জুম’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ৮ মে, ২০২৬ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!

আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন নবী রাসূলগনের জীবনাদর্শ আলোচনা করা ইবাদত। নবী রাসূলগনের জীবন কর্ম স্মরন করা ও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরন করা মুক্তির মাধ্যম। তাঁরা আল্লাহর নির্বাচিত নিষ্পাপ মনোনীত প্রিয় বান্দা।তাঁরা পৃথিবীতে আদর্শ মানুষ গড়ার ও দিশেহারা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের প্রতি অসম্মান, অশ্রদ্ধা ও অবমাননা অশান্তি অকল্যান ও ধ্বংসের কারণ। তাঁদের স্মরন ও অনুসরন সুখ শান্তি উন্নতি সমৃদ্ধি রহমত বরকত ও অফুরন্ত খোদায়ী নিয়ামত লাভের মাধ্যম। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের জীবন ইতিহাস চর্চা করা, নৈতিক চরিত্র গঠন ও সমাজ সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে নবী রাসূলগণের আদর্শ ও শিক্ষা গ্রহণ করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

আলইয়াসাআ ()’র পরিচিতি: তাঁর নাম আল ইয়াসা, তিনি ইফরাইম বিন ইউসুফ বিন ইয়াকুব এর বংশধর ছিলেন। তিনি হযরত ইলিয়াস ()’র উত্তরসূরি ছিলেন। তিনি আল্লাহর মনোনীত নবীদের অন্যতম। তিনি হযরত ইলিয়াস ()’র শরীয়ত অনুযায়ী ফিলিস্তিন অঞ্চলে পথভ্রষ্ট বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। কুফরি ও শির্কে নিমজ্জিত পথভ্রষ্ট জাতিকে হিদায়তের লক্ষ্যে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সূরা আন আম ৬:৮৬ এবং সূরা সোয়াদ ৩৮:৪৮ এ আল ইয়াসার নাম দুবার উল্লেখ হয়েছে। তাকে আল্লাহর নির্বাচিত ও অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত প্রিয় বান্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল কুরআনের আলোকে হযরত ইয়াসা আ (): নবী কুরআনুল করীমের তিলাওয়াত উত্তম ইবাদত। নবী রাসূলগণের আলোচনাকে কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে উত্তম ইবাদতের সওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, এবং স্মরন করুন, ইসমাঈল ইয়াসাআ ও যুলকিফলকে তারা সকলেই ছিল শ্রেষ্ঠগনের অন্তর্ভুক্ত (সূরা: সোয়াদ, আয়াত: ৪৮)

প্রখ্যাত তাফসীর কার হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নাঈমী (রহ🙂 উপর্যুক্ত আয়াতের তাফসীরে নুরুল ইরফানে উল্লেখ করেন। তিনি ছিলেন হযরত ইলিয়াস ()’র খলিফা। অত:পর তাঁকে নবী করা হয়েছে (রূহুল বয়ান) নবীর আলোচনা আল্লাহকে স্মরন করার সামিল, নবী রাসূলগনের আলোচনা, যথার্থ শান মনে মহত্ব ও গুরুত্ব সহকারে করা হয় এর থেকে হাজারো উপদেশ অর্জিত হয়। এর থেকে হাজারো উপদেশ অর্জিত হয়। আল্লাহর মাকবুল বান্দাদের আলোচনা হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন শুনে নাও, আল্লাহর স্মরনে অন্তরে প্রশান্তি রয়েছে। আল্লাহতা’আলা আরো এরশাদ করেছেন, আর ইসমাঈল, ইয়াসা, ইয়ুনুস এবং লুতকেও আর আমি প্রত্যেককে তারই যুগের সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি (সূরা: আনআম, আয়াত: ৮৬)

হযরত ইয়াসা () তিনি ইলিয়াস ()’র ভাতিজা ছিলেন, ইলিয়াস ()’র ইন্তিকালের পর তিনি একই পদ্ধতিতে দ্বীনি দাওয়াতের খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের চারিত্রিক অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম অবনতির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাঁদের পথ প্রদর্শক হিসেবে আল্লাহর নবী ইয়াসা () চরম ধৈর্য্যের সাথে তাদের মাঝে দ্বীনি দাওয়াতের গুরু দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের জন্য কল্যানধর্মী ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে তাঁদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয়ভীতি ও তাকওয়া সৃষ্টির প্রয়াস চালান। অবাধ্য জাতি নবীর আহবানে সাড়া দেয়নি। নবীর দ্বীনি দাওয়াতকে প্রত্যাখান করার কারনে মহান আল্লাহ তাদের উপর বিভিন্ন প্রকার আসমানী বালা, মুসীবত অবতীর্ন করতে শুরু করেন (তাফসীর ইবনে কাসীর খন্ড২ পৃ.)। বর্ণিত আয়াতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীদের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষনা দিয়েছেন। উপর্যুক্ত আয়াতে ব্যাখ্যার তাফসীরে নূরুল ইরফানে হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (রহ.) বর্ণনা করেন, নবীগন অতুলনীয় সৃস্টির মধ্যে কেউ নবীর মতো হতে পারে না। নবীদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমান হলো তাঁরা আল্লাহ তা’আলার হুকুমে অনেক অসাধারণ ও অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শনে সক্ষম। তাঁরা নবুওয়তের দাবীর সত্যতার সমর্থনে অস্বীকারকারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন অসম্ভবকে বাস্তবায়িত করেন, এটাকে মু’জিযা বলা হয়। মু’জিযা বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। অস্বীকার করা, যাদু, মিথ্যা, ধোকাইত্যাদি আখ্যা দেয়া সুস্পষ্ট গোমরাহী।

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে খাযেন এ উল্লেখ হয়েছে, নবীগন ফেরেস্তাকুল থেকে শ্রেষ্ঠ। ‘‘আলামীন’’ দ্বারা নবী ব্যতীত অন্যসব কিছুকে বুঝায় (তাফসীরে খাযেন খন্ড২ পৃ. ১৩১)। নবীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রসঙ্গে আল্লামা ফজলে রাসূল বাদায়ুনীর উক্তি প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই একজন নবী আল্লাহর নিকট সমস্ত অলী থেকে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি কোন ওলীকে নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিবে তাঁর কুফরীর ব্যাপারে ভয় করা হবে বরং সে কাফের (আলমুতাকিদুল মুনতাজিদ পৃ১২৫)

আল কুরআনের আলোকে হযরত যুলকিফল () এর দ্বীনি দাওয়াত

হযরত যুলকিফল () আল্লাহর মনোনীত নবীদের অন্যতম, তাফসীরকারদের মতে তিনি হযরত আইয়ুব ()’র পুত্র। আল্লাহ তা’আলা যুলকিফলকে তাঁর পিতা আইয়ুব ()’র রোম ভূখন্ডে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল দাঈ। দ্বীনি দাওয়াতে সবর তথা ধৈর্য ধারণ ছিল তাঁর অনন্য চারিত্রিক ভূষন। তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে সত্যান্বেষী বান্দারা দাওয়াত কবুল করেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়া ৮৫ ও ৮৬ নং আয়াতে সূরা সোয়াদ ৪৮ নং আয়াতে হযরত যুলকিফল আলাইহিস সালাম’র নাম কুরআনে উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আর ইসমাঈল ইদরীস ও যুলকিফলের কথা স্মরন করুন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন সবরকারী। আমরা তাদেরকে আমাদের রহমতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, তাঁরা ছিল সৎকর্মশীলগণের অন্তর্ভূক্ত (সূরা আম্বিয়া আয়াত:৮৫৮৬)

যুলকিফল শব্দের অর্থ লালন পালনের দায়িত্বশীল। সম্ভবত তিনি নিঃস্ব দুস্থ এতিম অসহায় নিগৃহীত মানুষের দায়িত্ব সহ গোটা জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহন করেছিলেন, তাই তাঁকে যুলকিফল উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। ফিলিস্তিন ও ইরাক অঞ্চলে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মহান নবীগণের সাথে যুলকিফলের নাম ও প্রশংসা একত্রে উল্লেখ থাকায় সুস্পস্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, তিনিও নবী ছিলেন। তিনি প্রায় ৭৫ বছর বেঁচে ছিলেন। হযরত যুলকিফল () ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল নবী । আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা’আলা ধৈযশীলদের পছন্দ করেন (সূরা ইল ইমরান আয়াত: ১৪৬)। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে নামায হলো আলো, সাদাকা হলো দলীল, ধৈর্য হলো্‌ জ্যোতি (সহীহ মুসলিম তাহারাত অধ্যায়)- আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নবীরাসূল আলাইহিমুস সালামদের জীবনাদর্শ অনুসরন করার তাওফিক দান করুন, আমীন।

লেখক : খতিব, কদমমোবারক জামে মজসিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুনব্রিজ এলাকা থেকে ৬০ হাজার ইয়াবাসহ কক্সবাজারের যুবক গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধহাম ও উপসর্গ নিয়ে আরো ১২ শিশুর মৃত্যু, শনাক্ত ২৮৬