দৈনিক আজাদীর গত ২৪ আগস্টের প্রথম পাতায় বন্ধুপ্রতিম চিফ রিপোর্টার হাসান আকবরের ‘ঐতিহ্যের নিউ মার্কেটে অবহেলা‘ শীর্ষক প্রতিবেদন এক নিমিষে পড়লাম। বেশ ভালো লাগলো। সাধারণত প্রকাশিত সব সংবাদের পুরোটা পড়া হয়না। সেটি অনেক সময় সময়ের কারণে, অনেক সময় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে আগ্রহের ঘাটতির কারণে। তবে কোন সংবাদের সাথে পাঠকের যদি স্মৃতি–জাগানিয়া ব্যাপার–স্যাপার থাকে তাহলে তা এক নিঃশ্বাসে পড়া হয়। তেমনটি ঘটেছে গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত তিন কলামে ছবি সহ এই সংবাদের বেলায়। পড়তে গিয়ে অনেকটা নস্টালজিক হয়ে পড়ি। চোখের সামনে ভাসে ফেলে আসা বিপণি–বিতান, তার রূপ, জৌলুস। তবে সে আজকের বিপণি বিতান নয়, আমার স্কুল–কলেজ বয়সে দেখা বিপণি –বিতান। প্রতিদিনকার মত ডাইনিং টেবিলে ল্যাপটপ খুলে তার সামনে ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে দিনের পত্রিকাগুলির পাতায় চোখ বুলাই। কয়েকটি নির্দিষ্ট দৈনিক পত্রিকা আছে যা, না পড়লেই নয়। এই কর্ম সারতে প্রায় ৩০/৪৫ মিনিট চলে যায়। নিউ মার্কেটকে নিয়ে লেখাটি চোখে পড়তেই মনটি নিজের অজান্তেই পিছু ছুটে চলে, অনেকটা লাগামহীন ঘোড়ার মত। শব্দের চাইতেও দ্রুত গতিতে। মনে হয় ভুল বললাম, বলা উচিত আলোর চাইতেও দ্রুত গতিতে। কথাটা মনে আসতেই মনে মনে হিসেব কষি – কার গতিবেগ বেশি? কোনটি দ্রুততর– শব্দ না আলো? বিজ্ঞান বলে– আলো শব্দের চাইতে অনেক অনেক দ্রুত। আর সেই কারণে যখন কখনো বিদ্যুৎ চমকায়, আমরা আলোটাকেই প্রথমে দেখি, তারপর শুনি শব্দ, বিশাল গর্জন। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে শব্দের গড় গতিবেগ ঘন্টায় প্রায় ৭৬১ মাইল বা ১,২২৫ কিলোমিটার। বিশাল ব্যাপার বটে! তবে আলোর সাথে তুলনা যদি করতে যাই, দেখি এ নিতান্তই শিশু। আলোর গতিবেগ ঘন্টায় ৬৭০ মিলিয়ন মাইল অর্থাৎ ১০৭ বিলিয়ন মাইল কিলোমিটার। শব্দের গতির চাইতে আলোর গতি প্রায় ৭৭০,০০০ গুণ বেশি। আমার একটা ভুল ধারণা ছিল এদ্দিন যে, মানুষের চিন্তা শক্তি, মানুষের মস্তিষ্ক অনেক দ্রুত গতিতে চলতে পারে। যেমন এই মুহূর্তে মন পড়ে আছে হল্যান্ড, পর মুহূর্তেই বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোথায়ও। কিন্তু না, সেটি ঠিক নয়। বিজ্ঞান বলে, (যদ্দুর জানি) মানুষের চিন্তার একটি গতিসীমা আছে এবং তা আশ্চর্যজনকভাবে ‘ধীর‘। আপাতত, মানুষ ধীরগতির চিন্তাবিদই রয়ে গেছে। বিজ্ঞান আরো বলে, আমরা কথা বলার চেয়ে দ্রুত স্বপ্ন দেখি। আমরা যতটা প্রক্রিয়া করতে পারি তার চেয়ে বেশি দেখি এবং যতটা কাজ করতে পারি তার চেয়ে বেশি কল্পনা করি। থাক আর বিজ্ঞান চর্চা নয়, বিজ্ঞানের ছাত্রও আমি না। ফিরে আসি মূল বিষয়, বিপণি বিতানে। কী চমৎকার নামকরণ। নামেই কাছে টানে। ‘বিপণি বিতান‘ নামকরণ করেছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও লেখক অধ্যাপক আবুল ফজল। আমাদের কাছে টানতো চাটগাঁ শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক সময়কার দৃষ্টিনন্দন এই শপিং মল। ষাট দশকের সব চাইতে আধুনিক ও অভিজাত শপিং মল, বিপণি বিতান।
আমাদের স্কুল বয়স থেকে কলেজ জীবন, এমন কী বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়েও বিপণি বিতান ছিল আমাদের কাছে যাকে বলা যায় ‘রেডেভু‘ (জবহফবুাড়ঁং)। মাঝেমধ্যে আমরা বন্ধুরা সেখানে কোন এক জায়গায় মিলিত হতাম নির্দিষ্ট সময়। স্থানটি হতো মার্কেটে ঢুকতেই রেলিং–এর ওপর পাশে কিংবা বুক স্টোর, নিউজ ফ্রন্টের ভেতর। সবাই তো আর সঠিক সময়ে আসতো না। তো সেই সময়টা সেখানেই কাটাতাম ম্যাগাজিনের পাতা উল্টিয়ে। যে–সময়কার কথা বলছি তখন ম্যাগাজিন কেনাটা ছিল আমাদের জন্যে অনেকটা সৌখিনতা। কখনো–সখনো পকেট কিছুটা ভারী হলে কেনা হতো। এর বেশি নয়। হাসান আকবর যথার্থই লিখেছেন– ‘নগরীর প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রামের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে থাকা নিউ মার্কেট দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলায় যে ক্ষয়িষ্ণু এক ঐতিহ্য। এক সময় এটি ছিল চট্টগ্রামের আধুনিকতার প্রতীক।‘ বাস্তবিক তাই! ষাট সত্তর এমন কী আশির দশকেও বিপণি বিতান ছিল আধুনিকতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। কাউকে খাঁটো করার জন্যে বলছি না, সে–সময় বিপণি বিতানে আমজনতা শপিং করতে আসতো না। অর্থবানের পাশাপাশি অভিজাত শ্রেণির নারী–পুরুষ, তরুণ–তরুণীরা আসা–যাওয়া করতো বেশি, করতো কেনাকাটা। আমাদের মত উঠতি তরুণেরা আসা–যাওয়া করতো বেশি। এটিও ঠিক বলা হলো না। কেননা তিন তলায় ছিল আমাদের, অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ কয়েক বন্ধুর (সাইফুল, হিরু, দীপক) পার্মানেন্ট টেইলারিং শপ, অর্থাৎ দর্জির দোকান। নিউমার্কেট তো, দর্জির–দোকান বলা মানে মার্কেটের মান–সম্মানে লাগা। যেমনটি আমাদের অনেকেই এখন টয়লেট বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। আমাদের সময় আমরা কিন্তু কোন দ্বিধা ছাড়াই বলতাম, টয়লেট, এমন কী পায়খানাও। এখন আমরা সভ্য হয়েছি। যাই হোক, দর্জি দোকানের মালিক আমাদের বেশ সমীহ করতেন। সময় এবং বয়স– দুটোই ওনার নাম ভুলে যেতে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে। ইদানীং এমনটা হয়। অলক্ষ্যে ইঙ্গিত দেয়, মনে করিয়ে দেয়– বয়স এগিয়ে চলেছে। যাই হোক, তারপর আমরা গিয়ে বসতাম, দোতলার বিখ্যাত ডায়মন্ড রেস্তোরাঁয়। তার পাশে আর একটি, প্যারামাউন্ট রেস্টুরেন্ট। ডায়মন্ডে ঢুকতেই দরোজার দুই দিকে দুটো চমৎকার পানের দোকান। মিষ্টি পান। চা–সিঙ্গারা কিংবা সমুচা–কাটলেট খেয়ে ঐই মিষ্টি পান খাওয়া চাই। অনেক সময় বাসায় ফেরার সময় সাথে নিয়ে আসতাম। রেস্তোরাঁয় ঢুকেই বা–দিকে ছিল ছোট ছোট খুপরির মত ক্যাবিন, পর্দা টাঙানো। ক্যাবিনগুলি প্রায়শ থাকতো স্কুল–কলেজ ছুট ছাত্র–ছাত্রীদের দখলে। রেস্তোরাঁর বয় এসে পর্দা খুলে অর্ডার নিয়ে চলে যেত, যাবার সময় পর্দা টেনে দিতো। তারপর বন্ধু–বান্ধবী, প্রেমিক–প্রেমিকার ধুমসে আড্ডা দেয়া। খাওয়াটা মুখ্য ছিলনা। মাঝে মধ্যে শহরের বাইরে থেকেও পুরুষ–মহিলা আসতো। ওদের কেউ কেউ কেনাকাটা করতে আসতো, কেউ বা বিপণি বিতান দেখতে। দেখার মতো ছিল এই মার্কেট। ডায়মন্ডের পাশের প্যারামাউন্ট রেস্টুরেন্টের তেমন জৌলুশ ছিলনা। ডায়মন্ডে বসার জায়গা না পেলে আমরা অগত্যা যেতাম সেখানে। একই তলায় ছিল আইসক্রিমের দোকান, ইগলু। এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডায় ঠান্ডা–আইসক্রিম অনেককে টানতো তবে আমাকে খুব একটা টানতো না।
আমরা হাঁটতাম। বৃত্তাকার বিপণি বিতানে, গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে শুরু করে চার তলায় গানের দোকান পর্যন্ত। চার তলায় ‘মলহার‘ নামে একটি দোকান ছিল। টিভি, রেডিও, ক্যাসেট ইত্যাদির। সেটি ছিল আমাদের এ কাকার। নাম অমল চৌধুরী। আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছাকাছি সে সময়কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু সিদ্দিক সওদাগরের সাথে পার্টনারশিপে এই দোকানটি তিনিই দিয়েছিলেন। আমরা মাঝেমধ্যে যেতাম। সেখানে বসতেন আমার চাইতে বছর দেড় দুই বড় নিখিলেশ কাকা, তার ডাকনাম ছিল গুড়ালাতু। ভাইদের মধ্যে সবার ছোট তাই। ছিলেন অনেকটা বন্ধুর মত। কাছাকাছি আর একটি গানের দোকান ছিল। নামটা মনে পড়ছে না। সেখানে কাজ করতো আমাদের পরিচিত আরো দুই সমবয়েসী। ওদের একজন এখন আমেরিকায়, অন্যজন কোথায় জানা নেই। জীবনের প্রয়োজনে কে যে কোথায় হারিয়ে যায়, কে তার খবর রাখে। আমরা সবাই ‘আপনারে লয়ে ব্যস্ত‘। আমরা ওই দোকানে যেতাম ক্যাসেটে গান রেকর্ড করাতে। যে সময়ের কথা বলছি তখন এই ধরনের মিউজিকের দোকানে একটি বড় খাতা থাকতো। তাতে সমস্ত গানের কথা, গায়ক–গায়িকার নাম লেখা থাকতো। আপনি আপনার পছন্দের তালিকা একটি কাগজে লিখে দিলে তারা আপনার কেনা ক্যাসেটে তা রেকর্ড করে দু–একদিনের মধ্যে ফেরত দিতো। এতে তাদের এবং ক্রেতাদের অনেক সময় যেতো। কিন্তু কোন সমস্যা কোন পক্ষেরই হতো না। এমন কী কোন কোন গান আপনাকে বাজিয়ে শোনাতো, যদি আপনি সেটি পছন্দ করেন সে কারণে। কোন বিরক্তি নেই বিক্রেতার। এখন তো এই সব ব্যবস্থা এমন কী টু–ইন ওয়ান, কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ার সব ‘অবসোলিট‘ হয়ে গেছে। এই প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরলেও তারা আসল চিত্রটি বুঝে উঠতে পারবেনা। সময় কত দ্রুত কতকিছু বদলে দেয়।
চাটগাঁ শহরে অনেক আধুনিক, অতি আধুনিক শপিং মল হয়েছে। কিন্তু বিপণি বিতান আমাকে এখনো আগের মত না হলেও বেশ টানে। কত স্মৃতি বিপণি বিতানের সাথে। দোস্ত বিল্ডিং এর দিকে যে প্রবেশ–মুখ সেখানে সিঁড়ির গোড়ায় এক লোক একটি ওজন–মাপার মেশিন নিয়ে বসতো। নিউ মার্কেট গেলে তার কাছে যাবোই। মেশিনে দাঁড়ালে একটি ছোট্ট শক্ত কাগজ বের হয়ে আসতো মেশিন থেকে। তাতে একদিকে আপনার ওজন, উল্টোপিঠে ভাগ্য গণনার কয়েকটি শব্দ। কেমন হবে আপনার দিন ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশ মজা পেতাম। মনে হয় বিশ্বাসও করতাম। এখন ভাবলে হাসি পায়, তখন পেতো না। অনেক সময় স্রেফ কোন প্রয়োজন ছাড়াই যেতাম নিউ মার্কেটে। ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম কয়েক বন্ধু মিলে। দর্শনীয় রমণীয় রমণী দেখতাম। তাতে দৃষ্টি জুড়াতো। আমাদের এক সিনিয়র সাংবাদিক বন্ধু। তিনি একদিন বলেন, ‘শালার নিউ মার্কেটে এলে আবার বিয়ে করতে ইচ্ছে করে‘। তখন জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, নিউ মার্কেটটি তার শালার কিনা। আমরা যারা তখন তার সাথে ছিলাম, আমাদের কেউ তখনও বিয়ে নামক ‘বেলতলায়‘ যাইনি। সেই দিনগুলি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন আর চোখ ধাঁধায় কিংবা চোখ জুড়ায় তেমন কাউকে খুব একটা দেখা যায় না। আগের সেই জৌলুস, সৌন্দর্য সব হারিয়েছে এক সময়কার রূপবতী বিপণি বিতান। দোতলার ডায়মন্ড রেস্তোরাঁ সহ গানের দোকানগুলির আগের সেই রূপ, গঠন নেই। চট্টগ্রামের শপিং মলের মধ্যে খুব সম্ভবত বিপণি বিতানে ছিল প্রথম ‘স্কেলিটর‘। কেবল তাতে চড়ার জন্যে যে কতবার এই মার্কেটে গেছি তার ঠিক নেই। অনেকের কাছে তো এই স্কেলিটর ছিল খেলনার মতো। একবার উঠা, আর একবার নামা, আবার উঠা। মার্কেট ভবনের মাঝখানে চক্রাকারে উপরে উঠার খোলা জায়গায়টিও ছিল চমৎকার। এখন সে–পথ ধরে উপরে উঠতে হলে নাক ধরতে হয়। আজাদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্কেটের কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তরা, বের হয়ে আছে নগ্ন লোহার রড। নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়েছে অনেকাংশে। অনেকে শংকিত।‘ বিপণি বিতানের বয়স তো আর কম হলো না। ৬০ বছর। এর রক্ষণাবেক্ষণ, সৌন্দর্য বর্ধন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কেটটির সামনে পুরো রাস্তা বেদখল করে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশা, সিএনজি। অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক সিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে কোন কোনদিকে দাঁড়িয়ে থাকা বাস, যাত্রী উঠা নামায় ব্যস্ত। যেন কেউ নেই এই সমস্ত অনিয়মকে নিয়মের মধ্যে আনার জন্যে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করি তারা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, আভিজাত্যের প্রতীক বিপণি বিতানের হারানো সুনাম, সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। (২৫–৮–২০২৬)।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












