দরজার ফাঁক দিয়ে বেরুচ্ছে ধোঁয়ার রেখা! হচ্ছে কী ভেতরে? তাও এই রোজার দিনের সকালে, খোদ রিয়াদের বুকে? সামি আজমি কি রোজা রাখে না নাকি? রোজা শুরু হবার পর থেকেই তো দেখছি আমার পাশের রুমের পাশের রুম, মানে মেডিক্যাল ডিরেক্টর সামির রুমের দরজা হয় থাকে বন্ধ, নয়তো ভেজানো! সবসময়!
সামি বা অন্য কেউ রোজা থাকলো কি থাকলো না, তা নিয়ে মাথা ব্যথা অবশ্যই নাই আমার। রিয়াদ শহরে না গোটা সৌদিতেই তো সেই দায় মোতাওয়াদের। নানান কারণেই তো নানানজন রোজা নাও রাখতে পারে। মোতাওয়ারা কোন কারণেরই নাকি ধার ধারে না, শুনেছি। এমতাবস্থায় যদি ঢুকেই পড়ে ওরা অফিসে, শুধু যে সামিরই খবর হবে তাতে, তা তো নয়! রোজার শুরুতেই, পত্রিকায় দেখেছিলাম আরব আমিরাতের মুফতিরা একটা ফতোয়া দিয়েছে। সে মোতাবেক, এই গরমে আরব আমিরাতের রাস্তাঘাটে যারা দৈহিক কাজ করেন, তারা যদি রোজা না রাখতে পারেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য হবে না। কিন্তু সৌদি মোতাওয়ারা, এ নিয়ে স্পিকটি নট। সৌদি শরিয়াহ কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কোন ফতোয়া না দিলেও, এখানকার শ্রম মন্ত্রণালয়ের বড়ই দয়ার শরীর। তীব্র গরমে খোলা রাস্তায় বা প্রান্তরে কাজ করেন যারা, তাদের নিয়োগকর্তাদের জন্য একটা আইন নাকি করে রেখেছেন তারা। তা হল, তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের উপরে চড়লে, কোন নিয়োগকর্তাই কাউকে খোলা আকাশের নীচে কাজ করাতে পারবে না। এ জন্য জায়গায় জায়গায় তাপমাত্রা নির্দেশক ঢাউস ডিজিটাল ইলেকট্রনিক বোর্ড লাগানো আছে।
মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ও বন্ধু গিউসির মতে, ওসব ডিজিটাল থার্মোমিটার নাকি একটা বড় ভাওতাবাজি। গ্রীষ্মের কোন কোন দিনের তীব্র গরমে সকালের দিকেই মরুদানোর ঘুম ভেঙ্গে গেলে তুমুল ক্রোধে নাকেমুখে আগুনে হল্কার নিঃশ্বাস ছাড়তে শুরু করে প্রথমে। তারপর গোটা মরুভূমির বালি সুবিশাল কড়াইতে তুলে ভাজতে শুরু করে বত্রিশ তেত্রিশ তো নয় এক্কেবারে বায়ান্ন তেপ্পান্ন ভাজা। কিন্তু তাতেও ঐ বোডের্র লাল অংকটিকে কখনোই নাকি কেউ, ৫০ পেরুতে দেখেনি! আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ করে যে, নাম জানি তার শুভংকর। এখানে যে তার কী নাম?
এসময়ের পরিবর্তিত সময় অনুযায়ী দশটায় অফিসে আসার কথা থাকলেও, আসি আমি ৯ টার মধ্যেই। এমনিতে এ অধমই প্রায়শই অফিসে ঢোকা প্রথম ব্যাক্তি হলেও, আজ দেখছি এসেছে আগে, সামি। নিজ রুমে ঢুকতে ঢুকতে ভেজানো দরজা গলে আসা ঐ ধোঁয়ার রেখা, বলেছে তা।
“হাই, সেলিম! হাও ইউ ডুয়িং? কেন ইউ প্লিজ পপ ইন টু মাই অফিস?”
চেয়ারে বসতে বসতে না বসতেই জানান দিল বসের ফোন, ফিরেছে সে রিয়াদে! এরমধ্যে মেইলে, মেসেজে, ফোনে যোগাযোগ হলেও, হয় নাই দেখা দুজনের সপ্তাহখানেকের মতো। যেদিন গিয়েছিলাম আমি মক্কায়, সেদিনই হেডকোয়ার্টার বাসেলে যাওয়ার ফ্লাইটে চেপেছিল, বস। কথা ছিল আমারও যাওয়ার। তবে আছি যেহেতু বিজনেস ভিজিট ভিসায়, সেহেতু এখানকার সুইস এম্ব্যাসিতে আবেদন করতে পারিনি। আবার ঢাকায় গিয়ে সুইস ভিসা নিয়ে যাওয়ার সময়ও ছিল না হাতে।
দরজা ঠেলে মাথা ঢোকাতেই দেখি, বরাবরের ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার ফিলের রুমটি একদমই ধোঁয়ামুক্ত, ফকফকা! সাথে সাথেই বিশালদেহি ফিলের গমগমে গলা টেবিলের ওপাশ থেকে উঠল বলে
“গেট ইন বাডি । উড ইউ মাইন্ড ইফ আই স্মোক?” নট, এট অল। বলতে বলতে নিলাম টেনে চেয়ার। “নাহ, থাক। খাবো না। কোন সময় যে আবার মোতাওয়া দেয় হানা, বলা তো যায় না!” বুঝলাম, সিগারেটে নেশা ছাপিয়ে, দিয়েছে উঁকি বসের মনে, নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ! তুমুল সিগারেটবাজ ফিল, এই অফিসের চেইন স্মোকারদের মধ্যে অবিসংবাদিত চ্যাম্পিয়ন। রানার্স আপ কি প্রোডাক্ট ম্যানেজার আফিফি? নাকি মেডিকেল ডিরেক্টর সামি? সে মিমাংসা করতে পারিনি আজো। তারপরও অফিসের সবার মাথার উপরের ছাতা ফিল, ঠিকই নিজরুমে বসে সিগারেট টানা বন্ধ রেখেছে এসময়। যখনই সিগারেট তেষ্টা দেয় মাথাচাড়া, ভূগর্ভস্থ পার্কিংলটে গিয়ে নিজ গাড়িতে বসে টেনে আসে।
বাহ, বেশ চনমনেই দেখছি বসকে। অবশ্য সেই শুরু থেকেই দেখছি তুমুল চাপে, কিম্বা বাজে রকম ঝামেলায়ও থাকে ফিল ফুরফুরে। ভাবটা এমন যে জীবনে আর আছে কি? বেহুদা চাপ নিয়া লাভ নাই। যা আমি কন্ট্রোল করতে পারি, তা তো করবোই। নাগালের বা ক্ষমতার বাইরে যা, তা নিয়া বেহুদা মাথা ঘামাবো না। ইস, বসের এই ভাবটা যদি পারতাম করতে, ধারণ! এরই মধ্যে গড় গড় করে দেয়া সংক্ষিপ্ত ডি ব্রিফ শুনে বুঝলাম, ভালই হয়েছে ফাইনাল বাজেটমিটিং, হেড কোয়ার্টারে। কিছু চ্যালেঞ্জ যে আসবেই তা নিয়ে তো আছিই প্রস্তুত বরাবরের মত। আকারে ইঙ্গিতে বুঝলাম যা, তা হল বোঝার উপর শাঁকের আটি হিসেবে নতুন কিছু যোগ হতে পারে। এ নিয়ে এখনই মুখ খুলছনে না। শুধু আভাস দিলেন আর কি। “ওকে দেন, হাও ওয়াজ ইউর মক্কা ট্রিপ?” কৌতূহলী হলেন বস এবার আমার মক্কা ভিজিট বিষয়ে
হুম, ওমরা করেছি। তবে, ওমরাহটা হয়েছে কি না? তা জানি না।
“হা হা হা ভালই বলেছ। ওটা তো অবশ্যই অলমাইটির ব্যাপার। বাকী কথা বল?”
আসলে অফিসের টাকায় অফিসের কাজে গিয়ে ওমরাহ করলে তা ঠিক হবে কি না, সেটাই বলছিলাম আর কী।
“আই নো ইয়ু আর আইডিয়ালিস্টিক! হোয়াট এবাউট দ্য সাইন্টেফিক মিটিং?”
সেটাই তো বলছি। সবাই তো ওমরাহই করতে গেছে। অতএব মিটিং আর হয় কেমনে, বল? আমি যাওয়াতে বেচারা হাশিশ, অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছে ডাক্তারদের, ধরে বেঁধে এনে মিটিং রুমে ঢোকাতে। কিন্তু অর্ধেক ডাক্তারতো ভোরে ওমরাহ করেই দিয়েছে ছুট এয়ারপোর্টে। ১০ টায়, সাড়ে দশটায় ছিল তাঁদের রিয়াদ দাম্মামে ফেরার ফ্লাইট। বাকী যারা ছিল, তাদের মধ্যেও মাত্র ৪ জনকে এনে ঢোকাতে পেরেছিল হাশিশ মিটিংরুমে। এদিকে এতো কম উপস্থিতিতে স্পীকার রাজী নন, বলতে !
“তার মানে অনেকদিন ধরে সামি যে সন্দেহের কথা বলছিল, সেটাই ঠিক? সাইন্টেফিক মিটিঙয়ের নামে ওখানে ওমরাহই করতে যায় সবাই, তাহলে !”
সেটাই তো দেখলাম নিজ চোখে। আচ্ছা সামি বহুদিন ধরে তোমার কাছে সন্দেহ প্রকাশ করলো, কিন্তু নিজে গিয়ে দেখে এসে প্রমান দিল না কেন? এটা তো শুধু সেলস মার্কেটিঙের ব্যাপার না। এই নন কমপ্লায়েন্সে তো, তারও দায় আছে। আমাকেও তো সে মুখ ফুটে কিছু বলেনি!
“সামি যাবে কিভাবে? মক্কায় তো কাফের ঢোকা নিষেধ। সামি তো ইজিপ্টশিয়ান কপ্টিক খ্রিস্টান।‘
থমকালাম শুনে! কিন্তু তারপরও সামির দুমুখো স্বভাবের জন্য যে রাগ বিরক্তি চেপে রেখেছিলাম বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছে সেটি এখন। তারপরও ওটা সামলে শুধু নিজের পয়েন্টটাকে দাঁড় করানোর জন্য দিলাম যুক্তি; তাহলে সে তার মেডিক্যাল ম্যানেজার ওসামা মাকরামকে তো পাঠাতে পারতো ?
“সেও তো কপ্টিক খ্রিস্টান? বুজতে পারছি তুমি কী বলতে চাচ্ছ। সেটা ঠিকও মানি। তবে এখন করনীয় কী মনে কর তুমি?”
আরবি নাম মানেই ইসলামিক নাম, বংগদেশিয় এই বদ্ধমূল ধারনার বশবর্তী হয়ে, এভাবে উপর্যুপরি ধাক্কা খেয়ে বড়ই বিব্রত হলাম। দ্রুত সামলে নিয়ে বললাম, ঠিক আছে সমস্যা নাই। দেখছি ওটা আমি। কমপ্লায়েন্সের ঘোরটোপে এরকম ননকমপ্লায়েন্ট কিছু অবশ্যই হতে দেব না। ক’দিন আগেই যখন এই বিষয়ক পলিসি লিখলাম, বিষয়টি তখন জানা থাকলেই হতো। পলিসির ফাঁক বন্ধ করতে পারতাম, তখনি। এখন ওটা রিভিউ করবো শিগগিরই। লাঠি না ভেঙ্গে, মারবো সাপ অবশ্যই। নো চিন্তা।
“দ্যাটস দ্য স্পিরিট। ইটস এ বিজাআ (নরুুধৎব) কান্ট্রি আই টোল্ড ইউ, রিমেমম্বার? কার্পেটের নীচে এখানে অনেক ময়লা। তা আমি কী একটু পার্কিংলটে যেতে পারি এখন?”
তা তো অবশ্যই। বস কে বাঁধা দেই, এমন বেকুব তো এখনো হই নাই। বলতে বলতে করলাম গাত্রোত্থান।
এরপর নিজ চেয়ারে বসে চোখ মুদে ভাবছি এক মনে, আর কোন কোন কোনা তুলতে হবে কার্পেটের? বস তো বলেছেনই আছে ময়লা আরো। জিজ্ঞেস করবো নাকি তাকে? তাতেই তো সুবিধা হবে। আর না হয় এখন যেমন একই পলিসি নিয়ে আবারো কাজ করতে হবে, এরকম আরো কতো যে কেঁচেগণ্ডূষ করতে হয়, কে জানে?
করিডোর থেকে বাতাসে ভর করে রুমে ঢোকা আউদ মানে আতরের ভুর ভুর গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দিয়ে জানালো আসছেন, ফাহাদ আল হিন্দি। সৌদির নানান শহরের যে বিষয়টি চোখে পড়েছে তা হল আউদ মানে আতর আর মধুর দোকানের আধিক্য। এ দুই বস্তুরই তুমুল ভক্ত এরা। মজার বিষয় হচ্ছে, এরই মধ্যে দেখছি আতরের সুগন্ধেই আলাদা করে বুঝতে পারি, এ কি ফাহাদ? নাকি রাইদ? নাকি দোস্ত খলিল! “সালামাইকুম মিঃ সেলিম । লং টাইম নো টক, নো সি।” ওয়ালাইকুম আস সালাম । মারহাবা, ইয়াআল্লাহ, বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে, বাড়ালাম হাত আগুয়ান ফাহাদের দিকে– “ইউ নো, দিজ দেতস ফ্রম আওয়ার ফার্ম। আই ওয়ানতেদ পারসোনালি টু গিভ ইউ। আই গেইভ এভ্রিওয়ান ওয়ান বক্স, বাত ফর ইউ তু!”
শোকরান, শোকরান বলতে বলতে মাথা নড করতে করতে ফাহাদের এগিয়ে দেয়া খেজুরের বাক্স দুটো জোর হাতে ধরে, হাসতে হাসতে বললাম সাদা মিথ্যা; আই নো! হাও মাচ ইউ লাইক মি ! সাথে বললাম ইশারায়, বসতে হোক আজ্ঞা
“আরে তুমি তো অবশ্যই স্পেশাল? এছাড়া সব বাঙ্গালিকেই আমি পছন্দ করি। খুব বুদ্ধিমান আর ধার্মিক তারা। খাটতেও পারে বেজায়। দেখো না এই গরমে, এই রোজাতেও রাস্তায় রাস্তায় ঠিকই কাজ করছে বাংলাদেশিরা!”
ইচ্ছা করেই খোঁচাটা দিল? নাকি নিজের অজান্তেই, যার মনে যা ফাল দিয়ে উঠে তা, বাঙ্গালীর এই প্রবাদের সার্থক করলো, ফাহাদ? আচ্ছা আমাদের মাঝে তো টেলিপ্যাথি থাকার কথা না। এ কি তবে ঘটনা নিছক কাকতালীয়? এই তো ভাবছিলাম একই বিষয়। মানুষের মন বড়ই বিচিত্র আসলেই। থাক ও নিয়ে আর মাথা না ঘামাই। প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলি,
এ কি মরিয়ম নাকি আজোয়া খেজুর? যাইহোক একদম বাগান থেকে তুলে আনা খেজুরতো আমরা খাই নাই কোনদিন! তোমার উসিলায় সে সুযোগ হল এবার। আবারো অনেক অনেক ধন্যবাদ!
লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক












