এখানে বিশ্বাস বলতে মানুষের ব্যক্তিগত আস্থা, অনুভূতি, সংস্কৃতি বা মূল্যবোধকে অস্বীকার করা বোঝানো হয়নি। বরং প্রকৃতি ও বাস্তবতার কোনো বিষয়কে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রমাণের ওপর নির্ভর করার কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞান কোনো ব্যক্তি, মতবাদ বা প্রচলিত ধারণার প্রতি অন্ধ আনুগত্যের নাম নয়। বিজ্ঞান হলো সত্য অনুসন্ধানের একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
মানুষের সভ্যতার অগ্রযাত্রার ইতিহাস মূলত প্রশ্ন করার ইতিহাস। মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছে, গ্রহ নক্ষত্র কীভাবে চলে, বজ্রপাত কেন হয়, রোগের কারণ কী, পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি কীভাবে, তখনই জ্ঞানের নতুন দরজা খুলেছে। অজানাকে জানার এই আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে গুহার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর পথে নিয়ে এসেছে। তাই বিজ্ঞান কোনো অন্ধ বিশ্বাসের নাম নয়। বিজ্ঞান হলো প্রশ্ন করা, প্রমাণ খোঁজা, পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে নিজের ধারণা সংশোধন করার সাহস।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষক ও শিল্প উদ্যোক্তা স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বহুল প্রচলিত বক্তব্য, বিশ্বাস আর অন্ধভক্তি দিয়ে আর যাই হোক, বিজ্ঞানচর্চা বাঁচিয়ে রাখা যায় না, এই সত্যটিই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল শুধু পরীক্ষাগারে গবেষণার বিষয় নয়, ছিল মুক্ত চিন্তা ও যুক্তিবোধের অনুশীলন। তিনি বুঝেছিলেন, যে শিক্ষার্থী শুধু উত্তর মুখস্থ করে, সে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে, কিন্তু যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, সে একদিন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানের মূল শক্তি এখানেই। বিজ্ঞান কোনো মানুষকে সত্যের মালিক বলে স্বীকার করে না। কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী কোনো কথা বলেছেন বলেই তা সত্য হয়ে যায় না। সেই কথাকে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রমাণের মধ্য দিয়ে যাচাই করতে হয়। নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে পুরোনো ধারণা সংশোধন করতেও বিজ্ঞান দ্বিধা করে না। নিউটনের গতিবিদ্যা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দেখিয়েছে, প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষেত্রে নিউটনের ধারণারও নির্দিষ্ট সীমা আছে। এভাবেই নতুন জ্ঞান পুরোনো জ্ঞানকে অনেক সময় বাতিল না করে আরও গভীর ও নির্ভুল করে তোলে।
আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত বক্তব্য, প্রশ্ন করা কখনো বন্ধ করা উচিত নয়। এই কথার মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে। কৌতূহল হারিয়ে গেলে জ্ঞানচর্চা থেমে যায়। একটি শিশুর সহজ প্রশ্ন অনেক সময় একজন গবেষককে এমন পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে আগে কেউ হাঁটেনি। তাই প্রশ্নকে থামিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি কণ্ঠকে থামিয়ে দেওয়া নয়, একটি সম্ভাবনাকেও থামিয়ে দেওয়া।
রিচার্ড ফাইনম্যান বিজ্ঞানচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, মানুষ যেন নিজেকেই নিজে প্রতারিত না করে, কারণ নিজেকে প্রতারিত করা সবচেয়ে সহজ। বিজ্ঞানীর জন্য এই সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক নিজের ধারণাকে সত্য প্রমাণ করার জন্য তথ্য বেছে নেবেন না। বরং নিজের ধারণা ভুল হতে পারে, এই সম্ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দেবেন। সত্যের প্রতি এই সততাই বিজ্ঞানকে অন্য অনেক জ্ঞানচর্চা থেকে আলাদা করেছে।
আজকের পৃথিবীতে এই শিক্ষা শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, আমাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি ভুল তথ্য কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কোনো ছবি, ভিডিও বা চমকপ্রদ বক্তব্য দেখেই অনেকে সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন। অথচ কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলেই তা সত্য হয় না। আমাদের জানতে হবে, তথ্যটির উৎস কী, এর পক্ষে কী প্রমাণ আছে, অন্য নির্ভরযোগ্য উৎস কী বলছে এবং তথ্যটি যাচাই করা সম্ভব কি না।
এই কারণেই বিজ্ঞানমনস্কতা শুধু বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রয়োগ দরকার। কোনো রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে অদ্ভুত দাবি শুনলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কোথায়। কোনো অলৌকিক চিকিৎসার কথা শুনলে জানতে হবে, তা পরীক্ষিত কি না। কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা রহস্যময় মনে হলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ অজানাকে রহস্য বলে মেনে নেওয়া সহজ, কিন্তু তার কারণ খুঁজে বের করার মধ্যেই জ্ঞানের আসল আনন্দ।
গ্যালিলিওর সময়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি দেখিয়েছিলেন, সত্য কোনো ব্যক্তির মতামতের ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম আছে, আর সেই নিয়মকে বোঝার জন্য প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা। বিজ্ঞান এভাবেই মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা বাড়িয়েছে।
মেরি কুরির জীবনও আমাদের শেখায়, বিজ্ঞানে বড় অর্জনের পেছনে থাকে দীর্ঘ অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম। প্রতিটি আবিষ্কারের পেছনে থাকে অসংখ্য প্রশ্ন, পরীক্ষা এবং ব্যর্থতা। তাই কোনো গবেষণায় ব্যর্থ হওয়া মানেই পরাজয় নয়। অনেক সময় ব্যর্থতাই পরবর্তী সাফল্যের পথ দেখায়।
আমাদের দেশের বাঙালি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডক্টর জামাল নজরুল ইসলামের জীবনেও আমরা এই অনুসন্ধিৎসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। মৌলিক পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম, মেকানিক্স, কসমোলজি ও মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে গবেষণা করা এই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী বিদেশের উন্নত গবেষণার সুযোগ ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের একটি ছেলে বা মেয়েকে যদি বিজ্ঞানের পথে নিয়ে আসতে পারেন এবং তার সামনে মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানের একটি নতুন দরজা খুলে দিতে পারেন, তাহলেই তাঁর দেশে ফেরা সার্থক হবে।
এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু একজন বিজ্ঞানীর দেশপ্রেম নেই, আছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি গভীর আস্থা। জামাল নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করতেন, জ্ঞানচর্চার জন্য মাতৃভাষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বের কথা বলেছেন এবং নিজেও বাংলায় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা লিখেছেন।
বিজ্ঞানকে তাই কেবল যন্ত্র, প্রযুক্তি বা আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে চলবে না। বিজ্ঞান আমাদের চিন্তার পদ্ধতি শেখায়। এটি শেখায়, কোনো কথা শুধু প্রচলিত বলে সত্য নয়, কোনো ব্যক্তি বিখ্যাত বলে তাঁর সব কথা নির্ভুল নয় এবং নিজের ধারণা সঠিক মনে হলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। সত্যের কাছে পৌঁছাতে হলে প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হয়। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনবিজ্ঞান, পারমাণবিক শক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার যুগে বিজ্ঞানের ক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। নতুন জ্ঞান মানুষের জীবনকে কতটা নিরাপদ ও সুন্দর করবে, তা নির্ভর করে মানুষ সেই জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। তাই বিজ্ঞানকে মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও এই পরিবর্তন দরকার। শিক্ষার্থীকে শুধু সঠিক উত্তর শেখানো যথেষ্ট নয়। তাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। তাকে বলতে হবে, তুমি কেন এমন মনে কর, তোমার প্রমাণ কী, অন্য কোনো ব্যাখ্যা কি সম্ভব। একটি শ্রেণিকক্ষ তখনই সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠে, যখন সেখানে প্রশ্ন করাকে অপরাধ মনে করা হয় না এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকে।
বিজ্ঞান বিশ্বাসের শত্রু নয়। মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস তার নৈতিকতা ও জীবনবোধের অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি বা বাস্তব দাবি সত্য কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণ। ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে পারে, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে সত্যের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, আইনস্টাইন, ফাইনম্যান, গ্যালিলিও, মেরি কুরি এবং জামাল নজরুল ইসলামের জীবন ও চিন্তা আমাদের একটি সাধারণ শিক্ষা দেয়। সত্যকে ভালোবাসতে হলে প্রশ্নকে ভয় পাওয়া যাবে না। নিজের মতের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে সত্যের প্রতি আনুগত্য বড়।
একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ এমন সমাজ নয়, যেখানে সবাই একই কথা বিশ্বাস করে। বরং এমন সমাজ, যেখানে মানুষ ভিন্নমত পোষণ করতে পারে, কিন্তু প্রমাণের সামনে নিজের মত পরিবর্তন করার সাহসও রাখে। যেখানে শিশুর প্রশ্নকে থামিয়ে দেওয়া হয় না, বরং বলা হয়, চলো, পরীক্ষা করে দেখি। যেখানে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আগে মানুষ তার সত্যতা যাচাই করে।
বিজ্ঞান বেঁচে থাকে প্রশ্নে, এগিয়ে যায় প্রমাণে, শক্তিশালী হয় সংশয়ে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণেই তার সার্থকতা। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু বিজ্ঞান পড়ানো যথেষ্ট নয়। তাদের বিজ্ঞানমনস্কভাবে চিন্তা করতে শেখাতে হবে। কারণ একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিতে পারে একটি নতুন আবিষ্কার, আর একটি নতুন আবিষ্কার বদলে দিতে পারে মানুষের ভবিষ্যৎ। সত্যের পথে চলার জন্য তাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অন্ধ আনুগত্য নয়, মুক্ত চিন্তা। অন্ধ বিশ্বাস নয়, যুক্তির আলো। আর সেই আলো যত বেশি মানুষের মনে জ্বলবে, আমাদের সমাজ তত বেশি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও আলোকিত হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।












