পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বৃক্ষের বিপরীতে পরিবেশ উপযোগী ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য সহায়ক বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নেয় পরিবেশভিত্তিক সংগঠন প্ল্যানটেশন ফর নেচার। ২০২০ সালে শুরু হওয়া এই সংগঠনের উদ্যোগে বিতরণ করা চারা দুই পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে রোপণ করা হয়েছে। ছয় বছরে রোপণ করা হয়েছে মোট ১ লাখ ১৬০টি চারা।
২০২০ সালে প্রকৌশলী সবুজ চাকমার হাত ধরে সংগঠনটির পথ চলা শুরু হয়। তিনি বর্তমানে রাঙামাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সেগুন, আকাশিয়াসহ বিভিন্ন পরিবেশের ক্ষতিকর ও জীববৈচিত্র্যের অনুপযোগী বৃক্ষের পরিবর্তে প্রাণ ও প্রকৃতি এবং পাখিসহ বন্যপ্রাণী খাদ্য সহায়ক উপযোগী স্বর্ণচাঁপা বৃক্ষের চারা রোপণের উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৫ হাজার, ২০২১ সালে ১৭ হাজার ৯৬০, ২০২২ সালে ৯ হাজার ৬০০, ২০২৩ সালে ৩০ হাজার, ২০২৪ সালে ১৫ হাজার এবং ২০২৫ সালে ১০ হাজার চারা বিতরণ করা হয়। চলতি বছরের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আরো ১৩ হাজার ৫০০টি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। এই চারাগুলো প্রধানত খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পাহাড়ি গ্রামে বিতরণ করা হয়েছে।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির কাচালং শিশু সদন, সাজেকের উলুছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিজক পহর ফুদোক বৌদ্ধ বিহার, সাজেক রুইলুই মোন বলপেয়ে বনবিহার, সাজেক উদয়পুর ধর্মরেগা অরণ্যকুটির, বাঘাইছড়ির কালামুড়া ধর্ম ছদক বনবিহার, রাঙামাটির কাটাছড়ি রাজবন ভাবনা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ির মেরুংয়ের মৈত্রী কল্যাণ অরণ্য কুঠির, সাজেকের নন্দরামের অরণ্য লুম্বিনি বনবিহার, সাজেক ৮ নং পাড়া সাধনা গিরি বন কুটির, সিজোক ছড়া, ভিজা নন্দরাম (মাচালং), ভিজা হিজিং, বাঘাইছড়ি ইউনিয়ন ও বাঘাইহাটসহ সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চারাগুলো বিতরণ করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির মেরুংয়ের মৈত্রী কল্যাণ অরণ্য কুঠিরের দায়ক রবি রঞ্জন চাকমা বলেন, কয়েক বছর আগে প্ল্যানটেশন ফর নেচার সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েক শত স্বর্ণচাপা গাছের চারা দেওয়া হয়। বিহারের পাহাড়ের ফাঁকা অংশে স্বর্ণচাপার রোপণ করার পর সব চারায় বড় হয়েছে। স্বর্ণচাপার ফল পাখিদের বেশ প্রিয়। বসন্তকালে সব গাছে ফল আসে। এসব গাছে বিভিন্ন প্রজাতি পাখি, কাঠবিড়ালী, বানর, হনুমান ফল খেতে আসে।
পরিবেশ সহায়ক স্বর্ণচাপার কাঠ বেশ মূল্যবান। সংগঠনটির উদ্যোগে মূলত পরিবেশবান্ধব স্বর্ণচাঁপা (চাম্পা ফুল) গাছ রোপণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই গাছ পরিবেশ ও পাখিবান্ধব হওয়ায় পাহাড়ি এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি স্বর্ণচাঁপা গাছের আর্থিক মূল্যও তুলনামূলক বেশি বলে উদ্যোক্তারা জানান।
প্ল্যানটেশন ফর নেচারের প্রতিষ্ঠাতা সবুজ চাকমা জানান, ২০২০ সাল থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সেগুন গাছের বিকল্প হিসেবে স্বর্ণচাঁপা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুন গাছ মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে এবং বাগানে অন্য গাছ জন্মাতে বাধা সৃষ্টি করে। এতে মাটিক্ষয় বাড়ে এবং নদী–নালা ও ছড়া ভরাট হয়ে বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া সেগুন গাছ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমিয়ে দেয়। যার ফলে শুকনো মৌসুমে ঝিরি–ছড়া শুকিয়ে যায়। সেগুনের শাখা বিস্তৃতি কম থাকায় পাখিরাও সাধারণত সেগুন গাছে বসতে আগ্রহী হয় না।
তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রকৃতি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চারা রোপণের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে বলেও জানান তিনি।
খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশগত বাস্তবতায় প্রকৃতি ও পরিবেশ উপযোগী বৃক্ষ রোপণ সময়ের দাবি। প্ল্যানটেশন ফর নেচার স্বেচ্ছায় যেভাবে গত পাঁচ বছর ধরে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় স্বর্ণচাঁপার মতো পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণ করছে, এটি খুবই গুরত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সেগুনের বাণিজ্যিক মূল্য থাকলেও তা পরিবেশের জন্য সহায়ক নয়। স্বর্ণচাঁপা গাছ পরিবেশের জন্য যেমন সহায়ক তেমনটি এটি বন্যপ্রাণীর জন্য উপযোগী। স্বর্ণচাপার ফল বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খায়। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধারে অনন্য ভূমিকা রাখবে।











