মাদক নিয়ে কাজ করছি বেশ কয়েক বছর। পেশাগত কারণে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার সম্পর্কে কমবেশি ধারণা ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, কয়েক দিন আগেও এমডিএমবি নামটি আমার কাছেও সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। সমপ্রতি একটি ঘটনার সূত্র ধরে বিষয়টি জানার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, উন্মুক্ত নিবন্ধ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাধারণভাবে প্রকাশিত তথ্য পড়ে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করি। তখনই উপলব্ধি করি, আমাদের দেশে এই নতুন ধরনের মাদক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানাশোনা এখনও খুবই সীমিত। সেই উপলব্ধি থেকেই এই লেখা। এটি কোনো গবেষণাপত্র নয়; বরং একজন মাদক পুনর্বাসনকর্মী হিসেবে নতুন একটি বিষয় জানার পর সেই অভিজ্ঞতা পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটি আন্তরিক চেষ্টা।
আমরা সাধারণত মাদকের কথা বললেই ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা কিংবা ফেনসিডিলের কথাই ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাদকের জগৎ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। অপরাধচক্র এখন এমন সব কৃত্রিম রাসায়নিক তৈরি করছে, যেগুলোর নাম অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা। অথচ এগুলোর প্রভাব অনেক সময় প্রচলিত মাদকের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। এমডিএমবি সেই নতুন প্রজন্মের মাদকগুলোর একটি। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এমডিএমবি কোনো একক মাদকের নাম নয়। এটি সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড নামে পরিচিত এক শ্রেণির কৃত্রিম রাসায়নিকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। আন্তর্জাতিকভাবে এমডিএমবি–৪–ইএন–পিনাকা, এমডিএমবি–ইনাকা এবং এমডিএমবি–সিএইচএমআইসিএর মতো বিভিন্ন যৌগের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব রাসায়নিক গবেষণাগারে তৈরি হয় এবং গাঁজার সক্রিয় উপাদানের মতো মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রিসেপ্টরে কাজ করে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব গাঁজার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অনেক বেশি অনিশ্চিত হতে পারে।
এই ‘অনিশ্চিত’ শব্দটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন ব্যবহারকারী কখন কী ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারও ক্ষেত্রে তীব্র উদ্বেগ, আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। কেউ বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলতে পারেন। আবার কারও হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, খিঁচুনি হতে পারে কিংবা গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা–সাহিত্যে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড ব্যবহারের সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, সব ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন, পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে আরেকটি বিষয়। এই মাদক অনেক সময় এমনভাবে বিক্রি করা হয়, যাতে একজন সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেন না তিনি আসলে কী ব্যবহার করছেন। কখনও শুকনো ভেষজ পাতার ওপর রাসায়নিক স্প্রে করা হয়, আবার কখনও তরল আকারে ভ্যাপিং যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়। বাইরে থেকে দেখে এগুলো নিরীহ মনে হলেও ভেতরে থাকা রাসায়নিকের শক্তি বা ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবহারকারীর কোনো ধারণা থাকে না। ফলে কৌতূহলবশত বা বন্ধুদের প্ররোচনায় একবার ব্যবহারও অনেক সময় বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আরও একটি বিষয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার উল্লেখ করেছে। এসব রাসায়নিকের গঠন খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায়। কোনো একটি যৌগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর তার সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণ নতুন নামে বাজারে চলে আসে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ফরেনসিক পরীক্ষাগার এবং চিকিৎসকদের জন্যও এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই নতুন মনোসক্রিয় পদার্থ বা সিন্থেটিক মাদককে বিশ্বব্যাপী একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মাদক কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান আমার চোখে পড়েনি। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযানে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড–জাতীয় পদার্থ জব্দ হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এমডিএমবির বিস্তার নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে নেই। তাই অযথা আতঙ্ক ছড়ানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সচেতনতাই এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি। এই লেখা লিখতে গিয়ে আমার নিজেরও একটি শিক্ষা হয়েছে।
আমরা অনেক সময় মনে করি, পরিচিত কয়েকটি মাদকের নাম জানলেই সব জানা হয়ে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও তা নয়। মাদকের জগৎ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জ্ঞানও বাড়াতে হবে। একজন পুনর্বাসনকর্মী হিসেবে আমিও প্রতিনিয়ত শিখছি, নতুন তথ্য জানছি। এই লেখাটিও সেই শেখার পথেরই একটি ছোট অংশ। হয়তো আমার মতো আরও অনেক পাঠক আছেন, যাঁরা এই প্রথম এমডিএমবি নামটি শুনছেন।
যদি এই লেখাটি তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন মানুষকেও নতুন ধরনের সিন্থেটিক মাদক সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি করে এবং সচেতন হতে সাহায্য করে, তাহলেই আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করব।
লেখক : নেটওয়ার্ক অফিসার বারাকা, বাংলাদেশ মাদকাসক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র।









