বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে সমুদ্রপথে। কারখানার পোশাক বিদেশে যায়, শিল্পের কাঁচামাল আসে জাহাজে চেপে, আর এই আসা–যাওয়ার প্রধান দরজা চট্টগ্রাম বন্দর। বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টিইইউ কন্টেইনার এবং ১৩ কোটি টনের মতো পণ্য হ্যান্ডেল করে এই বন্দর। শিল্পায়নের গতির সঙ্গে তাল রাখতে নতুন টার্মিনালের তালিকা এখন বেশ লম্বা। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি প্রয়োজনের আগেই বেশি দূর ছুটছি? উত্তর খুঁজতে হলে আজকের হিসাবের পাশাপাশি ২০৪১ সালের দিগন্তেও তাকাতে হবে।
চারটি উদ্যোগ, একই সময়ে :
চলমান প্রকল্প তিনটি: মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দর, পিপিপির আওতায় এপিএম টার্মিনালসের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল এবং সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে বে–টার্মিনাল। এর পাশে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে কনসেশন চুক্তির পর পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালও কাজ শুরু করেছে। এত আয়োজনের পেছনে যুক্তি আছে। কর্ণফুলীর তীরের বর্তমান জেটিতে ১৯০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ এবং সাড়ে নয় থেকে দশ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। বড় জাহাজ ঢুকতে না পারলে পণ্যকে ঘুরপথে যেতে হয়, খরচও বাড়ে। মাতারবাড়ীতে ১৬ মিটার গভীরতার জাহাজ নোঙর করবে; আট থেকে দশ হাজার টিইইউ বহনকারী কন্টেইনার জাহাজও সেখানে বার্থ করতে পারবে। সামনে রয়েছে দেশজুড়ে অন্তত ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার স্বপ্ন, যেখানে প্রচুর বিদেশি পুঁজি আসার প্রত্যাশা। তবে প্রত্যাশা আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক থাকতে পারে। সামপ্রতিক প্রবণতা বিদেশি বিনিয়োগের যে চিত্র দিচ্ছে, তা বন্দরের এই বিপুল আয়োজনের সঙ্গে খাপ খায় কি না, যাচাই না করে ব্যয়কে নিরাপদ বলা যায় না।
কত ধারণক্ষমতা যোগ হচ্ছে : হিসাব দেখলে ছবি স্পষ্ট হয়। পতেঙ্গা ২০২৯ সালের মধ্যে আরও চার লক্ষ টিইইউজ কন্টেনার হ্যান্ডেল করবে। লালদিয়া ওই বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে বছরে আট লক্ষ টিইইউ কন্টেনার হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা গড়বে। মাতারবাড়ীর প্রথম ধাপে লক্ষ্য চার লক্ষ টিইইউ; সময়সীমা ২০৩৫ সাল হলেও তার আগেই আংশিক কার্যক্রম চালু হতে পারে। বে টার্মিনালও ২০৩০ নাগাদ চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ টিইইউ হ্যান্ডেলের বন্দরের ক্ষমতা অনেকখানি বাড়বে। এই সংখ্যাগুলো আগামী দশকের শুরুতেই বন্দরের চেহারা পাল্টে দিতে পারে। এটি একদিকে স্বস্তির খবর, কারণ বর্তমান জেটির ওপর চাপ কমবে এবং বড় জাহাজ ঢোকার পথ খুলবে। অন্যদিকে প্রতিটি টার্মিনালের পেছনে আছে বিপুল অর্থ, যার ফেরত আসা নির্ভর করে জেটি কতটা ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর। কিন্তু তৈরি থাকা আর কাজে লাগা এক কথা নয়।
ঝুঁকিটা কোথায়?
জেটি বাড়লেই জাহাজের ভিড় বাড়ে না। ভিড় জমে তখনই, যখন কারখানায় উৎপাদন চলে, পণ্য রপ্তানি হয়, কাঁচামালের আমদানি বাড়ে। এখন বিদেশি বিনিয়োগের স্রোত ধীর। অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদন প্রত্যাশামতো না বাড়লে নতুন টার্মিনালের একটি অংশ অলস পড়ে থাকবে, আর বিপুল অর্থ আটকে যাবে। বিষয়টা অনেকটা বিশাল গুদাম ভাড়া নেওয়ার মতো, ভাড়া শুরু হয় আজ, মাল আসে কয়েক বছর পর। স্বল্প মেয়াদে এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই।
তবু বন্দরের হিসাব দিনপঞ্জির মতো চলে না। একটি টার্মিনাল গড়তে বছরের পর বছর লাগে; চাহিদা দরজায় কড়া নাড়ার পর কাজ ধরলে বড্ড দেরি হয়ে যায়। মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্প বড় জাহাজ বার্থিং এর সামর্থ্য গড়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র করে তুলতে পারে। এই বিনিয়োগ আসলে দীর্ঘ পথের বিনিয়োগ।
তাই এক্ষত্রে দুটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায়। একটিতে বিদেশি পুঁজি আসে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে চাকা ঘোরে, নতুন টার্মিনাল ভরে ওঠে কন্টেনার ও কার্গোতে, আর আজকের বিনিয়োগ দূরদর্শিতা হিসেবে প্রশংসা পায়। অন্যটিতে নতুন কারখানা গড়ে না, জেটি অর্ধেক খালি থাকে, আর তখন সেই বোঝা বইতে হয় বিনিয়োগকারী ও রাষ্ট্রকে। বলা হবে অতিবিনিয়োগ হয়েছে। কোন পথে হাঁটব, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বন্দরের বাইরের সিদ্ধান্তের ওপর।
জেটির বাইরের পথ: হিন্টারল্যান্ড কানেক্টিভিটি : তবে বন্দরে বিনিয়োগের সুফল পেথে হলে বন্দরের বাইরেও নজর দিতে হবে। পণ্য কারখানা থেকে জাহাজ পর্যন্ত বাধাহীনভাবে না পৌঁছালে আধুনিক টার্মিনালের সুফল মেলে না। এর চাবিকাঠি সড়ক, রেল ও নদীপথের সমন্বিত যোগাযোগ, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় থ্রি–আর। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বন্দরের সঙ্গে জুড়তে অপরিহার্য একটি ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর। এই করিডোর শিল্পাঞ্চল আর বন্দরকে এক সুতোয় বাঁধবে। এর অভাবে পরিবহনের খরচ ও সময় দুটোই বাড়ে, বিনিয়োগকারীরা মুখ ফেরান। উল্টোদিকে মসৃণ সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকি কমায়, মুনাফার সম্ভাবনা বাড়ায়, ফলে নতুন কারখানার জন্য আস্থার জায়গা তৈরি হয়। এই শর্ত শুধু চট্টগ্রামের নয়, দেশের প্রতিটি বন্দরের জন্যই প্রযোজ্য।
২০৪১–এর দিগন্ত : ২০৪১ সালে কত কন্টেইনার লাগবে, তা নিখুঁত অঙ্কে বলা কঠিন। কয়েকটি নিয়ামক এখানে কাজ করে। প্রথমটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। স্থিতিশীল ধারা বজায় থাকলে আমদানি ও রপ্তানি দুটোই বাড়বে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। দ্বিতীয়টি শিল্পায়ন। ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লক্ষ্য পূরণ হলে কাঁচামাল আনা আর তৈরি পণ্য পাঠানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তৃতীয়টি বিদেশি বিনিয়োগ। নতুন শিল্প বসলে কন্টেইনারের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু এখনকার প্রবণতা এখানে উদ্বেগের কারণ। চতুর্থটি অবকাঠামো, বিশেষ করে ফ্রেইট করিডোর, যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার চেহারা বদলে দিতে পারে। শেষে আছে বিশ্ববাণিজ্যের হাওয়া এবং অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক।
ধরা যাক, আজকের প্রবৃদ্ধির হার সরলরেখার মতো ২০৪১ সাল পর্যন্ত টানা চলল। তাহলে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, সেই চাহিদা মেটাতে নতুন জেটিগুলো পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগবে কি না। তার উত্তর নির্ভর করছে বিদেশি পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক বিস্তারের গতির ওপর। এর কোনোটি দুর্বল হলে চাহিদার বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই ছবিটি আশাব্যঞ্জক, তবে শর্তসাপেক্ষ।
সরকারের করণীয় : নীতিনির্ধারকদের সামনে কয়েকটি কাজ। প্রথমত, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে কার্যকর নীতি তৈরি ও তার বাস্তবায়ন, কারণ কন্টেইনারের উৎস শেষ পর্যন্ত কারখানা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত গড়ে তোলা এবং সেখানে শিল্প বসাতে উৎসাহ দেওয়া; তৃতীয়ত, সড়ক, রেল ও নদীপথের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোরের কাজ শুরু করা, যাতে বন্দরমুখী পণ্যের ঢল সামলানো যায়। চতুর্থত, বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করে নতুন বাজার খোঁজা, যাতে অল্প কয়েকটি গন্তব্যের ওপর নির্ভরতা কমে। পঞ্চমত, কন্টেইনারের সম্ভাব্য চাহিদা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে নীতি বদলে নেওয়া। সবশেষে, সব বন্দরের সঙ্গে পশ্চাৎভূমির সাশ্রয়ী যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবে রূপ দেওয়া।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই উন্নয়ন একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার ফল মিলবে দীর্ঘ সময় পরে। তার আগে পথের কাঁটা সরাতে হবে। নতুন জেটি, গভীর চ্যানেল আর আধুনিক ক্রেন কাজে আসবে তখনই, যখন কারখানার ফটক থেকে জাহাজের ডেক পর্যন্ত পথটা মসৃণ থাকবে। বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার আর শক্ত পশ্চাৎভূমি, এই দুইয়ের মিলনেই বন্দর হয়ে উঠবে দেশের সত্যিকারের সম্পদ। আজকের সতর্ক হিসাবই আগামী দিনের স্বস্তির ভিত। বন্দর বাড়ুক, তবে পথ আর পুঁজির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ুক।
লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত)












