হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ

চট্টগ্রামে ছয় মাসে ভর্তি ছাড়াল সাড়ে ৭ হাজার । রোগীর চাপ বাড়ছে, সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করছি : চসিক কর্তৃপক্ষ

জাহেদুল কবির | শনিবার , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে হামের সংক্রমণ শুরু হয়। এই ছয় মাসের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ৭ হাজার। সরকারি হিসেবে এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। তবে উপসর্গের সব রোগী পরীক্ষার আওতায় না আসায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। হামের প্রকোপ বাড়ার কারণে প্রথমে শিশু স্বাস্থ্য ওয়ার্ডে ১৬ বেডের হাম কর্নার চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে রোগী আরো বাড়ার কারণে ৫০ শয্যার হাম ব্লক চালু করা হয়। বর্তমানে এসব শয্যার দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। এছাড়া হাম উপসর্গের রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১০ শয্যার পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক আইসিইউ) সব সময় পূর্ণ থাকছে। এদিকে, হাম নিয়ন্ত্রণে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী দ্বিতীয় দফায় হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এর আগে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামরুবেলার টিকা দেয়া হয়। মাসব্যাপী চলা সেই ক্যাম্পেইনে চট্টগ্রাম উপজেলা ও নগরীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে হামরুবেলার টিকা দেয়া হয়েছিল।

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ছোঁয়াছে রোগ হওয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি কোনো শিশু যদি হাম আক্রান্ত হয়েও থাকে, তার সংস্পর্শে অন্য শিশু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তবে চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত বেডের মধ্যে তারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। হামের উপসর্গ নিয়ে আসা বেশিরভাগ শিশুর বয়স ২ বছরের কম। এরমধ্যে আবার অনেক শিশুর টিকা দেয়ার বয়সও হয়নি। আবার অনেক শিশুকে হামের টিকা দেয়নি, অনেকে এক ডোজ দিয়েছে। একদমই দেয়নি এরকম শিশুও রয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল নতুন আরো ৪০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৬৩১ জন। এছাড়া নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৪ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশিহাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হলে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো এমএমআর টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়। তবে হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যেসব শিশু নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খায় এবং ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি নেই তাদের হাম হওয়ার সম্ভাবনা কম। হাম প্রতিরোধের জন্য শিশুদের অপুষ্টি রোধ করা জরুরি। হাম এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। যাদের ভিটামিনের ঘাটতি হয় এবং অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের হাম হলে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। নিয়মিত চিকিৎসায় বেশিরভাগ শিশু ভালো হয়ে যায়। হাম ছোঁয়াছে হওয়ার কারণে রোগীদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। তবে হামের উপসর্গের দিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে যদি কোনো শিশুর জ্বরের সাথে কফ, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং র‌্যাশ আসে তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই রোগে নিউমোনিয়াও হতে পারে। বাসায় নিয়ে বসে থাকলে বিপদ হতে পারে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। হাম রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, হামের পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে আসা অনেক শিশু টিকা নেয়নি। আবার কিছু শিশুর টিকা নেয়ার বয়স হয়নি, আবার কিছু শিশু এক ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। আবার দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে এমন শিশুও আছে। হামের রোগীদের আমরা আলাদা করে চিকিৎসা দিচ্ছি।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, আমরা হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দিচ্ছি। নির্ধারিত সংখ্যার রোগীর চাপ বাড়ছে, এটি ঠিক। তবে আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি শিল্পাঞ্চলের পুনর্জন্মের দুই দশক