এনসিটি নিয়ে একদিনে দুই চিঠি, ভিন্নরকম নির্দেশনা

নৌ মন্ত্রণালয়ের চিঠি নিয়ে নানা প্রশ্ন

হাসান আকবর | রবিবার , ৭ জুন, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একই দিনে দুটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুটি চিঠিতে ভিন্নধর্মী নির্দেশনা দেওয়ায় বন্দরের অভ্যন্তরে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন অথবা বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে কয়েক ঘণ্টা পর বিকালে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও দর কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুটি চিঠির ভিন্ন বার্তা ঘিরে বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, এনসিটি ইজারা বিষয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী?

তবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দাবি, সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে এবং দর কষাকষির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। চিঠি পাওয়ার পরদিন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য দর কষাকষি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়। এ বিষয়ে অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি সচল কন্টেনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের মোট কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। সর্বশেষ গত মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার কন্টেনার হ্যান্ডলিং করে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারিবেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও সরকারটুসরকার (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের আগে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়নি।

পরবর্তীতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে আলোচনা আরো এগিয়ে চূড়ান্ত দর কষাকষি পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে আপত্তি, শ্রমিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এ সময় ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু এনসিটি নয়, পাশের চিটাগং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে সমন্বিতভাবে পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও এনসিটি পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় প্রতি কন্টেনারে বন্দরকে বেশি রাজস্ব দিতে সক্ষম।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া এখনো শেষ না হওয়ায় নতুন কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই। আলোচনায় সমঝোতা না হলে ভবিষ্যতে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেশিবিদেশি অপারেটরদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এনসিটি পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে দুটি ভিন্ন মতামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশীয় অপারেটরদের একটি অংশ মনে করে, লাভজনক ও সফলভাবে পরিচালিত একটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের যুক্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ফলে এনসিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত। তবে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা দুটি চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলেন, সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে আমরা সেটা কার্যকর করব।

এদিকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে শ্রমিককর্মচারীরা আবারো আন্দোলনে নামবেন বলে জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন আজ শুরু
পরবর্তী নিবন্ধসড়ক ও ফুটপাত থেকে ২শ দোকান উচ্ছেদ