শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চিরন্তন সুসম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে হবে

মো. দিদারুল আলম | মঙ্গলবার , ১৪ জুলাই, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ড যিনি সোজা রাখেন তিনি হলেন শিক্ষক। শিক্ষকরা আমাদের মধ্যে বড় হওয়ার উদ্দীপনার বীজ বপন করে দেন। বলা হয়ে থাকে, কোনো একটি জাতি ধ্বংস করতে হলে প্রথমে শিক্ষকদের ধ্বংস করতে হয়। অর্থাৎ শিক্ষকরা হচ্ছেন একটি আধুনিক জাতি গড়ে তোলার একনিষ্ঠ কারিগর। তাই শিক্ষকদের প্রতি আমাদের অটল সম্মান আর শ্রদ্ধাবোধ রাখা উচিত।

মূল কথা হলো, শিক্ষক এমন একজন কারিগর যিনি একটি অবুঝ মনকে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখান। আর এই শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি করা বা শিক্ষককে অবমাননা করা খুবই ভয়ংকর রকমের অপরাধ। ক্লাসে কথা না শোনা, শিক্ষককে না বলে ক্লাস থেকে চলে যাওয়া, দেখা হলে সালাম না দিয়ে চলে যাওয়া, এগুলো এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে সম্মান করে না, সে জীবনে কোনো সুশিক্ষিত মানুষ হতে পারবে না। এটা ঠিক যে, শিক্ষকেরও ভুল হতেই পারে এবং মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। তাই বলে কি একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে অসম্মান বা অপমান করতে পারবে? অবশ্যই না। আসুন আমরা আমাদের শিক্ষকদের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হই।

শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মানের এমন দৃষ্টান্ত অতীতে ছিল অহরহ। কিন্তু এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। অতীতে যারা স্কুলের পড়া শিখেনি বা তাদের মধ্যে কেউ বন্ধুদের প্রহার করেছে, তার শাস্তি হিসেবে শিক্ষকের বেতের মার হজম করেনি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তারপরও শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো নালিশ ছিল না শিক্ষার্থীদের। সন্তানের কথা শুনে অভিভাবকরা শিক্ষকের দিকে তেড়ে আসতেন না, বরং শাসন করতেন নিজ সন্তানকেই। শুনতে হতো না কোনো অপবাদ, দেখা যেত না কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন। মোটকথা, শিক্ষকশিক্ষার্থীর মধ্যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বন্ধন ছিল অটুট। কিন্তু এখন ঘটছে ঠিক তার উল্টো। সবাই যেন ছড়ি ঘোরাতে ব্যস্ত শিক্ষকদের মাথার ওপর। শিক্ষককে পেটাচ্ছে তারই ছাত্র!

এক শিক্ষক আরেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রকে লেলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে সমাজে। আবার কখনো শিক্ষকগণ অভিভাবকদের হাতে, কখনো বা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের হাতে, কখনো নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের হাতে, কখনো বা নিজ শিক্ষার্থীদের হাতে অপমানিত, লাঞ্ছিত এমনকি শারীরিকভাবেও হামলার শিকার হচ্ছেন। শিক্ষককে পানিতে চুবানো, কান ধরে ওঠবস করানো, গলায় জুতার মালা পরানো এবং সর্বশেষ জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ঘটনায় গিয়ে ঠেকেছে শিক্ষকের মর্যাদা। শিক্ষক নির্যাতনের এমন সব অমানবিক চিত্র পত্রিকার পাতায় হরহামেশাই চোখে পড়ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এমন খবরগুলো দেশের শিক্ষক সমাজকে মর্মাহত করেছে, ব্যথিত করছে দেশের সাধারণ মানুষকেও। অতীতে যেখানে শিক্ষকদের সম্মান করাই ছিল সমাজের রেওয়াজ, সেখানে সম্মান তো দূরের কথা, আজ একজন শিক্ষক তার সমাজেই শুধু নন, তার বিদ্যালয়ে এমনকি শ্রেণিকক্ষেও ভোগেন নিরাপত্তাহীনতায়, তটস্থ থাকেন অজানা ভয়ে। না জানি কখন কী হয়! শিক্ষকদের সম্বল বলতে তো ওই সম্মানটুকুই। তাও যদি হারিয়ে ফেলেন, তবে আর বাকি থাকে কী? সম্মান হারানোর শঙ্কা নিয়ে একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবেন, তা নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। নইলে ভবিষ্যতে মেধাবীরা যে এ পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যার সুদূরপ্রসারী ফল হবে অত্যন্ত নেতিবাচক।

শিক্ষকের মর্যাদা কবিতায় পড়েছি, দিল্লির বাদশাহ হয়েও বাদশাহ আলমগীর তাঁর পুত্র শিক্ষকের পা ধুয়ে না দিয়ে শুধু পানি ঢেলে যে অবহেলা করেছিলেন, তার জন্য শাহজাদাকে শাসন করেছিলেন এবং শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা আজও শিক্ষকদের জন্য শুধু শিক্ষাদানের পথনির্দেশিকাই নয়, অভিভাবকদের জন্যও অনুকরণীয়। তিনি যে চিঠি লিখেছিলেন তার সংক্ষিপ্ত রূপ ছিল এমন-‘মাননীয় মহাশয়, আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে পাঠালাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন, এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।’

শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত এবং মানবতাবোধ জাগ্রত করার মহৎ মাধ্যম। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে শুধু জ্ঞানের আলোই জ্বালেন না, বরং তার নৈতিক চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন। শৈশবের অবুঝ মনকে পরম যত্নে ও শাসনে আগামীর যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা আজ চরম হুমকির মুখে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। যে সমাজে শিক্ষকরা আতঙ্কে থাকেন এবং শ্রেণিকক্ষে নিজেদের নিরাপদ বোধ করেন না, সেই সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য। শিক্ষকদের সম্বল কেবল তাদের সম্মানটুকু, আর তা কেড়ে নিলে মেধা ও মননের বিকাশ থমকে যাবে।

যদি এই শ্রদ্ধার জায়গাটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কোনো মেধাবী তরুণ ভবিষ্যতে এই মহান পেশায় আসতে চাইবেন না। এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো জাতির ওপর। তাই সময় এসেছে শিক্ষকদের হারিয়ে যাওয়া মর্যাদা ফিরিয়ে আনার এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ, সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করার।

লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক

পূর্ববর্তী নিবন্ধএমডিএমবি : অচেনা এক ‘মাদকে’র নাম
পরবর্তী নিবন্ধমাদকের ভয়াবহতা রুখতে সামাজিক উদ্যোগ জরুরি