ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব কমানো এবং আধুনিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন করে ‘ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন’ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের মধ্যে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৯০ কিমি কর্ড লাইন প্রকল্পের বর্তমানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশার কাজ চলছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে এবং যাত্রীবাহী ট্রেন যাত্রার সময় নেমে আসবে সাড়ে তিন ঘণ্টায়।
নতুন অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই মেগা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন’ রেলপথ প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে কর্ডলাইন কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের পরিচালক মো. আবিদুর রহমান বলেন, ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন রেলপথ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। মাঝখানে কিছু সময় কাজ বন্ধ থাকায় একটু বিলম্ব হয়েছে। বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হবে। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের মধ্যে ঢাকা–কুমিল্লা ৯০ কিমি কর্ড লাইন প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পে রয়েছে। রেল ভবনের সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানান, কর্ডলাইন প্রকল্পে ৯০ কিলোমিটার রুটের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ হবে উড়াল। উড়াল অংশ ঢাকা থেকে শুরু হয়ে দাউদকান্দির গোমতি পর্যন্ত যাবে। পুরো রুটে কোনো লেভেল ক্রসিং থাকবে না। এই প্রকৌশলী আরও বলেন, পুরো রেলপথটি ব্রডগেজ করা হবে, এতে এ রুটে মিটার ও ব্রজগেজ উভয় ট্রেন চালানো যাবে। প্রকল্পটি নির্মাণে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড়াও দেশি–বিদেশি অনেক সংস্থাই পিপিপি মডেলে অর্থায়নে আগ্রহী।
জানা যায়, বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা–চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার। রেলপথ ঘুরে যাওয়ায় এর দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটার। প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে সাড়ে ৫ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টা। লোকাল বা মেইলে তা ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে। অথচ কর্ড লাইন হলে দূরত্ব ও সময়–দুটোই অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে পণ্য পরিবহনে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রেন যেতে ১৭–১৮ ঘণ্টা লাগে। কর্ড লাইন হলে মাত্র ৫–৬ ঘণ্টায় পণ্যবাহী ট্রেন যাতায়াত করতে পারবে।
কর্ডলাইন কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের পরিচালক মো. আবিদুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্ড লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রেলপথে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার দূরত্ব ৮০–৯০ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে যাত্রীদের যাতায়াতের সময় কমে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টায় নেমে আসবে।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবিদুর রহমান বলেন, বর্তমানে ঢাকা থেকে প্রতিটি ট্রেন টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া হয়ে কুমিল্লা হয়ে ৩২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম আসতে হয়। নতুন কর্ড লাইনটি ঢাকা থেকে ফতুল্লা–শ্যামপুর ও নরায়ণগঞ্জ পার হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর দিয়ে সরাসরি চলে যাবে কুমিল্লা পর্যন্ত। (বর্তমান রুট–ঢাকা থেকে টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া হয়ে কুমিল্লা)। তখন ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব হবে ২৩০ কিলোমিটার।
রলওয়ের কর্মকর্তা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে টঙ্গী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩৪টি ক্রসিংয়ে যে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়, তা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কারণ এসব ক্রসিংয়ে ট্রেন ঘণ্টায় ৪০–৪৫ কিলোমিটার গতিতে চলে; সাধারণত গতি থাকার কথা ৮০ কিলোমিটার। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্ডলাইন নির্মাণে এই রুটে সাতটি স্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের লক্ষ্য আগামী বছরের জুনের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম পথে কর্ডলাইন নির্মাণের এ উদ্যোগ অনেক আগের। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল ২০১০ সালে। সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের আওতায় ২০১২ সালে এই লাইন নির্মাণের একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে অজ্ঞাত কোনো কারনে সে উদ্যোগ আর এগোয়নি।
২০২০ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখানোর পর ২৩৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ‘রেলওয়ে কানিক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রিপারেটরি ফ্যাসিলিট’ নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা–লাকসাম রুটে কর্ডলাইন নির্মাণের জন্য সমীক্ষার কাজ শুরু করা হয়। জাপান, ফ্রান্স ও মালয়েশিয়ার তিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়ামকে এ কাজে নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ সেই কাজ থেমে যায়। এরপর গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে এই বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই কর্ডলাইন সমীক্ষার কাজ ফের শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়।












