সমগ্র বিশ্বে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে মনে করা হলেও বর্তমান সময়ে ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় ও মৌলবাদী রাজনীতির প্রভাব ক্রমশ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভারতের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় ধর্ম নিরপেক্ষ বা ংবপঁষধৎ শব্দটি ছিল না, ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়। যেখানে অসাম্প্রদায়িক লেখা না থাকলেও ধর্ম নিরপেক্ষ বা ংবপঁষধৎ শব্দের মাধ্যমে ভারতের অসাম্প্রদায়িকতার চরিত্রই নির্দেশ করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মৌলবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতি এখন একে অপরের পরিপূরক, বিশেষ করে এই উপমহাদেশে ধর্ম, জাতি ও ভাষার ভিত্তিতে তৈরী রাষ্ট্রসমূহকে মৌলবাদের মাধ্যমে বিভাজনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। মূলত ভারতের ভোটের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় ইস্যুকে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সারা বিশ্বে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে আসছে এবং দুঃখজনক হলেও সত্য বিভিন্ন দেশে তারা তাতে সাফল্য লাভ করেছে। মৌলবাদের রাজনৈতিক ব্যবহার বর্তমানে এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের এবং জনগণের সার্বিক উন্নয়ন এখন আর রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের বিষয় নয়। তাদের কাছে এখন মন্দির মসজিদ ইত্যাদি তৈরি করার মাধ্যমে ভোটে জয়লাভ করা অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই নিরিখে রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভাজনের ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তা প্রস্ফুটিত হয়েছে এবং আক্ষরিক অর্থেই হিন্দুত্ববাদের চমক দেখিয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটি পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভায় দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে এবং রাজ্য সরকার গঠন করতে চলেছে। এবারে নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভ শুধু চমক নয়, পশ্চিমবঙ্গের অবিসংবাদিত নেত্রী রাজ্যের টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় আগামী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নির্বাচবনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে যেখানে বিধানসভার মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে গত নির্বাচনে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৭৭, এবারে সেটি দাঁড়িয়েছে ২০৬টিতে। আর গত নির্বাচনে মমতা যেখানে ২১৪ আসন পেয়েছিল, এবারে তাঁরা পেয়েছেন মাত্র ৮১টি আসন। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন এই নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে মোট ৯১ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ২৭ লাখের বেশি ভোটার, যাদের বিষয়টি বিচারাধীন এবং ১৯টি ট্রাইব্যুনালে তাঁদের আপিল ঝুলে আছে। এই সংখ্যা মোট ভোটারের ১১.৬ শতাংশেরও বেশি, যা ২০২১ সালে তৃণমূলের ১০ শতাংশ ব্যবধানের জয়ের চেয়েও বড়। বর্তমান সময়ে অরুনাচল, আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, দিল্লী, গোয়া, গুজরাট, হরিয়ানা, মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, উড়িশা, রাজস্থান, ত্রিপুরা, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের ১৬টি রাজ্যে একক বা জোটগতভাবে ক্ষমতাসীন রয়েছে বিজেপি আগামীতে তার হয়তো আরো বাড়তে পারে। ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির সৃষ্টি হয়েছে হিন্দুত্ববাদকে পুঁজি করে, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা সৃষ্টির মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা ভোটের রাজনীতিতে জয়ী হয়েছে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনে সেটি আরো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জীকে পরাজিত করে জয়ী বিজেপি নেতা শুভেন্দু বাবু প্রকাশ্যে বলেছে, মুসলিমরা আমাকে ভোট দেয়নি তারা ভোট দিয়েছে হিজাবওয়ালী মমতাকে আমাকে ভোট দিয়েছে হিন্দুরা। নির্বাচনী বা দলীয় আদর্শ হিসেবে তিনি তা বলতেই পারেন সেটি কোন অপরাধ নয়, তবে তার বক্তব্যে এটাই প্রমাণিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক ভারতের পরিবর্তে এখন ভারতের রাজনীতিতে মৌলবাদ বা হিন্দুত্ববাদ প্রাধান্য পাচ্ছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পিছনে শুধু হিন্দুত্ববাদ নয় সাম্প্রতিক সময়ে মমতার আঞ্চলিক রাজনীতিতে অতিরিক্ত গোঁয়ার্তুমি অনেকাংশে দায়ী।
মৌলবাদ ও রাজনীতি একে অন্যকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করছে যে মৌলবাদীরা যেখানে যতটা সংখ্যাগুরু সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার ও আগ্রাসনের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত করার চেষ্টা করছে শুধু মাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। ফলে সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ যে কতখানি ভয়াবহ হতে পারে তার নিদর্শন এই বর্তমান সময়ে এই বিশ্বে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং তার প্রভাব সেই দেশের নির্বাচনগুলোতে দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে অনেক প্রচারমাধ্যম ও মিডিয়া দ্বারা ধর্মীয় মৌলবাদের প্রসার ঘটানোতে চেষ্টা করা হচ্ছে। ভোট যুদ্ধে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলির প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্নভাবে মৌলবাদী রাজনীতি ও ধর্মকে ব্যবহার করে, জনগণের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভোট সংগ্রহের চেষ্টা আজ আর পর্দার আড়ালে নেই যা এই উপমহাদেশে জনসমক্ষে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এখন প্রশ্ন– যেখানে বর্তমানে রাষ্ট্র ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করবে কে? রাজনৈতিক দলগুলো যখন ধর্মীয় মৌলবাদ নামক আদর্শ সৃষ্টির মূল কারিগর সেখানে সম্প্রীতির কথা বলে একে দমন করা সম্ভব নয়। উপমহাদেশে পাকিস্তান ও নেপাল সাংবিধানিকভাবে ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র। অন্যদিকে বাংলাদেশ এবং ভারত ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের জাহির করলেও বাস্তবতায় ভারত এবং বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আছে আর বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে ধর্ম ভিত্তিক দলের বিস্তার লাভ করেছে। তবে পৃথিবীতে অসাম্প্রদায়িকতার শব্দটি হয়তো শুধু মাত্র নামে আছে, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো সবাই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বললেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনে তারা ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করছে। নির্বাচনে ভারতীয় জনগণ কাকে ভোট দিবে কাকে নির্বাচিত করবে, তা তাদের জনগণের নিজস্ব ব্যাপার। গতবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনে বুথ ফেরত রিপোর্টে যে বিষয়টি হওয়ার কথা ছিলো সেটি হয়নি, তখনও আশা ছিলো ভারতের অন্যত্র মৌলবাদকে সমর্থন করলেও পশ্চিমবঙ্গের জনগণ মৌলবাদকে সমর্থন করে না। কিন্তু এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচনে বিজেপির জয়ে মনে হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক ভারতের কফিনে সাম্প্রদায়িকতার শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে বিজেপি।
লেখক: কলামিস্ট, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।













