দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ২৪ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার দিনটি শেষ হয়ে গেলো। আকাশের নীল রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেছে। বিকেল কিংবা সন্ধ্যার যে জমকালো সোনালি আলো গাছের মাথায়, লেকের জলে এবং শহরের পরিচ্ছন্ন সড়কে মায়াবী আবহ তৈরি করেছিল তাও যেনো উবে গেছে। এখন শহর অনেক বেশি আলোকোজ্জ্বল। চারদিকে প্রচুর আলো জ্বলছে। এতো কৃত্রিম আলোর মাঝে প্রকৃতির যে রূপ তা অনেকটা মিইয়ে গেছে। রাজধানী শহর হওয়া সত্ত্বেও ক্যানবেরার মধ্যে নেই কোনো অস্থিরতা। নেই বড় শহরের কোলাহল। আগেই বলেছি যে, পুরো শহরটিই সুচিন্তিত এক মহাপরিকল্পনায় গড়ে তোলা যেনো এক বিশাল উদ্যান।

সিডনির পথে ছুটছে আমাদের গাড়ি। স্টিয়ারিং সিটে ছোটভাই রুবেল। আমি ফ্রন্ট সিটে, বিজয় শেখর দা পেছনের সিটে। সড়কের স্পিড লিমিট কত কে জানে, তবে রুবেলের নতুন জিপ গাড়িটির স্পিডমিটারে ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিবেগ। আমাদেরকে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। রাতের বেলা গাড়ি চালানোর বাড়তি সতর্কতা রয়েছে। যদিও ওয়ান ওয়ে সড়ক, রাস্তায় কোন পথচারীও নেই। নেই রিক্সা ঠেলা অটো রিক্সার মতো কোন বাহনও। তবুও বণ্যপ্রাণীর জন্য বাড়তি সতর্ক থাকতে হয় বলে জানালো রুবেল।

আমাদের গাড়ি ছুটছে, রাস্তায় আরো গাড়ি আছে। কোনটি আমাদের আগে চলে যাচ্ছে, কোনটি পেছনে পড়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল দেশের রাজধানী শহর থেকে অপর বিখ্যাত শহরে যাওয়ার রাস্তাটিতে কী পরিমাণ মসৃন, সুন্দর, পরিকল্পিত তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

নানা গল্প করতে করতে রুবেল গাড়ি চালাচ্ছিল। আমি বাইরে চোখ রেখে ক্যানবেরার সৌন্দর্য যেনো শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিলাম। আহা, আর কী কোনদিন আসা হবে!

গাড়ি যখন ফেডারেল হাইওয়েতে উঠল তখন রুবেল মনে হয় গতি আরো একটু বাড়ালো। শহরের ঝলমলে ভাব এখন আর নেই। রাতের আকাশে নানা রঙের খেলা শুরু হয়েছে। শহরের সীমা শেষ হতেই অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত গ্রামীণ ভূদৃশ্য চোখে পড়ছিল।

রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। কোথাও গবাদিপশুর খামার, কোথাও ভেড়ার দল নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে। খামারের আলোতে ভেড়াগুলোকে বড়ই নিশ্চিন্তে ঘাষ খেতে দেখা যাচ্ছিলো। দূরে ছোট বড় পাহাড়ের রেখা। মাঝে মাঝে ইউক্যালিপটাস বনের ছায়া রাস্তার গায়ে এসে পড়ছে। পথের দুই পাশে কোন বাড়িঘর নেই। নেই দোকানপাটও। জনবসতির চিহ্ন নেই বিস্তৃত এলাকায়। রাতের অন্ধকার, তবুও যতটুকু দেখা যাচ্ছিলো পুরোটাই যেনো প্রকৃতি, নিখাদ ও অকৃত্রিম।

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের শুরু থেকে একটি বিষয় লক্ষ্য করছি যে, এখানে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর ব্যাপারটি একটু অন্যরকম। অযথা হর্নের শব্দ নেই। নেই ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা। সবাই নিজ নিজ লেনে নির্ধারিত গতিতে চলছে। রাস্তার মান এত ভালো যে দীর্ঘ যাত্রাও ক্লান্তিকর মনে হয় না। রুবেল গাড়িতে বাংলা গান বাজিয়ে দিয়েছে। রবি ঠাকুরের গান শুনতে শুনতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আচ্ছা রবি ঠাকুর কি অস্ট্রেলিয়া ভ্রমন করেছিলেন, তিনি কি ক্যানবেরার এই অপরূপ রূপ দেখেছিলেন। রবি ঠাকুরের জীবনী যতটুকু মনে পড়ছে তাতে তিনি অস্ট্রেলিয়া ভ্রমন করেছেন এমন তথ্য দেখিনি। অবশ্য, তিনি বহুদেশে ঘুরেছেন, বহুদেশের বহু মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করেছেন। দেশ বিদেশ নিয়ে জীবদ্দশায় তিনি যতটুকু লিখে গেছেন তা একজীবনে দেখে দেখেও কপি করা সম্ভব কিনা আমার সংশয় রয়েছে। একজন মানুষের পক্ষে কবিতা, গল্প, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, চিত্রাঙ্গনসহ এতো কিছু করা যে কিভাবে সম্ভব হলো কে জানে! রবি ঠাকুর যদি অস্ট্রেলিয়ায় ঘুরে যেতেন তাহলে আমরা ভিন্নমাত্রার আরো কিছু সৃষ্টি পেতাম! গাড়িতে রবীন্দ্রনাথ, বাইরে প্রকৃতি! কী দুর্দান্ত এক প্রশান্ত পরিবেশ, কী এক অপূর্ব অনুভূতি!

বেশকিছু পথ পাড়ি দেয়ার পর রুবেল একটি বিশ্রামকেন্দ্রে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। অস্ট্রেলিয়ার মহাসড়কের পার্শ্বস্থ বিশ্রামকেন্দ্রগুলো অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুবিন্যস্ত। ছোট্ট পার্কের মতো পরিবেশ। গাড়ি থেকে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে পায়ের জড়তা কাটালাম। বেশ রোমান্টিক ওয়েদার, মনটি চনমন করছিলো। বিশ্রামকেন্দ্রের সামনে আরো বেশ কয়েকটি গাড়ি, কিন্তু চারদিকে এতো সুনশান নীরবতা যে নিজের জুতার শব্দও শুনছিলাম।

রুবেল আমাদেরকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় বসলো। কি খাবো জানতে চাইলো। আমি স্রেফ এক মগ কফি নেবো বললাম, বিজয় দা’ও। রুবেল তিন মগ লার্জ সাইজের কফির অর্ডার করলো। টেকওয়ে হবে বলেও জানালো। আমরা তিন মগ কফি নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম।

সেখানে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আধুনিক সভ্যতার সমস্ত ব্যস্ততার মাঝেও প্রকৃতি কী সুন্দরভাবে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। এখানে মানুষের উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রকৃতিকে দখল করার প্রবণতা নেই। বরং মানুষ যেন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করছে। পাহাড় আছে, তবে পাহাড় কাটা নেই। শত শত গাছ আছে, লোপাট নেই।

কফির মগে চুমুক দিতে দিতে পায়চারি করলাম কিছুক্ষণ। আরো কয়েকজন পর্যটককেও দেখলাম। কেউ ক্যারাভান নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়েছেন, কেউ পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন। সবার মুখেই এক ধরনের প্রশান্তি।

আমরা আবারো যাত্রা শুরু করলাম। মহাসড়কের দু’পাশে ঘন অন্ধকার। মাঝে মাঝে দূরের কোনো খামারবাড়ির আলো জ্বলজ্বল করছে। মনে হয় যেন রাতের আকাশে ছোট ছোট তারা নেমে এসেছে মাটিতে।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ অঞ্চলে রাতের ড্রাইভিংয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। কারণ সন্ধ্যার পর অনেক সময় ক্যাঙ্গারু রাস্তার কাছে চলে আসে। বিভিন্ন জায়গায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড রয়েছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাস্তার দু’পাশে গভীর ছায়া তৈরি হয়। তাই মনোযোগ আরও বাড়াতে হয়।

হঠাৎ থালার মতো চাঁদ চোখে পড়লো। বিশাল চাঁদ। সুকান্ত ঝলসানো রুটি বলেছিলেন, আমার মনে হচ্ছিলো সোনার পাথরবাটি। মেঘহীন রাত। তারার সমারোহও চোখে পড়ার মতো। শহরের ঝলমলে আলো না থাকায় অন্ধকার আকাশ অনেক বেশি পরিস্কার মনে হচ্ছিলো। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে চাঁদ তারার এই সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করছিলো।

যতই সিডনির দিকে এগোচ্ছি, ততই রাস্তার যানবাহন বাড়ছে। দূরে দূরে ট্রাকের আলো দেখা যাচ্ছে। বিশাল আকারের মালবাহী ট্রাকগুলো নির্দিষ্ট গতিতে চলেছে। অস্ট্রেলিয়ার ট্রাকগুলো বেশ লম্বা। আমেরিকা ইউরোপসহ বহু দেশেই এমন বড় বড় ট্রাক দেখেছি। এসব ট্রাক কয়েকদিনের জন্য পথে নামে। ট্রাকেই চালকের ঘুমানো থেকে শুরু করে সবকিছুর আয়োজন থাকে। কোন কোন ট্রাকে কেবল একজন চালক, কোনটিতে দুজন। ট্রাকগুলো রাস্তার রাজার মতো গতি নিয়ে নিজেদের লেইনে চলছে। সবকিছু মিলে অস্ট্রেলিয়ার পরিবহন সেক্টরে ভিন্নমাত্রার শৃঙ্খলা স্পষ্ট।

রুবেল যাত্রাপথে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করছিলো। ক্যানবেরার ইতিহাস, অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো, নাগরিকদের জীবনযাত্রা, সরকারের দায়দায়িত্ব, অভিবাসীদের জীবন, শিক্ষা ব্যবস্থা, জীবনাচার সবই আলোচনায় উঠে আসছিল।

রুবেলের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের গল্প আসলে শুধু বড় বড় স্থাপনা দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় সুশাসন, পরিকল্পনা, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার এই সড়কপথ যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

প্রায় দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে সিডনির প্রান্তবর্তী অঞ্চলের আলোর রেখা দূরে দেখা যেতে শুরু করল। প্রথমে মনে হলো দিগন্তে কোনো আলোকমালা জ্বলছে। তারপর ধীরে ধীরে তা বড় হতে লাগল। রুবেল বললো, আমরা কাছাকাছি চলে এসেছি। আধাঘন্টার মধ্যে সিডনিতে পৌঁছে যাবো। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপেলে : ফুটবলের ইতিহাসে কিংবদন্তি
পরবর্তী নিবন্ধযদি লক্ষ্য থাকে অটুট : সাফল্যের খোলা কৌশল