নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগে প্রতিনিয়ত বাস্তুচ্যুত হচ্ছে দেশের হাজার হাজার মানুষ। জীবিকার সন্ধানে তারা পাড়ি জমাচ্ছে বড় শহরগুলোতে। তবে শহরে এসেও মিলছে না ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। ফলে জলবায়ু বাস্তচ্যুতদের জীবন হয়ে উঠছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম।
১৯ বছর বয়সী কালামের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর। নদীভাঙনের করাল গ্রাসে তার পরিবারের ভিটেমাটি, সহায়–সম্বল ও আবাদি জমি সবই বিলীন হয়ে যায়। ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ছয় বছর আগে বাবার সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে আসে সে। প্রথমে চায়ের দোকানে কাজ, পরে প্যাডেল রিকশা চালানো এবং বর্তমানে ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে কালাম। তার বাবা মাজিদ আলীও রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। কিন্তু এত সংগ্রামের পরও কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার সহায়তা এখনো তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু উদ্বাস্তু সংখ্যা বাড়ছে, আর অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাস্তুচ্যুত মানুষদের জীবনে নেমে আসে বহুমাত্রিক সংকট। বসতভিটা হারানোর মানসিক অভিঘাতের পাশাপাশি তারা ভোগে আবাসন, বিশুদ্ধ পানি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায়।
শহরে এসে অধিকাংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু বসবাস করে নিম্ন আয়ের কলোনি এলাকায়, যেখানে ২০–৩০টি পরিবারকে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয় রান্নাঘর, শৌচাগার ও গোসলখানা। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। অনেক এলাকায় অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও ময়লার স্তূপ থেকে সৃষ্টি হয় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশুদ্ধ পানির অভাব, অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানির ব্যবহার, সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে মানবেতর। শহরে বসবাস করলেও তারা নাগরিক সুবিধা থেকে প্রায় বঞ্চিতই থেকে যায়।
দীর্ঘদিন বসবাস করলেও অনেক জলবায়ু উদ্বাস্তু জাতীয় পরিচয়পত্র বা নাগরিকত্ব সনদের মতো প্রয়োজনীয় লিগ্যাল ডকুমেন্টের অভাবে বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এর অন্যতম কারণ হলো, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের কোনো সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ না থাকা। ফলে একই দেশের নাগরিক হয়েও তারা অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন।
একসময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মিটিগেশন ও অ্যাডাপটেশনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। জলবায়ুজনিত স্থায়ী ক্ষতির শিকার মানুষের পুনর্বাসনে একটি শক্তিশালী ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি সেবার জন্য একটি কার্যকর তহবিল গঠন এখন সময়ের দাবি।
জীবিকার সংকটই বাস্তুচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ। জীবিকা হারিয়েই কালামের মতো লাখো মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য সমন্বিত, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন এখন অত্যন্ত জরুরি।
কারণ, জলবায়ু উদ্বাস্তুরা সমাজের বাইরে নয়, তারা এই সমাজ ও দেশেরই অংশ। তাদের অধিকার নিশ্চিত করে এবং বহুমাত্রিক কৌশলের মাধ্যমে জলবায়ু নীতির বিদ্যমান ঘাটতি চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।
লেখক: প্রাবন্ধিক












