‘Sometimes I feel like a motherless child’ মাঝে মাঝে আমি নিজেকে মা হীন শিশুর মতো মনে করি। মূলত এটি একটি মাতৃহারা শিশুর কান্না। আমেরিকার টেক্সাস রাজ্যের কাউন্টিং এটর্নী উইলিয়াম ই বার্টন ডি ডি ১৮৯৯ সনে গানটি রচনা করেন। যদিও এর পূর্বে ১৮৭০ সালে ফিস্ক জুবলী গায়করা এটি পরিবেশন করেন আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময়কালে যা ব্যাপকভাবে বিভিন্নতা ও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে, বিষদ আকারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র অনেক পরিবর্তিত রূপে পরিবেশন করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এ গানের সুর সংযোজন করেছিলেন ড্যানিয়েল ক্যালম্যান। আফ্রিকান মার্কিন লোকজন এখনো বিশ্বাস করে আমেরিকার আধ্যাত্ম্যবাদীরা এ গানের মাধ্যমে দুঃখবোধটাকে বয়ে বেড়াচ্ছেন যা আমেরিকানদের দ্বারা দাসে পরিণত করা আফ্রিকানদের ব্যথা ও বেদনার অন্তরক্ষরণের গান। এ দাসরা মনে করে তারা ‘Long way from home’ । তারা ভাবে তাদের মাতৃভূমি থেকে তারা বহু দূরে, এক রকম শক্তি প্রয়োগ করে পরিবার ও আপনজনদের কাছ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে ।
এ গানটি সেই দুঃখ প্রকাশ করত যা বহু দাস অনুভব করত ‘বাড়ি থেকে দূরে থাকার কারণে’। আফ্রিকান আমেরিকান আধ্যাত্মিক গানের মতো এটি দাস পরিবারগুলোকে ভেঙে দিয়ে সন্তানদের তাদের বাবা মার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে দূরে বাগানে পাঠিয়ে দেয়া সাধারণ ও হৃদয়বিদারক প্রথাকে নির্দেশ করে। জন্মভূমি আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থাকা এবং পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন করে রাখা।
ভারতীয় ইতিহাসে দেখা যায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ‘motherless child’ পদটি রূপকাশ্রিত, তীব্র ও কাঁটার খোঁচার আঘাতের মত ব্যবহৃত হত। যাতে দুঃখ, কষ্ট, কান্না অনুভূত মনে ব্যাপক আঘাত করত। দুধের একটি গরুর বাচুরকে তার মা’র কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মত। যেমন ‘কামু’ তার মাকে হারিয়ে দাদা–দাদীর কাছে লালিত পালিত হয়ে বড় হয়। ১৯২০ সালের শেষের দিকে ব্লাইন্ড উইলিয়াম জনসন প্রথম গানটি রেকর্ড করেন। এটি একটি প্রচলিত গান যাতে যীশুর উপদেশাবলীর মত পরিপূর্ণ পান্ডিত্যাভিমানী, অভিজাত, মূল্যবান বাণীর সমাহার থাকত, বক্তব্য থাকতো এবং তৎকালীন জীবন্ত কিংবদন্তি বব ডিলানের কণ্ঠে পরিবেশিত হত সর্বত্র।
বব ডিলানের আসল নাম ছিল রবার্ট এলেন ডিমারম্যান। ১৯৪১ সনের ২৪ মে আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, ডিস্ক জকি এবং একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর। যিনি ১৯৬০ এর দশক থেকে পাঁচ দশক অবধি শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় ধারার সব সংগীত পরিবেশন করে আমেরিকার অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তার সুশ্রাব্য এ সকল গানের প্রধান সুরে ছিল হৃদয়ের আবেগ। যা মানুষের হৃদয়কে সহজে আঘাত করত।
সংগীতের ভাব হচ্ছে প্রধান ও বিশাল একটি বার্তা যা গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচনার বিষয়। যেখানে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, স্বাধীনতা এমনকি হাস্যরসও থাকবে। আমরা আগেই বলেছি এটা সে শিশুর কান্নার সুর যে শিশুকে মায়ের কোল থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে বিক্রির মাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করা হয়েছে । এ গান ব্যথা ও হতাশার অভিব্যক্তি যেমন গায়ক তার আবেগ প্রকাশ করছে সেই শিশুর সাথে যাকে তার মাতাপিতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে । অন্যভাবে বলা যায় “sometimes’ offers a measure of hope as it suggests that at least ‘sometimes’ the singer does not feel like a motherless child” যার মা মারা গেছে যে শিশুর ও সে সব পরিবার সে মাতৃহীন সন্তান ধারণ করে আছে। তারা সে সব পরিবারের শিশু যারা পিতৃহীন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও দেশের কাছ থেকে যারা সত্যিই বহু দূরে অবস্থান করছে তাদের জন্য এ গান। আমরা এ গানে যেমন দেখলাম বিষণ্নতা, দুঃখ, বেদনা, আবেগ, মানুষ্য জীবনের নিত্যদিনের অনুভূতির কথা, আবার দেখলাম প্রেম, ভালোবাসা, স্বাধীনতা ও হাস্যরসের কিছু ঘাটতিও নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা, কবির আর্তিও রূপ।অন্যদিকে, ভারতীয় গায়ক, সংগীত পরিচালক, সুরকার, গীতিকার, সংগীত প্রযোজক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, স্ক্রিপ্ট লেখক ও সমাজসেবক ভারতের উত্তর পূর্বাচলের ‘রাজপুত্র’ খ্যাত জুবীন গার্গের অনুভূতি সমৃদ্ধ একটি গান। ‘জুবীন’ মানে– সর্বোত্তম একজন। ফার্সি সংস্কৃতিতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যার অর্থ আকর্ষণীয় বা অজেয় বা অপরাজেয়। তার ডাকনাম ‘গল্ডি’।
১৮ নভেম্বর ১৯৭২ তুরা মেঘালয়, ভারতে জন্ম। ১৯ সেপ্টেম্বর ২৯২৫ সিংগাপুরে মৃত্যু। ৪০,০০০ এর মত ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তার গান রেকর্ড করা আছে। তার পরিবেশনা, গায়কী, বিভিন্ন যন্ত্র বাজানোর দক্ষতা ছিল অসাধারণ।
জুবীন গার্গের মৃত্যু পরবর্তী তার সংগৃহীত ও সাবলীল অসাধারণ সুরে, ঢংয়ে, প্রাণময়, ভাবার্থপূর্ণ ভঙ্গিতে গীত যে অসমীয়া প্রচলিত আধ্যাত্মিক লোকসংগীতটি আমাদের আলোড়িত ও ভাবের অন্য জগতে নিয়ে যায় তা নিম্নরূপ:
মন মোর রসনা
তুমি কি আর জাননা
সংগে তো কাউ (কেউ) যাবেনা
সময় থাকিতে কেনে
গুরু ভজিলুম না।।
এ দেহার মূল্য নাই
পোড়া দিলে হবে ছাই
প্রাণবায়ু ছাড়িয়া যাইবে
নদীর কুলে হইবে বাসর
আন্তিম কালে।
পিতা মাতা সদ্দর (সহোদর) ভাই
হেলায় আছে হেলায় নাই
সবাই তো ছাড়িয়া যাইবে
আমার তো যাইতে হবে
সময় আসিলে।
শিশুকালে রঙের মেলা
যৌবনে প্রেমলীলা
শেষে হইল যাওয়ার পালা
দু‘দিন মাত্র পরবাস
এই ভবের খেলা।।
গার্গ সুরে তালে গেয়ে এ মনকে প্রশ্ন করে চলে, কবিতা যেমন শব্দালংকার, রূপক, উপমা, প্রতীক, রূপকলা, ছন্দ, অনন্ত উদ্দীপনায় সৌন্দর্য মণ্ডিত অসম্ভব নান্দনিকতায় পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তেমনি বিষাদের সুর মিশিয়ে, আবেগে, অনুরাগে, অন্তর ঢেলে গার্গ বলে যায় দরদ মেখে, দুঃখের আতিশয্যে।
এ জীবন মূল্যহীন, এই দেহ নশ্বর। শব পোড়ালে দাহে হবে ছাই, কবরে গেলে পচেগলে দেহ মাটিতে যাবে মিশে। বিনাশশীল, অস্থায়ী, ক্ষয়শীল, অনিত্য এ দেহের কি দাম? একা এসেছি একা যেতে হবে। কেউ সংগে যাবে না। শ্মশানে বা চিতায় অন্তিম কালে, অনন্তজীবন কাটাতে হবে।
কোথায় পিতামাতা, আপন ভাইবোন স্বজন এই আছে, এই নাই। অবজ্ঞা, অবহেলা, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য অশ্রদ্ধায় কতদিন যে গেছে। সবাইকে সেই পরমকর্তার কাছে ফিরে যেতে হবে। যেমন আমাকেও সময় হলে। এ পরবাসে জীবন চক্রে শিশুকাল, যৌবনকাল, বৃদ্ধকাল শেষে আবার ফিরে চলে যাওয়া যেন দু’দিনের খেলাছিল। এ ধরা, মাটি, জল, আকাশ, বাতাস, আলো সবাই নিত্য কেবল আমিই অনিত্য। এ রূপ খেলা রঙ সবাই দুদিনের। গার্গের সুরের মুগ্ধতায়, গায়নে, আবেগে, দরদে, অনুভবে, চিরন্তন এ অধরার খেলা মূর্ত হয়ে উঠেছে। জোড়ার পাখী বিজোড় হলে / কে রাখে আর কার খবর।
অসমীয়া আর একটি আধ্যাত্মিক লোকসংগীতে এইভাবে অনিত্য জীবন, নশ্বর দেহ, শিশুকাল, যৌবন ও বৃদ্ধকাল নিয়ে অনিন্দ্যরূপ ফুটে উঠেছে। গানটি সংগ্রহীত। সুর করেছেন কানাই লাল শীল, গেয়েছে অনেকে,
কোন বা রঙে বাইন্ধাছ ঘরখানি
মিছা দুনিয়ার মাঝে গো সাঁই জী
কোন রঙে।
ও দিন দিনে খসিয়া পড়িবে
রঙিলা দালানের মাটি গো সাঁইজী
কোন রঙে।।
তোর হাড়ের ঘরখানি ছামড়ার ছাউনি
বন্দে বন্দে জোড়া
তাহার ভেতর মনউড়া পাখী
উড়িলে না যায় ধরা গো সাঁইজী
কোন রঙে।।
তোর শিশুকাল গেল হাসিতে খেলিতে
যৌবন কাল যাবে রসে
বৃদ্ধকাল যাইবে ভাবিতে চিন্তিতে
খোদাকে চিনলি কবে গো সাঁইজী
কোন রঙে।।
এই যে স্বজনহীনতা, অনিশ্চিতের পানে, অনন্তের কাছে চলে যাওয়া, একটি মাতৃহীন শিশুর কান্না, এই যে বিষাদ, আপন ঘর থেকে বহু দূরে চলে যাওয়া, ভারতীয় ইতিহাসে রূপকাশ্রিত তীব্র খোঁচা ও কাঁটার আঘাতের যন্ত্রণা, মধুর সুর ও আবেগ, জীবনের মর্ম, হতাশা, ‘Sometimes I feel like a motherless child’ এর মত পশ্চিমা গায়কের মত ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের ‘রাজপুত্র’ খ্যাত গায়ককেও প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছে। যার প্রকাশ গানে, সুরে, তালে, ছন্দে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, লোকসংগীতশিল্পী ও গবেষক।












