জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। লিটারে বেড়েছে ২০ টাকা। এই বাড়ানোর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতসহ সব খাতে। ডিজেল–অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কৃষির উৎপাদন ব্যয়। কারখানা থেকে পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে। কিছু ক্ষেত্রে কারখানার পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। যদিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সিলেটের লাক্কাতুরা চা–বাগান ফ্যাক্টরি মাঠে চা–শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সে জন্য কঠোর মনিটরিং করা হবে।’
তবে দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন খাতে। ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিবহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য, কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য বাজারজাত করার খরচও বাড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সরকার নিরুপায়। তবে এটাও ঠিক যে এর সবচেয়ে বড় ভোগান্তির শিকার হবেন সাধারণ মানুষ। শুধু খাদ্য নয়, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, সরকার পে স্কেল ঘোষণা করেছে, সেখানে সরকারকে বাড়তি ৩৭ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। সব ক্ষেত্রেই সরকারকে বাড়তি খরচের দিকে যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার একটি কাজই করতে পারে; পরিবহনে ভাড়া বাড়ার ক্ষেত্রে যাতে ন্যায্য পরিমাণে বাড়ে, তা নিশ্চিত করা। সব সময় দেখা যায়, তেলের দাম বাড়ার পর অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। সেটি বন্ধ করা জরুরি। এদিকে কৃষিতেও যে দাম ধরা হবে, সেটিই যেন রাখা হয়, তা মনিটরিং করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক কাঠামোতে যেতে হবে। একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্যকাঠামোতে যাওয়া গেলে সাধারণ মানুষ কিছুটা সুবিধা পাবে। সে যদি জানতে পারে আগামী সপ্তাহে দাম কেমন থাকতে পারে, তাহলে সে অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রস্তুতি নিতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, শেষ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য সমন্বয় শুধু হিসাবের বিষয় নয়, বিষয়টি বণ্টনেরও প্রশ্ন। সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই চাপ কমানোর খরচ কার ওপর পড়ছে, তা–ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, করকাঠামোর পর্যালোচনা ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটলে সরকারের হিসাব হয়তো কিছুটা সহজ হবে। কিন্তু নানাভাবে এর মূল্য দিতে হতে পারে, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বৈষম্য আরও বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি; সর্বোপরি দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। ইতোমধ্যে প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, বেড়েছে আটা ও ময়দার দাম। অন্যান্য নিত্যপণ্য এখনো আগের দামে বিক্রি হলেও, পরিবহন খরচের উপর নির্ভর করে ধাপে ধাপে পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে করছে সাধারণ মানুষ।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ বলেন, এখনই এসব করা সমুচিত হয়নি। মনে হচ্ছে, সরকার নিজেই নিজের জনপ্রিয়তা কত দ্রুত কমানো যায়, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ইমপ্যাক্ট বিবেচনা করা হচ্ছে না একেবারেই। অন্য দেশের সঙ্গে যে তুলনা করা হয়, সেটিও ঠিক নয়। কারণ অন্য দেশের তুলনায় আমাদের আয় অনেক কম। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সব ধরনের জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর প্রভাব কতটা পড়ছে, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়বে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবারগুলোর সঞ্চয় ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমতে পারে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে বেশি চাপের মুখে পড়তে হবে।







