ফেলেছি। বহু মনভোলানো দৃশ্য জীবনে দেখেছি, বহু ঐতিহাসিক স্থানে গিয়েছি। কখনো কখনো মনে হয়েছে, এই দৃশ্য বুঝি জীবনেও ভুলবো না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক দৃশ্যই স্মৃতির ভেতরে ঝাপসা হয়ে গেছে। কত মানুষের সঙ্গ পেয়েছি, কত জাতের কত পাতে বসেছি। অনেককিছুই ভুলে গেছি। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি যে, দ্য পিক থেকে হংকং দেখার যে রূপ তা আমি কোনদিনই ভুলবো না।
ওপরে পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, তা হলো– ছোট্ট হংকংকে এত বড় করে আগে দেখিনি। নিচে বিস্তীর্ণ নগরী। সারি সারি সুউচ্চ ভবন। তাদের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলা অসংখ্য রাস্তা। দূরে ভিক্টোরিয়া হারবারের নীল জলরেখা। তার ওপারে কাউলুন, হংকংয়ের অপর অংশ। আর সবকিছুর পেছনে পাহাড়, যেনো আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
পৃথিবীর বহু শহরের উঁচু জায়গা থেকে শহর দেখেছি। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখেছি, উঁচু ভবনের জানালা দিয়ে নগরীর আলো দেখেছি। কিন্তু প্রতিটি শহরকে ওপর থেকে দেখার অনুভূতি এক নয়। দ্য পিকে দাঁড়িয়ে হংকংকে দেখার আনন্দটা আমার হৃদয় যেনো পূর্ণ করে দিলো।
স্কাই টেরেসে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখছিলাম। পাহাড়, নদী, উঁচু উঁচু ভবন সবকিছুই মিলে এক অনন্য হংকং।
টিপু ভাই বললেন, চলেন, কিছু খাই। আমরা দ্য পিকের শীর্ষ রেস্টুরেন্টে লাইন ধরে খাবার নিলাম। সাথে কফি। আমরা টেরেসের খোলা একটি জায়গায় বসলাম। টেবিল চেয়ার পাতা আছে, অনেক মানুষ বসে আছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও। কেউ কেউ আবার পছন্দের জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে ভিক্টোরিয়া হারবার নিচ্ছিলো। একদল সরে গেলে দখল নিচ্ছিলো অন্যদল।
আমরা বার্গার এবং কফি নিয়েছি, বার্গারের সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইও দেয়া হয়েছে। আয়েশ করে খাওয়া দাওয়া করলাম। কফির কাপ হাতে নিয়ে সামনে তাকিয়ে রইলাম। নিচে হংকংয়ের ব্যস্ততা, সামনে পাহাড় আর সমুদ্র, মাথার ওপর বিশাল আকাশ। কী যে সুন্দর প্রকৃতি! কী যে সুন্দর আকাশ! ভিক্টোরিয়া হারবার যেনো পৃথিবীর সব সৌন্দর্য নিয়ে হাতছানী দিচ্ছিলো। অসংখ্য অসংখ্য ছবি তুললাম। যেভাবে তুলিই না কেন, মনে হচ্ছিলো আরো কয়েকটি তুললে ভালো হতো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্যের আলো নরোম হয়ে এলো। উজ্জ্বল হংকং যেনো আরো মায়াবী, নীলাভ আকাশ যেনো আরো মোহনীয়, ভিক্টোরিয়া হারবারের নীল জল যেনো আরো মোলায়েম হয়ে উঠছিলো। আকাশছোঁয়া কাচের ভবনগুলোতে বিকেলের আলো পড় ঝিকমিক করছিলো। দূরের পাহাড়ে ছায়া নামছে। আমি যে কতক্ষন বিভোর হয়ে ছিলাম বুঝতে পারছিলাম না। ইয়াস এবং টিপু ভাই ফিরবো নাকি আরো বসবো জানতে চাওয়ার পর আমার যেনো হুশ ফিরে এলো। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।













