উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কার্যক্রম ও অগ্রযাত্রা

নিজামুল ইসলাম সরফী | শনিবার , ৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে উঠোনের শিল্পীরা অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। প্রধানত সংস্কৃতির সব শাখাতেই যেমন আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, গল্পবলা, উপস্থাপনা, সংবাদপাঠ এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও গ্রুপ ভিত্তিক চর্চা করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে এই কেন্দ্রের কর্ণধার আয়েশা হক শিমু একজন প্রতিভাবান আবৃত্তিশিল্পী ও উপস্থাপক হিসেবে উভয় বাংলায় খ্যাতিমান। তিনি উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এর মাধ্যমে শিশুকিশোর ও তরুণদের মধ্যে আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চা বিস্তারে কাজ করছেন।

ইতিপূর্বে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার গৌরব রয়েছে তাঁর। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির অনুষ্ঠান উপস্থাপনাসহ বাংলা একাডেমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান উপস্থাপন ও আবৃত্তি করার সুযোগ হয়।

উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নিজস্ব অনুষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি, থিয়েটার ইনস্টিটিউটসহ চট্টগ্রাম একাডেমি মিলনায়তনে নিজস্ব প্রোগামে, স্বাধীনতার বইমেলা, মুক্তিযুদ্ধের বই উৎসব প্রভৃতিতে তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। তিনি বেতার টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে গণমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন।

তিনি দীর্ঘ দিন ধরে চট্টগ্রামের আবৃত্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণে প্রশিক্ষক, অতিথি ও বিচারক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ওপার বাংলায় কলকাতার শিশির মঞ্চে একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন তিনি। এছাড়া রুমকি গাঙ্গুলির সাথে যৌথভাবে আবৃত্তি করেন পৃথক অনুষ্ঠানে সেখানে। সেখানকার তারা বাংলার ‘আজ সকালের আমন্ত্রণে’ অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি ও সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। এছাড়া পশ্চিম বাংলার অনেকগুলো মিডিয়াতে তার সাক্ষাৎকার ও আবৃত্তি পরিবেশন করা হয়। বাংলাদেশের মাছরাঙা টিভিতে ‘রাঙা প্রভাত’ অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে তুলে ধরেন। নগরের বিভিন্ন আবৃত্তি সন্ধ্যায় আবৃত্তি পরিবেশন করেন তিনি দর্শক শ্রোতাকে মোহিত করেন।

উঠোনের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বাংলা নববর্ষ ও বর্ষবরণ, রবীন্দ্র, নজরুল জয়ন্তী, সংগীত, আবৃত্তি, নাট্য পরিবেশনা, সাহিত্য আড্ডা, সাংস্কৃতিক আলোচনা, শিশু তরুণ শিল্পীদের সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন।

২০২৫ সালে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আয়েশা হক শিমুকে মিষ্টভাষী, মায়াময়, প্রাণবন্ত এবং গুণী বাচিক শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর পরিচালনায় উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজিত বর্ষ বিদায় ও বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান প্রশংসিত হয়েছে। উঠোনের তরুণদের পাশাপাশি শিশুশিল্পীদের তিনি আবৃত্তি ও মঞ্চ উপস্থাপনায় এমনভাবে প্রশিক্ষিত করেন যাতে করে এদের পরিবেশনা দেখে দর্শকরা বিমোহিত হন।

বাচিক শিল্পী উপস্থাপক সংগঠক, প্রশিক্ষক, শৈলী প্রকাশনের কর্ণধার ছাড়াও তিনি শৈলী টিভি নামক অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে এতদিন শিল্প ও সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতা চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। সম্প্রতি তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে নন্দনশৈলী পত্রিকা। বরাবরের মতই সম্পাদক হিসেবে তিনি তাঁর রুচি স্নিগ্ধতার পরিচয় দিচ্ছেন। নন্দনশৈলীর যে ২টি সংখ্যা তিনি বের করেছেন দুটিই নামের মতোই নান্দনিক উপহার দিয়ে পাঠক সমাজ থেকে অভিনন্দিত হয়েছেন।

দুই বাংলায় খ্যাতি অর্জনকারী আয়েশা হক শিমু কবিতার ছন্দকে নিজস্ব সুরে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে উপস্থাপন করেন। তার কণ্ঠের কারুকাজ সূচারুরূপে পরিবেশন শ্রোতাকে বিমুগ্ধ না করে পারে না। কবিতা ভালোবাসলেও কবিতার ভেতর প্রবেশ করে আসল গল্পটি বলা সেটি আয়েশা হক শিমুই বুঝিয়েছেন আমাদেরকে। জন্মসূত্রে তিনি চট্টগ্রামের তাঁর বাবার বাড়ি নওগায়, এবং দাদার বাড়ি কলকাতার উল্টাডাঙ্গা। দাদার বাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশটাই শিমুকে তাঁর মনোজগতকে সত্যিকার মানুষ হবার শিক্ষা দিয়েছে। শৈশবেই রবীন্দ্র সংগীতের তালিম পেয়েছেন। এভাবে সংস্কৃতির একটা শক্ত ভীতের উপর বড় হয়েছেন তিনি। নানান জেলার মানুষের প্রীতির বন্ধন দেখে বেড়ে ওঠা শিমু সত্যিকার অর্থে একজন মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া চ্যানেল আই ও দীপ্ত টিভির গানে গানে সকাল অনুষ্ঠান তাঁর জীবনে স্মরণীয় হয়ে আছে।

লায়ন্স ক্লাবের মাস্টার অব চিরোমনির দায়িত্ব পালন করছেন। লায়ন্সের সব অনুষ্ঠান, বারবিডা, পেট্রোবাংলা, নজরুল জয়ন্তী, চট্টগ্রাম মেডিকেলের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান, চ্যানেল আই, সুদেষ্ণা স্যানাল, বিশ্বরূপ রুদ্র, ব্রততী বন্দোপাধ্যায়, উষা উত্তুপ, প্রদীপ ঘোষ, কল্যাণী কাজী, অতল তিওয়ারি, চিত্রনায়ক ফারুক, ইলিয়াস কাঞ্চনসহ দেশবিদেশের অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আয়েশা হক শিমু। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব, মা দিবসের অনুষ্ঠান শুরু হয় তাঁর উপস্থাপনা দিয়ে। সাবেক এটর্নী জেনারেল মাহবুবএ আলম, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর উপস্থাপনা দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছেন।

লায়ন্স ক্লাব, লেডিস ক্লাব, কবিতাঞ্জলি, পোর্ট্রেটসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন আয়েশা হক শিমু। টেলিভিশনে তাঁর উপস্থাপনায় নবধারা, ‘আমরা করবো জয়’, ‘বই পরিচিতি’, ‘এক কাপ চা’, ইত্যাদি অনুষ্ঠানগুলো দর্শকনন্দিত হয়েছে। প্রতিভাবান শিশু কিশোরদের নিজের আলোয় আলেকিত করে সমাজে ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি করছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠান উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিশু কিশোর ও তরুণ বাচিক শিল্পীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের বিকশিত করার সৌভাগ্য হয়েছে।

সূর্য যেমন নিজের আলোয় চাঁদকে আলোকিত করে তেমনি বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমু ও আলোকিত করছেন উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও নবীন প্রজম্মের সদস্য ছাড়া ও প্রবীণদের মাঝেও তার গুণগ্রাহী রয়েছেন। আয়েশা হক শিমুর কণ্ঠে কবিতাকে শুনে অকুণ্ঠ প্রশাংসায় ভাসিয়েছেন দেশের অনেক বিদগ্ধমহল। তাঁর কণ্ঠে যেন জাদুর ছোঁয়া। সেই ছোঁয়ায় তিনি আলোকিত করছেন বাঙালির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগৎ। আয়েশা হক শিমুর সাংস্কৃতিক জীবন আরো সমৃদ্ধ ও বিকশিত হোকউঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মত প্রতিষ্ঠান দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠুকআমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য আরো বেশি বেশি আয়েশা হক শিমু বেড়ে উঠুক সেই প্রত্যাশা করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক, আয়কর পেশাজীবী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউত্তরাধিকার নয় আত্মতৃপ্তির ঠিকানা নিজের উপার্জন
পরবর্তী নিবন্ধইবাদতের প্রতি একাগ্রতা ও মনোযোগ রক্ষার সহজ ও কার্যকর আমল