সাইকেল নিয়ে গেল সংখ্যায় প্রকাশিত লেখার ওপর বেশ কিছু মন্তব্য পেলাম। লেখার ওপর কোনো মন্তব্য, সে পজিটিভ হোক কিংবা নেগেটিভ, দেখে ভালো লাগে। ভালো লাগে এই ভেবে যাক এখনো কিছু পাঠক আছেন তাহলে। কেননা আজকাল পাঠক সংখ্যা খুব কম। না পড়েই অনেকেই মন্তব্য করেন ভালো হয়েছে কিংবা বুড়ো আঙ্গুল তুলে ধরে বুঝিয়ে দেন ভালো হয়েছে। পড়ার সময় বা ধৈর্য্য খুব কম। মোবাইলে ঘন্টার ঘন্টার ‘রিলস‘ দেখায় ধৈর্যের কোন কমতি নেই তাদের। যে কথা বলছিলাম, চট্টগ্রাম থেকে সাংবাদিক বন্ধু এক সময়ের সরকারি আমলা, শফিকুল আলম খান হল্যান্ডের মত উন্নত দেশে এত বেশি সাইকেল চুরি হয় জানতে পেরে তার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সরকারি হিসাব মতে প্রতি বছর ৮ লাখের বেশি সাইকেল চুরি হয়। এই অল্প দামের জিনিষের প্রতি যদি ডাচদের এতো আগ্রহ, তাহলে দামি জিনিস হাতের নাগালে পেলে ওরা কী করবে? কারণ চোর চোরই।‘ খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা। এই প্রসঙ্গে বলতে হয়, এক কোটি ৮০ লক্ষ জনসংখ্যার দেশ হল্যান্ডে ব্যক্তিগত মালিকানায় গাড়ির (কার) সংখ্যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির হিসাবে প্রায় এক কোটি (৯৪ লক্ষ)। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১,৮% বেশি। এর মধ্যে ৫৮% শতাংশ গাড়ির মালিক হলেন ৫০ বছর বয়েসীরা। অন্যদিকে, ৩০ বছরের কম বয়সীদের মালিকানায় আছে প্রায় ১০% শতাংশ গাড়ি। বলা চলে, ১৮ বছরের উর্ধে প্রায় সবার নিজস্ব এক বা একাধিক গাড়ি রয়েছে। কারো কারো রয়েছে অফিসের গাড়ি। খুব কম সংখ্যক ব্যক্তির বাড়িতে নিজস্ব গ্যারেজ আছে। ফলে প্রতিটি ঘরের সামনে দেখা যায় গাড়ি ‘পার্কড‘ করা। দিনরাত বাইরে পড়ে থাকে। তাই বলে গাড়ি যে একেবারে চুরি হয়না তা ভাবার কোন কারণ নয়। তবে সাইকেলের মত নয়। প্রশ্ন কেন? কারা চুরি করে সাইকেল? বন্ধু শফিকুল আলম খানের প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে বলে নেই –
হল্যান্ডে একটা সময় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, বোমাবাজি ইত্যাদি অপরাধ হতোনা বললেই চলে। একটা সময় বলতে যখন আমি এদেশে প্রথম আসি, সে আজ থেকে ৩৫ বছর আগেকার কথা বলছি। তখন এদেশে আজকের মত এত বিদেশী (ভিনদেশ থেকে আসা) লোকজন ছিলনা। যে সময়ের কথা বলছি তখন এই দেশে অপরাধের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। এদেশে বিদেশিদের আগমন যত বেশি ঘটছে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে চলেছে তত বেশি। সুন্দর দেশটিকে অসুন্দর করে তুলছে আমাদের মত বিদেশিরা। ঢালাওভাবে এইভাবে বলাটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। শুনতে খারাপ লাগে, কারণ তাতে আমাদের গায়ে লাগে। যদিও অঘটন ঘটানোর পেছনে আমরা অর্থাৎ ভিনদেশীরা। হল্যান্ডের যে–সমস্ত এলাকায় বিদেশী নাগরিকদের বসবাস সে–সমস্ত এলাকা প্রায়শ নোংরা, অগোছাল; সেখানে যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনা দেখা যায়, অনেকটা আমাদের দেশের মত। সভ্য দেশে এসে, দীর্ঘদিন থেকেও এদের স্বভাবের খুব একটা পরিবর্তন হয়না। আর সেই কারণে বিদেশী হলেও যারা কিছুটা সচ্ছল এবং সিভিক সেন্স আছে, তারা অনুন্নত দেশ থেকে আসা লোকজন যে–সমস্ত এলাকায় থাকে তা এড়িয়ে চলেন। হল্যান্ডে বিদেশীর সংখ্যা এত বেশি যে বড় বড় শহরগুলির কোন কোন এলাকায় গেলে আপনার মনে হবে আপনি বুঝি ভুল করে তুরস্ক, মরোক্ক কিংবা পোল্যান্ড বা পূর্ব ইউরোপের গরিব দেশগুলিতে এসে পড়েছেন। কিছু কিছু এলাকা আছে মনে হবে আফ্রিকার বেনিন কিংবা সুদানের কোন শহর। আর অপরাধ? এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত হল্যান্ডে মরক্কীয় তরুণ শ্রেণী ছিল তাবৎ অপরাধের শিরোমনি। পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, কোথাও ছিনতাই, ড্রাগস, চুরি–চামারি, প্রথমেই সন্দেহের আঙ্গুল মরক্কীয়দের দিকে। স্থানীয় ডাচরা বিরক্ত ও ক্লান্ত। আর এই সমস্ত কারণে কট্টর ইসলাম–বিরোধী ডান নেতা, খিয়ের্ট বিল্ডার্স সহ প্রাক্তন ডাচ প্রধান মন্ত্রী, মার্ক রুটে (বর্তমানে ন্যাটো প্রধান) মরক্কীয়দের তল্পিতল্পা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাবার ডাক দিয়েছিলেন। ডাচরা মূলত সরল গোছের। এমনও কথা প্রচলিত ছিল যে, যদি কোন ডাচকে বলা হতো মানুষের হাতের আঙ্গুল ছয়টি, তাহলে তারা সে কথা বিশ্বাস করতেন। এখন তাদের সেই সরলতা, সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। চিড় ধরিয়েছে অনুন্নত দেশগুলি থেকে আসা আমাদের মত বিদেশিরা। ইদানীং চুরি, দিনের বেলায় ঘরে ঢুকে, বিশেষ করে যে সমস্ত ঘরে বয়স্ক লোক একাকী বসবাস করেন তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়া, শারীরিকভাবে আঘাত করা, এক্সপ্লোসিভ দিয়ে এটিএম বুথ উড়িয়ে টাকা নিয়ে উধাও হবার মত ঘটনা ঘটছে দেদারসে। প্রথমদিকে এই সমস্ত কাজে মরক্কীয়রা জড়িত ছিল বলে অভিযোগ। এরপর এই সব কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে পোল্যান্ড, বসনিয়া ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আসা লোকজনদের কেউ কেউ। লক্ষ্যণীয় যে যুদ্ধ, অভাব, দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে আফ্রিকীয় দেশ থেকে আসা লোকজন এই জাতীয় অপকর্মে খুব একটা লিপ্ত না। ইতিমধ্যে, বন্ধু শফিকুল আলম খান আশা করি তার উত্তর পেয়ে গেছেন। চুরি সহ তাবৎ অপরাধ করে থাকে এরাই, স্থানীয় ডাচরা নয়। সাইকেলের মত ছিচঁড়ে–চুরি করে সাধারণত মাদকাসক্তরা আর বিপথে যাওয়া বিদেশী তরুণেরা। গাড়ি চুরির চাইতে সাইকেল চুরি অনেক সহজ। সাইকেল যেখানে–সেখানে রাখা হয়। চেইন দিয়ে তালা লাগলেও তা কাটতে খুব একটা বেগ পেতে হয়না।
তবে মজার ব্যাপার হলো, সাইকেল চুরি বরাবরই ছিল। যখন অপরাধ খুব একটা হতো না, তখনও। সেই নব্বই দশকের শুরুতে যখন এদেশে আসি তখনও দেখেছি ভয়ানক হারে সাইকেল চুরি হতে, এখনো তা তেমনটি রয়েছে। বলা চলে আরো বেড়েছে। সাইকেলের স্বর্গভূমি হল্যান্ডের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সাইকেল চুরি। এই সমস্ত চুরির ঘটনা ঘটে আমস্টারডাম, ইউত্রেক, রটরডাম, হেগের মত বড় বড় শহরে। সাইকেল পার্ক করার জন্যে শহরের বিভিন্ন স্থানে, সমুদ্র পাড়ে, শপিং মলের পাশে পৃথক স্থান রয়েছে। তার জন্যে আলাদা কোন টাকা দিতে হয়না। স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ থেকেও এই ধরণের সাইকেল পার্কিং–প্লেস রয়েছে, রয়েছে তাদের নির্দিষ্ট কর্মচারী। বড় বড় চেইন স্টোরগুলির সামনে বা ধারে–কাছে সাইকেল রাখার জন্যে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। ‘লক‘ করে আপনি সাইকেল রেখে গেলেন, হয়তো শপিং করতে বা ঘুরে বেড়াতে। ফিরে এসে দেখলেন আপনার সাইকেলটি নেই। ততক্ষণে সেটি উধাও হয়ে গেছে। তালা ভেঙে, খুলে বা চেইন ভেঙে। আমাদের দেশের মত এখানকার লোকজন খুব বেশি কৌতূহলী নন। কে কার গরুকে ধোঁয়া দেয় – দশা অনেকটা তাই। একদিন দেখি আমার পুরানো দ্বি–চক্রযানটি উধাও। শহরের মূল শপিং সেন্টারের সামনে তালাবদ্ধ রেখে ‘মলে‘ গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরতে হলো ট্রামে। না, পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করিনি। কেননা গাড়ি চুরি হলে গাড়ি পাবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সাইকেল? সেটি পাওয়া মুশকিল। সাইকেল–চুরি বিষয়টি অনেকটা গা–সওয়া হয়ে গেছে সবার। ভাবখানা এই– এ এমন আর কী। আর তাই দেখা যায়, বিশেষ করে স্কুল–গামী ছেলেমেয়েদের সেকেন্ড–হ্যান্ড সাইকেল ব্যবহার করতে। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আত্মজা সপ্তর্ষি তখন থাকতো ইউত্রেক শহরে, যে শহরে (দি হেগ) আমার অবস্থান সেখান থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে আমাদের যাবার উদ্দেশ্য– একসাথে রেস্তোরাঁয় ডিনার করা। ডিনার শেষে গাড়ির দিকে এগোবার আগে সপ্তর্ষি যেখানে সাইকেল রেখেছিল হেঁটে সেদিকে এগিয়ে যাই। দেখি তার সাইকেলের ভগ্নদশা। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নতুন সাইকেল কেনার কথা বললে সে বিষয়টি কোন গুরুত্ব না দিয়ে বলে, ‘কোন প্রয়োজন নেই। এই ভালো।‘ কেননা নুতন সাইকেল থাকলে চুরির সম্ভাবনা বেশি।
বলা বাহুল্য, সাইকেল সকল বয়সী ডাচদের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাইকেলের প্রতি এমন ভালোবাসা, ‘অবসেশন‘ আর কোন জাতির মধ্যে দেখা মেলে না। সাইকেলেরও রয়েছে নানা ধরন–সাধারণ সাইকেল যা আমাদের পরিচিত, ইলেট্রিক বাইক, ফেড বাইক, কার্গো বাইক, স্পিড পেডেলেক সহ কত হরেক রকমের সাইকেল রয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। আপনি ডাচদের যে কোনো পরিস্থিতিতেই বাইক চালাতে দেখবেন, কী বৃষ্টি, কী তুষার কিংবা ঠান্ডা। ‘বার‘ থেকে বের হয়ে কেউ কেউ মাতাল অবস্থায়, কেউবা মোবাইল হাতে ‘টেক্সট‘ করতে করতে, বৃষ্টি বরফে ভিজে কিংবা সাইকেলের সাথে লাগানো বিশেষ টানা–গাড়িতে কয়েকটি শিশু নিয়ে বাইক চালায়। আপনি হয়তো সাইকেল চালাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন আপনার পাশে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে আসছেন দেশের প্রধান মন্ত্রী। আপনার অবাক হবার আগেই হয়তো তিনি সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। সাইকেল দিয়ে আপনি কোন ‘সোশ্যাল স্ট্যাটাস‘ নির্ণয় করতে পারবেন না। আমাদের দেশে অর্থবানদের ছেলেমেয়েরা স্কুল–কলেজে যায় গাড়ি চড়ে। এদেশে ঠিক উল্টো। বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সহজে গাড়িতে স্কুলে যেতে চায়না। তাতে তাদের আত্মসম্মানে লাগে। কেননা সব শিক্ষার্থী, শিক্ষকরা যাচ্ছে সাইকেল চেপে। জীবনের অনেকটা সময় দেশে কাটানো আমার চিন্তাভাবনা ভিন্ন। বরফ–পড়া দিনে কিংবা বৃষ্টিতে রেইনকোট চাপিয়ে ছেলে–মেয়েকে স্কুলে যেতে দেখে কষ্ট হতো। ওদের বললে উত্তর, ‘সবাই তো যায়’। তারপরও কখনো–সখনো জোড় করলে, তাদের নামিয়ে দিতে হতো স্কুল থেকে একটু দূরে, যাতে ওরা যে মা–বাবার গাড়িতে স্কুলে এসেছে তা সহপাঠীরা দেখতে না পায়। আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষাটা এদের বুদ্ধি–বয়স থেকে শুরু। তাই ওদের চিন্তা–ভাবনা আমাদের মত ভিন্ন চিন্তাধারার মা–বাবাদের চাইতে অনেক এগিয়ে। (১০–৬–২০২৬)
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।










