বাংলাদেশ সাংবাৎসরিক ব্যাপক পরিবর্তন হয় আয়কর আইনে, সরকার পরিবর্তিত হলে আদর্শিক কারণে ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই পরিবর্তন অনিবার্য্য। এ বছর কম বেশি ১০০ এর উপরে সংশোধনী বা পরিবর্তন পাশ হয়েছে। তার মধ্যে থেকে কিছু চুম্বক অংশ কলেবর ছোট রেখে তুলে ধরলাম। ২০২৬–২০২৭ করবর্ষে অনিবাসী বাংলাদেশীসহ সকল স্বাভাবিক ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের ক্ষেত্রে ৪,০০,০০০/- টাকা মহিলা ও ৬৫ বছরের বা তদুর্ধ্ব বয়সের প্রবীণদের ৪,৫০,০০০/- টাকা, ৩য় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ৫,২৫,০০০/- টাকা ও গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ এ আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের ৫,৫০,০০০/- টাকা করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এবার কিন্তু ৫% হারে ১,০০,০০০/- টাকার স্ল্যাব রাখা হয়নি তদস্থলে ১০% হারে ৩,০০,০০০/- টাকার স্ল্যাব করা হয়েছে। ফলে নিম্ম আয়ের করদাতাদের করের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ব্যক্তি কর দাতাগণের বার্ষিক বিক্রয় ১০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে তিনি উৎসে কর কর্তনের আওতায় পড়বেন এবং তিনিও কর কর্তনকারী কর্তৃপক্ষ হিসাবে বিবেচিত হবেন। ফলে ব্যবসা বা পেশা খাতে আয় পরিগণনার ক্ষেত্রে খরচ দাবীর খাতে পরিমাপকৃত ব্যয়ে সচেষ্ট হবেন ও কতিপয় ক্ষেত্রে বিয়োজন অনুমোদিত হবে না। প্রত্যেক উৎসে কর কর্তনকারীদের উইথহোল্ডার শনাক্তকরণ নম্বর থাকতে হবে, তা বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত হবে। উৎসে কর কর্তনের ব্যত্যয়ে অতিরিক্ত ৫০% কর পরিশোধ যোগ্য হবে। উপকর কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে ১ম আপীল দায়ের কালে করদাবীর ১% কর পরিশোধ পূর্বক আপীল মামলা দায়ের করতে হবে। সুতরাং করদাতাদের কর নির্ধারণী কার্যক্রমের বিষয়ে আরো মনযোগী হতে হবে এবং কর নির্ধারণী কর্মকর্তাদেরও দায়ীত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কর দাবী সৃষ্টি হলেই, আদায়ের খড়গ নেমে আসবে। টার্ন ওভার বা গ্রস প্রাপ্তি নির্ধারণ বিষয়ে কর আলোচকবৃন্দের মধ্যে বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। উহা সকল সময় করদাতা কর্তৃক অর্জিত প্রাপ্তির উপর নির্ধারিত হয় ও হবে। কোন সময় প্রাক্কলিত প্রাপ্তির উপর হবে না। কারণ ‘অর্জিত’ শব্দ অতীতকাল (Past Tense)। পণ্য বিক্রয় বা সেবা এবং কমিশন ও ডিসকাউন্ট আলাদাভাবে আইনে বর্ণিত আছে এবং অনুরুপভাবে বিবেচিত হবে। স্বাভাবিক ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা বর্ষ সমাপ্তির ৩ মাসের মধ্যে দাখিল করলে— প্রদেয় করের ৫% অথবা ২৫,০০০/- উভয়ের মধ্যে যা কম তা হ্রাস পাবে কিন্তু শুনা যায় ২০২৬–২০২৭ করবর্ষের অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো চালু হয়নি। তৎপরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে দাখিল করলে — প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর কোনটা প্রযোজ্য নয়। ফলে অনেক করদাতা করভার লাঘবে সচেষ্ট হয়ে দ্রুত রিটার্ন জমা দিবেন। রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক পরিপত্র প্রকাশিত হলে সকল বিষয়ে বিশদ ও আইনানুগ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। রিটার্ন জমা দানের প্রণোদনা শেষ হওয়ার আগে উক্ত পরিপত্র প্রকাশনার অপেক্ষায় থাকলাম। সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে প্রদানকৃত ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত সুদের পরিমাণ ১২% নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এর চাইতে কম হারে সুদ ধার্য্য করা হলে বাকী টাকা আয় হিসাবে গণ্য করা হবে। আয়কর আইনের ৫৩ ধারায় পরিশোধিত সুদকে ব্যবসায়িক ব্যয় হিসাবে অনুমোদন দেয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনা অনুমতিতে প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মানি ল্যান্ডিং লাইসেন্স পেয়ে গেল। আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, আয়কর আইন প্রাধিকার প্রাপ্ত হবে। নিজ জমি ডেভেলপারকে প্রদান পূর্বক প্রাপ্ত নগদ অর্থ বা স্থাপনা/ফ্ল্যাট মূলধনী প্রাপ্তি হিসাবে করযোগ্য হবে। অনুরূপভাবে নিজের স্বর্ণ, রৌপ্য ও অলংকারাদি বিক্রয় লব্দ আয় মূলধনী মুনাফা হিসাবে করযোগ্য হবে। সাইনিং মানি ব্যতিরেকে এই রূপ সম্পদ সমূহ পূর্বে করমুক্ত ছিল। স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা একক বা সম্মিলিতভাবে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে ক্রসড চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফার এর মাধ্যমে ৫ লক্ষ টাকার ঋণ গ্রহণ করে ৬ বছরের মধ্যে পরিশোধ না করলে পরবর্তী অর্থ বছরে আয় হিসাবে পরিগণিত হবে। সুতরাং ৬ বছরের উর্ধ্বে ৫ লক্ষ টাকার অধিক ঋণ রাখা যাবে না। আত্মীয় স্বজনের নিকট থেকে হলেও দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ রাজস্ব আইনে অপরিশোধিত রাখা যাবে না। তবে স্বামী স্ত্রী, আপন ভাই বোন, পিতা মাতা বা সন্তানের নিকট হইতে গৃহীত ঋণ পরবর্তীতে মওকুফ করলে বা দানে রূপান্তর করলে এবং তা উভয়ের রিটার্নে প্রদর্শিত থাকলে করযোগ্য হবে না। বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ লক্ষ টাকার স্থলে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা করায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগে কর ছাড় হ্রাস পাবে। প্রগতিশীল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ প্রচেষ্টা সংকুচিত করা হলো। খুচরা বিক্রেতা ও সামগ্রী ক্রয় কালে ০.২% হারে অগ্রিম কর প্রদান করবেন। এই আইনের প্রায়োগিক সমস্যা বাজারে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে ও ভোক্তাগণের ব্যয়ভার বৃদ্ধি করবে। কোম্পানীর আওতাভুক্ত সকল করদাতা এবং দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি হতে আয় রয়েছে এইরুপ যেকোনো ব্যক্তি অথবা ১০(দশ) কোটি টাকার অর্ধিক টার্নওভার অথবা ৫ (পাঁচ) কোটি টাকার অধিক মূলধন রয়েছে, এরূপ সকল ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ, হিন্দু অবিভক্ত পরিবার বা কৃত্রিমসত্তার আওতাভুক্ত সকল করদাতার আয়বর্ষের রিটার্নের সাথে দাখিলকৃত আর্থিক বিবরণীসমূহ নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট কর্তৃক নিরীক্ষিত ও প্রত্যয়িত হলে হবে এবং আয় পরিগণনাপত্র (Income Computation Sheet) নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা কষ্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্টেন্ট অথবা আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং প্রত্যয়িত হবে। এর দ্বারা সব সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
লেখক : স্বনামধন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।












